অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ০৬:১২ পিএম

শিক্ষার সিঁড়িতে অসম ধাপ, বৈষম্যের পাঠ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ০৬:১২ পিএম

শিক্ষার সিঁড়িতে অসম ধাপ, বৈষম্যের পাঠ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশের দরজা সবার জন্য খোলা রাখার নীতিগত অঙ্গীকার রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক। উচ্চশিক্ষার সুযোগও আগের তুলনায় বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া আর মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া এক বিষয় নয়। বাস্তবে শিক্ষার সুযোগ নির্ধারণে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পরিবারের আয়, বসবাসের এলাকা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন। ফলে একই বয়সের দুই শিক্ষার্থীর একজন পাচ্ছে পর্যাপ্ত সহায়তা, উন্নত শিক্ষার পরিবেশ ও বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ; অন্যজন মৌলিক পাঠ আয়ত্ত করতেই হিমশিম খাচ্ছে।

এই বৈষম্যের সূত্রপাত প্রাথমিক স্তরেই। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের অধিকাংশ শিশুর প্রধান ভরসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে বেতন দিতে হয় না, কিন্তু বিদ্যালয়ের পাঠদানেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত না হলে অভিভাবককে কোচিং বা গৃহশিক্ষকের জন্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। সচ্ছল পরিবার বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারলেও দরিদ্র পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ শিক্ষার আনুষ্ঠানিক খরচ শূন্য হলেও শেখার প্রকৃত ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য শূন্য নয়।

  • শ্রেণিকক্ষেই স্পষ্ট হচ্ছে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান
  • কারও ভরসা কোচিং ও গৃহশিক্ষক, কারও মৌলিক শিক্ষাই অসম্পূর্ণ
  • প্রাথমিকের শেখার ঘাটতি থেকে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার সীমাবদ্ধতা
  • এক স্তরের বঞ্চনা পরের স্তরে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের

সরকারি পরিদর্শনের ফলাফলও এই সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিট গত জুনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের দুই হাজারের বেশি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে। সেখানে অনেক শিশুর বাংলা বর্ণ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে না পারার বিষয়টি উঠে আসে। ইংরেজি ও গণিতেও দুর্বলতা পাওয়া গেছে। প্রাথমিক স্তরে ভাষা ও গণিতের ভিত্তি তৈরি না হলে পরবর্তী শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। একপর্যায়ে এই ঘাটতি পূরণের দায়িত্ব বিদ্যালয়ের বদলে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঝরে পড়ার উদ্বেগজনক চিত্র। বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ১৬ শতাংশের বেশি; এক বছরের ব্যবধানে তা প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ঝরে পড়া কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়াও চলছে। তবে ঝরে পড়া রোধে উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে শিশুরা কেন বিদ্যালয় ছেড়ে যাচ্ছে, সেই কারণগুলো কতটা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে তার ওপর।

শিক্ষক নেই, আছে শূন্য পদের দীর্ঘ তালিকা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গড় অনুপাত ১:২৮। কিন্তু এই গড়ের আড়ালে রয়েছে অঞ্চলভেদে বড় ব্যবধান। শহরের তুলনায় চর, হাওর, পাহাড় ও দুর্গম এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট বেশি। ফলে একই শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়েও সব শিক্ষার্থী সমান সময়, মনোযোগ ও পাঠদানের সুযোগ পাচ্ছে না।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি শূন্য। এসব পদে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে কাজ করতে হবে। আলোচনা শুরু হয়েছে এবং আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অগ্রগতি জানানো যাবে।

তবে নিয়োগের পাশাপাশি পদোন্নতির কাঠামোতেও সতর্কতা প্রয়োজন। প্রচলিত নিয়োগবিধি অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের পদের ৮০ শতাংশ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক সহকারী শিক্ষককে একসঙ্গে পদোন্নতি দিলে তাঁদের আগের পদগুলোতে শূন্যতা তৈরি হতে পারে। এক স্তরের সংকট সমাধান করতে গিয়ে অন্য স্তরে শিক্ষকসংকট বাড়লে সামগ্রিকভাবে পাঠদানের সক্ষমতা বাড়বে না।

