মোঘল হেরেমের ট্র্যাজিক রমণী জাহানারা

প্রকাশিতঃ 8:31 am | September 23, 2019

পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ ::

ইতিহাসে মোঘল সাম্রাজ্য আর তার অন্দর মহল সবকালেই আকর্ষণীয় বিষয়। যুগযুগ ধরে মোঘলদের প্রাসাদ রাজনীতির বিষয় মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। আকৃষ্ট করেছে মোঘল হেরেমের ক্ষমতাশালী নারীদের। মোঘল হেরেমের নারীরা আলোচিত তাদের অসাধারণ রূপ, কূটনীতি, রাজ্য শাসনে ভূমিকা আর কাব্য প্রতিভার কারণে। অনেকে আলোচিত প্রেম এবং ক্ষমতার রাজনীতিতে নির্যাতিতা হবার কারণে।

এদের মধ্যে আলোচিত এক মেধাবী নারী জাহানারা। তিনি সাহিত্য শিল্পবোধ, দয়া এবং পিতার জন্য স্বেচ্ছা কারাবরণ এর জন্য খ্যাতি এবং অমরত্ব দিয়েছে। তিনি কবি এবং প্রেমিক ছিলেন। তাজমহলের জন্য আলোচিত প্রেমিক সম্রাট শাহজাহানের কন্যা জাহানারা। সন্তানের মধ্যে তিনি প্রথম। ভাইদের মধ্যে প্রথম দারাশিকো ছিলেন তার প্রিয়। তার কারণে সম্রাট শাহজাহানের সমর্থন ছিল দারাশিকোর প্রতি। সেকালের প্রথা অনুযায়ী দারাশিকোর সাথে তাঁর মাতা-পুত্রের সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

কবি জাহানারা ফার্সি ভাষায় কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। কিছু গ্রন্থ অবশ্য হারিয়ে যায়। তার গ্রন্থে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি এবং আরো সুফি-সাধকদের জীবনী রয়েছে। জাহানারার নিজস্ব লাইব্রেরি ছিল। তিনি প্রচুর দান করতেন। পিতার তাজমহল নির্মাণের পেছনেও তার ভূমিকা ছিল।

জাহানারার একটি খণ্ডিত আত্নজীবনী রয়েছে। ১৮৮৬ সালে আগ্রার প্রাসাদে বিদেশীনি তার খণ্ডিত আত্নজীবনী আবিস্কার করেন। আত্নজীবনী পরে বেভারেজ ইংরেজিতে এবং মাখন লাল বাংলায় অনুবাদ করেন।

১৬৫৮ সালে শাহজাহান অসুস্থ হলে সন্তানদের ক্ষমতা দখলের গৃহযুদ্বাবস্থায় জাহানারা ছিলেন দারাশিকোর পক্ষে। তার মতে দারার হৃদয় মহৎ আর আত্না ছিল বিশাল এবং তারা দুজনেই ছিলেন হিন্দু-মুসলিম মিলনের পক্ষে।

ক্ষমতার যুদ্ধে দারা অবশেষে পরাজিত হন। সম্রাট শাহজাহানের প্রাসাদে আসে সন্তান দারাশিকোর খণ্ডিত মাথা। সম্রাটের সাথে জাহানারাও দেখেন পরাজিত প্রিয় ভাই দারার খণ্ডিত মাথা। এ ঘটনা তার কবিত্ব দিয়ে জাহানারা তার আত্নজীবনিতে লিখেন “তুমি মানুষের রুপ পরিগ্রহ করে আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছ। তোমার প্রানহীন আঁখি নিয়ে আমার সম্মুখে ভ্রুকুটি নিক্ষেপ করছ। তোমার শীতল নিঃশ্বাস আমার মুখমণ্ডলকে শীতলতর করে দিচ্ছে।”

আগ্রার দুর্গে বিজয়ী সন্তান আওরঙ্গজেব এর হাতে বন্দী হন শাহজাহান। বন্দী পিতাকে ছেড়ে যাননি জাহানারা। পিতার সাথে আগ্রা দুর্গে স্বেচ্ছা কারাবরণ করেন তিনি। ভালবাসার মমতাজ এবং সাম্রাজ্য হারানো সম্রাটের বন্দী জীবনের বেদনার সাথী হন তার কন্যা। শাহজাহানের মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘ নয় বছর স্বেচ্ছা বন্দী জীবন কাটান তিনি। জাহানারার কোলে মাথা রেখে তাকে অমরত্ব দেয়া তাজমহলের দিকে দৃষ্টি রেখে মৃত্যু হয় সম্রাট শাহজাহানের। শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ তার শিল্পকলায় এমনি একটি ছঁবি একেছেন।

রূপবতী জাহানারার জীবনে প্রেম আসলেও সংসার আসেনি। শাহজাদা দারা চেয়েছিলেন বল্কের আমির বীর যোদ্ধা নহবত খানের সাথে জাহানারার বিয়ে হোক। উদ্দেশ্য ছিল তার ভবিষ্যৎ ক্ষমতা এতে সহজ হবে। কিন্তু জাহানারার আকর্ষণ ছিল বুন্দেলা রাজা ছত্রশালের প্রতি। ছত্রশাল ছিলেন সাহসী মহাবীর। জাহানারার জীবনের অনেক রোমান্টিক কাহিনী ছত্রশালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। তাদের প্রেম দিল্লী আগ্রার দরবারে অনেকেই জানতেন। সফল হয়নি তার এই জীবন।

মোঘল হেরেমের রূপবতি জাহানারা পিতার সাথে জীবনের দীর্ঘ সময় দুর্গে স্বেচ্ছা বন্দী কাটিয়েছেন। দারার খণ্ডিত মাথা দেখে তিনি শিউরে উঠেছেন। জাগতিক জীবনে অনেক সম্পদ, ক্ষমতা থাকলেও পুরো জীবন মিলিয়ে দেখলে তার জীবন ছিল ট্র্যাজিক। তিনি তার আত্নজীবনীতে বলেছেন “আমি আজ সম্রাট বাবরের কথাগুলো স্মরণ করছি। আমার আপন আত্নার মতো বিশ্বস্ত কোন বন্ধু পাইনি। আমার নিজ অন্তর ব্যতিত আমি কোন নির্ভরযোগ্য স্থান পাইনি।” রমজান মাসের এক দিনে তিনি মৃত্যুবরন করেন।

তিনি নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার ভক্ত ছিলেন। নিজাম উদ্দিনের মাজারের পাশে থাকা মির্জা গালিবের সমাধির খবর অনেকে জানেন না। মোঘল হেরেমের গুনী এই মহিলা জাহানারার অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী তার কবরও নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারের পাশে দেয়া হয়। গালিবের মতো তার কবরের খবরও অনেকে জানেন না। তার ইচ্ছাতে কবরের উপরে কোন সৌধ নেই। শুধু সমাধি ফলকে খোদিত রয়েছে তার লেখা কবিতা “বেগায়র সবজা না পোশদ বসেমাযারে মারা/কে কবর পোশে গরিবান গিয়াহ বসন্ত।”—– “একমাত্র ঘাস ছাড়া আর যেন কিছু না থাকে আমার সমাধির উপরে/আমার মত দীন অভাজনের সেই তো শ্রেষ্ঠ আচ্ছাদন।”

লেখক: সংসদ সদস্য

Print Friendly, PDF & Email