নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম

এসকেলেটর উদ্বোধনের জৌলুশ, তারপর অচল!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম

এসকেলেটর উদ্বোধনের জৌলুশ, তারপর অচল!

কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, সঙ্গে পথচারীদের ওঠানামা সহজ করতে বসানো হচ্ছে চলন্ত সিঁড়ি (এসকেলেটর)। কিন্তু উদ্বোধনের জৌলুশ ফুরাতেই কোথাও থেমে যাচ্ছে যন্ত্র, কোথাও মাসের পর মাস মিলছে না সেবা। আবার কোথাও মেরামতের পর চালু হলেও তা কত দিন সচল থাকবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। ফলে নাগরিক সুবিধার নামে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বাস্তবে কতটা সুফল মিলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাজধানীর নিউ মার্কেট, ফার্মগেট ও বিমানবন্দর এলাকার ফুটওভারব্রিজগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, এসকেলেটর স্থাপনের চেয়ে সেগুলো সচল রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ পুরোনো ব্যবস্থার দুর্বলতা কাটানোর নিশ্চয়তা ছাড়াই নতুন প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছে ব্যয়বহুল এই প্রযুক্তি। এতে প্রকল্প পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

  • ঢাকার একাধিক ফুটওভারব্রিজে অচল চলন্ত সিঁড়ি, ব্যাহত নাগরিক সুবিধা
  • স্থাপনের পরই বন্ধ, কোথাও বছরের পর বছর অচল
  • পুরোনো সমস্যার সমাধান ছাড়াই নতুন প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানো নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদদের প্রশ্ন

উদ্বোধন হয়েছে, সেবা নেই
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্মিত নিউ মার্কেট ফুটওভারব্রিজের পেছনে ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয় ব্রিজটি। পথচারীদের নিরাপদ পারাপার ও ওঠানামা সহজ করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই ব্রিজটির বড় অংশ হকারদের দখলে চলে গেছে। সংকুচিত হয়েছে পথচারীদের চলাচলের জায়গা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এসকেলেটর বন্ধ থাকার সমস্যা।

ব্রিজের পাশে দায়িত্ব পালন করা নিউ মার্কেটের এক নিরাপত্তাকর্মীর ভাষ্য, নির্মাণের পর চলন্ত সিঁড়িটি মাত্র তিন দিন অল্প সময়ের জন্য চালু ছিল। এরপর থেকে সেটি নিয়মিত চলতে দেখা যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, যে সুবিধার জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করা হলো, সেটি যদি ব্যবহারই করা না যায়, তাহলে প্রকল্পটির কার্যকারিতা কোথায়? শুধু অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্র স্থাপন করেই কি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শেষ?

ফার্মগেটে উদ্বোধনের এক সপ্তাহেই বন্ধ
প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফার্মগেট ফুটওভারব্রিজ উদ্বোধন করা হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্বোধনের এক সপ্তাহের মধ্যেই এর এসকেলেটর বন্ধ হয়ে যায়।

দীর্ঘ সময় অচল থাকার পর সম্প্রতি সেটি আবার চালু হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিয়মিত ব্যবহারকারী ফাদিন খান। তাঁর ভাষ্য, উদ্বোধনের কিছুদিন পর থেকেই চলন্ত সিঁড়িটি দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। তবে কিছুদিন ধরে সেটি নিয়মিত চলছে। মেরামতের পর এসকেলেটর সচল হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার কারণ কী ছিল, সমস্যার সমাধান কীভাবে হলো এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও জরুরি। কারণ, সাময়িকভাবে চালু হওয়া আর দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য সেবা দেওয়া এক বিষয় নয়।

বিমানবন্দরে দুই বছরের বেশি অচল
বিমানবন্দর বাসস্ট্যান্ডের ফুটওভারব্রিজেও একই সমস্যার নজির রয়েছে। ২০১৭ সালে স্থাপিত এসকেলেটর প্রথম দিকে সচল থাকলেও পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিজটির দুই পাশের চলন্ত সিঁড়ি দুই বছরেরও বেশি সময় অচল ছিল।

এর সরাসরি ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে পথচারীদের। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়েছে কষ্ট করে। যাঁদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে এসকেলেটর স্থাপন, তাঁদেরই একটি অংশ শেষ পর্যন্ত সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এখানেই সমস্যাটি কেবল যন্ত্র বিকল হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে নাগরিক সেবা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ব্যর্থতার প্রশ্ন।

যন্ত্র বসানোর পরিকল্পনা আছে, সচল রাখার নিশ্চয়তা কোথায়?
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ঢাকায় এসকেলেটর স্থাপনের আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি ছিল। তাঁর প্রশ্ন, দেশে এ ধরনের যন্ত্র কার্যকরভাবে পরিচালনা নিয়ে বারবার উদ্বেগ ওঠার পরও কেন নতুন প্রকল্পে সেগুলো যুক্ত করা হচ্ছে? তিনি বলেন, ঢাকার অধিকাংশ চলন্ত সিঁড়ি অচল পড়ে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থা শহরের জন্য কতটা উপযোগী, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তারপরও এসকেলেটর যুক্ত করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে।

আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, স্থাপনের পর যন্ত্রগুলো অচল পড়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নাগরিকের অর্থ অপচয়ের দায় নিয়ে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য স্পষ্ট—প্রকল্পের সফলতা শুধু নির্মাণকাজ শেষ করা বা উদ্বোধন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যে সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তবে কত দিন ও কতটা কার্যকরভাবে দেওয়া যাচ্ছে, তার হিসাবও থাকতে হবে।

ব্যয় বাড়ে, দায় নেয় কে?
একটি এসকেলেটর স্থাপনের পর সেটি সচল রাখতে নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা, যন্ত্রাংশের জোগান, দক্ষ কর্মী এবং মেরামতের জন্য অর্থ প্রয়োজন। যন্ত্রাংশ চুরি কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেটি বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে।

কিন্তু এসব প্রস্তুতি কতটা নিশ্চিত করে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নতুন এসকেলেটর কেনার বাজেট থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেটি পরিচালনার অর্থ, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং মেরামতের সময়সীমা স্পষ্ট না হলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় সামনে আসা জরুরি। রাজধানীর কোন ফুটওভারব্রিজের এসকেলেটর সচল, কোনটি অচল এবং কত দিন ধরে বন্ধ—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করতে হবে। অচল যন্ত্রের কারণ নির্ধারণ করে মেরামতের সময়সীমা জানাতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের আগে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও পরিচালন সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন। প্রকল্পের ব্যয় কত, তার হিসাব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই অর্থের বিনিময়ে নাগরিকেরা কতটা সেবা পাচ্ছেন, তার হিসাবও প্রকাশ্যে থাকা উচিত।

উন্নয়ন কি শুধু নির্মাণেই সীমাবদ্ধ?
ফুটওভারব্রিজে এসকেলেটর স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল পথচারীদের চলাচল সহজ করা। কিন্তু যন্ত্র অচল, চলাচলের জায়গা হকারদের দখলে কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা অনিশ্চিত থাকলে সেই উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

নিউ মার্কেটের নতুন ব্রিজের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সেটির ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি। ফার্মগেট ও বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা আবার মনে করিয়ে দেয়, রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকদের ভোগান্তির কারণ হতে পারে। এখন প্রশ্ন, পুরোনো প্রকল্পের এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রকল্পে কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে? এসকেলেটর স্থাপনের সিদ্ধান্তের আগে প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই করা হচ্ছে কি? আর স্থাপনের পর সেগুলো সচল না থাকলে দায় নির্ধারণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

কালের আলো/ওয়াইএ/এমকে

Link copied!