ঢাকার হাজারীবাগ এলাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মতে, শিক্ষার মানোন্নয়নে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, শিক্ষকসংকট কেবল জনবলের হিসাব নয়; শিক্ষক কতটা দক্ষতার সঙ্গে পাঠদান করছেন এবং তাঁর কাজের উপযুক্ত পরিবেশ আছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাথমিক শিক্ষার পরিধি বাড়ানোর বিতর্ক
পঞ্চম শ্রেণিতে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার প্রচলিত কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণের পক্ষে যুক্তি হলো, পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার আগেই অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারে না। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এই স্তর বিস্তৃত হলে শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন করা এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে শ্রেণি বাড়ানোই সমস্যার সমাধান নয়। শিক্ষার্থীরা প্রতিটি শ্রেণিতে কী শিখছে, তাদের ঘাটতি কীভাবে চিহ্নিত হচ্ছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি। মানসম্মত পাঠদান ও শিক্ষকসংকটের সমাধান ছাড়া শিক্ষার কাঠামো সম্প্রসারণ করলে কেবল শিক্ষাবর্ষ বাড়বে, শেখার মান বাড়বে কি না তা নিশ্চিত হবে না।

এদিকে, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু হওয়ায় শিক্ষার সমতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশের আশঙ্কা, বৃত্তির জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীর ওপর বাড়তি মনোযোগ দিলে তুলনামূলক দুর্বল শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে পড়তে পারে। একই প্রশ্ন উঠেছে অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা নিয়েও। শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বৃত্তি বা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা যেন সবার শেখার অধিকারকে ছাপিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী মনে করেন, শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামো ও শিক্ষার মানে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য জাতির ভিত্তিকে দুর্বল করে। ফলে বৈষম্য কমানোকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প হিসেবে না দেখে শিক্ষা পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে নেওয়া প্রয়োজন।

মাধ্যমিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা, বাড়ছে অতিরিক্ত ব্যয়
মাধ্যমিক স্তরে বৈষম্যের চিত্র আরও স্পষ্ট। এ পর্যায়ের ৭৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ অধিকাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষক, অবকাঠামো ও পাঠদানের মানে ব্যাপক পার্থক্য থাকায় শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাও এক রকম নয়।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্রমতে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ১৫ হাজার ২৯৩টি পদের মধ্যে তিন হাজারের বেশি শূন্য। প্রধান শিক্ষকের খালি পদ ৩৮৩টি। বিজ্ঞান, গণিত ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষকসংকট সবচেয়ে বেশি। বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাবের কারণে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এর প্রভাব বিশেষ করে গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলে বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে বিকল্প শিক্ষাসহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত।

বিদ্যালয়ের পাঠদানের পাশাপাশি কোচিং ও গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভরতা এই বৈষম্যকে আরও বাড়াচ্ছে। পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য অতিরিক্ত প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেক অভিভাবক। পুরান ঢাকার এক শিক্ষার্থীর পরিবার মাসে দুই গৃহশিক্ষকের পেছনে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা ব্যয় করে। সচ্ছল পরিবারের পক্ষে এমন ব্যয় বহন করা সম্ভব হলেও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য তা বড় চাপ।

ফলে শিক্ষার্থীর ফলাফল শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় করার সামর্থ্যও তার শিক্ষাগত অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছে। বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে কোচিংনির্ভরতা কমানো কঠিন হবে, আর কোচিংয়ের ব্যয় যত বাড়বে, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চ্যালেঞ্জও তত বাড়বে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি ছাড়া ওপরের সব শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। লটারি পদ্ধতি বাদ দিয়ে ভর্তি পরীক্ষা চালুর ফলে শিশুদের ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং ভর্তি-কোচিংয়ের চাহিদা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদেরা। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের যুক্তি থাকলেও প্রস্তুতির সুযোগ যদি পরিবারের সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে, তাহলে প্রতিযোগিতায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

উচ্চশিক্ষায় এক দেশে দুই বাস্তবতা
শিক্ষার বৈষম্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও স্পষ্ট। দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৭৮টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে; এর বাইরে দুটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়, গবেষণার সুযোগ এবং শিক্ষার মানের ব্যবধান দূর হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে ব্যয় ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪১ টাকা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে শিক্ষার্থীপ্রতি এই ব্যয় মাত্র ৭৮৯ টাকা। অথচ দেশের উচ্চশিক্ষার ৭০ দশমিক ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে।

এই পরিসংখ্যান উচ্চশিক্ষায় সম্পদ বণ্টনের বড় প্রশ্ন সামনে আনে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী যে কলেজগুলোতে পড়ছেন, সেগুলোর অনেকটিতেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক পরীক্ষাগার ও গবেষণার পরিবেশ সীমিত। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বাড়লেও পর্যাপ্ত শিক্ষাসম্পদ না থাকলে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত দক্ষতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন না। ফলে সনদ অর্জনের সুযোগ আর মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ এক হয়ে উঠছে না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও রয়েছে আর্থিক চাপ। সরকারি অর্থসহায়তা না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালন ব্যয়ের প্রায় পুরোটাই টিউশন ফির মাধ্যমে মেটায়। এতে শিক্ষার ব্যয় সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় অত্যন্ত কম, অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ব্যয় পরিবারের ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। দুই পরিস্থিতিই উচ্চশিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

আটটি কমিশন-কমিটির পরও নীতির দিকনির্দেশনা অনিশ্চিত
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। এরপর বিভিন্ন সরকারের সময়ে আরও আটটি শিক্ষা কমিশন বা কমিটি গঠিত হয়েছে। দীর্ঘ এই নীতিগত উদ্যোগের পরও শিক্ষার মান, কাঠামো, অর্থায়ন ও সমতা নিয়ে মৌলিক সমস্যাগুলো রয়ে গেছে।

বর্তমান বিএনপি সরকার নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করবে, নাকি অন্য কোনো পথে এগোবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এরই মধ্যে ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রম ব্যাপকভাবে পরিমার্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তার আগে ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়েও একাধিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি বই যুক্ত করার কথাও জানানো হয়েছে।

পাঠ্যক্রম ও বইয়ের পরিমার্জন শিক্ষাকে সময়োপযোগী করার অংশ হতে পারে। কিন্তু এসব পরিবর্তনের সাফল্য নির্ভর করবে শিক্ষকরা কতটা প্রস্তুত, শ্রেণিকক্ষে নতুন বিষয়বস্তু কতটা কার্যকরভাবে পড়ানো হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কী শিখছে তার ওপর। নীতির পরিবর্তন যদি শিক্ষকসংকট, শেখার ঘাটতি, কোচিংনির্ভরতা এবং উচ্চশিক্ষায় সম্পদের অসম বণ্টনের মতো সমস্যার সঙ্গে সমন্বিত না হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সীমিত থেকে যেতে পারে।

নীতির লক্ষ্য হোক সব শিক্ষার্থীর শেখা নিশ্চিত করা
শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে দেখা দেওয়া সমস্যাগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি মাধ্যমিকে গিয়ে বড় হয়। মাধ্যমিকে দক্ষ শিক্ষক ও কার্যকর পাঠদানের অভাব কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি পরিবারের ব্যয় বাড়াতে পারে। উচ্চশিক্ষায় আবার শিক্ষার্থীপ্রতি বিনিয়োগ ও গবেষণার সুযোগের পার্থক্য নতুন ব্যবধান তৈরি করে।

এই ধারাবাহিকতা ভাঙতে প্রয়োজন সমন্বিত সংস্কার। সরকারি বিদ্যালয়ে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্গম এলাকার শিক্ষকসংকট দূর করতে হবে। প্রাথমিক স্তরে সব শিশুর ভাষা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা অর্জন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। ঝরে পড়া রোধে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের পাঠদান এমন পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে, যাতে কোচিং বা গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভরতা কমে।

বৃত্তি ও ভর্তি পরীক্ষার নকশা নির্ধারণেও সমান সুযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চশিক্ষায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষক, অবকাঠামো ও গবেষণাসুবিধা বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সম্পদ বণ্টনের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাঠ্যক্রমের পরিবর্তনকে শিক্ষক উন্নয়ন, মূল্যায়ন সংস্কার ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য শুধু ভর্তি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণের সংখ্যা কিংবা নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত, প্রতিটি শিক্ষার্থী তার পারিবারিক আয়, জন্মস্থান ও প্রতিষ্ঠানের ধরন নির্বিশেষে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে কি না। রাষ্ট্র যদি সেই নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তাহলে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক শিক্ষার নীতি বাস্তব জীবনে পূর্ণতা পাবে না। আর শিক্ষার সুযোগে তৈরি হওয়া ব্যবধান শেষ পর্যন্ত সমাজ ও অর্থনীতিতেও বৈষম্যের পুনরুৎপাদন ঘটাতে থাকবে।

কালের আলো/জেএন/এমকে

Link copied!