অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১১:০৮ এএম

১২ উড়োজাহাজে আটকে শাহজালের ১২ পার্কিং বে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১১:০৮ এএম

১২ উড়োজাহাজে আটকে শাহজালের ১২ পার্কিং বে

১২টি উড়োজাহাজ পড়ে আছে বছরের পর বছর। জমেছে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার পার্কিং ফি ও সারচার্জ। অথচ সেগুলো বিক্রিতে সর্বোচ্চ দর উঠেছে করসহ মাত্র ৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে আবার উড়োজাহাজগুলোর দখলে থাকা জায়গায় নতুন ১২টি পার্কিং বে নির্মাণের সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হযরত শাহজালালে এভাবেই আটকে আছে বিপুল অর্থ আদায় ও রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ।

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইন্সের পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে ফেলতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তিনটি প্রতিষ্ঠানও সেগুলো কেনার আগ্রহ দেখিয়ে দরপ্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু বিক্রির মূল্য, ব্যাংকঋণ, মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং আদালতের স্থগিতাদেশ—সব মিলিয়ে আটকে আছে নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া। ফলে একদিকে বেবিচকের পাওনা আদায় অনিশ্চিত, অন্যদিকে বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পড়ে আছে কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায়।

  • বিক্রির সর্বোচ্চ দর মাত্র ৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা
  • ১ লাখ ৯২ হাজার বর্গফুট জায়গা দখলে, বকেয়া প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা
  • বিক্রি ও অপসারণে বাধা ব্যাংকঋণ ও আদালতের স্থগিতাদেশ

১২ বছরে বকেয়া ৮৫০ কোটি
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো ভবন এলাকায় পড়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজের পার্কিং ও সারচার্জ বাবদ গত ১২ বছরে বকেয়া প্রায় ৮৫০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওনা জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছে—৩৬০ কোটি টাকারও বেশি। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় জিএমজি এয়ারলাইন্স। এরপর আর আকাশে ওড়েনি প্রতিষ্ঠানটির উড়োজাহাজগুলো। দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকা এসব উড়োজাহাজ এখন শুধু বকেয়া আদায়ের প্রশ্ন নয়, বিমানবন্দরের সীমিত জায়গা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উড়োজাহাজগুলো সরানো গেলে সেখানে আনুমানিক ১২টি নতুন পার্কিং বে নির্মাণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বেবিচক কর্মকর্তারা। অথচ সেগুলো বিক্রির প্রক্রিয়াই এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সর্বোচ্চ দর ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার
উড়োজাহাজগুলো বিক্রির জন্য দরপ্রস্তাব দিয়েছে এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেস, সেনা কল্যাণ সংস্থা এবং সেফ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন লিমিটেড। এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেস সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার দর দিয়েছে। করসহ এই প্রস্তাবের মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। সেনা কল্যাণ সংস্থার প্রস্তাব ৩ কোটি ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা, কর ছাড়া। আর সেফ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন লিমিটেড দর দিয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। প্রথমে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে উড়োজাহাজগুলো বিক্রির উদ্যোগ নেয় বেবিচক। তবে বিমান মন্ত্রণালয় এ পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের নির্দেশ দেয়।

পরে বেবিচকের ৩২০তম বোর্ড সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। চলতি বছরের ৭ অক্টোবরের সভায় সর্বোচ্চ দরদাতার প্রস্তাবকে ভিত্তি ধরে নিলামের প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ এবং মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেসের দেওয়া ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারকে ভিত্তিমূল্য ধরে অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বেবিচক।

বাজেয়াপ্ত করেও স্বস্তি নেই
বিক্রির উদ্যোগের আগেই উড়োজাহাজগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হয়। বেবিচক সূত্র জানায়, উড্ডয়নযোগ্যতার সনদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বিধিবিধান অনুসরণ করে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে একাধিকবার নোটিস দিয়ে উড়োজাহাজ সরিয়ে নিতে বলা হলেও তারা তা করেনি।

এরপর চূড়ান্ত নোটিস, কমিটির সুপারিশ ও আইনি দিক পর্যালোচনা করে বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২৪ সালের ২৬ মে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়। একই বছরের ১ জুন জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককেও বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু বাজেয়াপ্তের আদেশের পরও নিষ্পত্তি হয়নি মালিকানা ও ঋণের দায় নিয়ে বিরোধ। আইনি মতামত অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে দায়বদ্ধ উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্তের আদেশ বাতিল চেয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ অর্থঋণ আদালতে আবেদন করে। এ-সংক্রান্ত মামলার কার্যক্রম হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে আটকে রয়েছে।

‘বিক্রি করলে এক ভাগ দামও পাবে না বেবিচক’
উড়োজাহাজগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকেও রয়েছে ভিন্ন ব্যাখ্যা। অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদুল আলম জানান, তাঁদের পক্ষ থেকে ৩০০ কোটি টাকা সারচার্জ মওকুফের আবেদন করা হয়েছিল। একই সঙ্গে মূল বকেয়া ৫৫ কোটি টাকা এয়ারলাইন্স চালু হওয়ার পর ধাপে ধাপে পরিশোধের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রণালয় ওই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। ফলে এয়ারলাইন্সটির এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি) নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, উড়োজাহাজগুলো সরানো জরুরি হলেও বর্তমান প্রক্রিয়ায় বিক্রি করলে বেবিচক সেগুলোর প্রকৃত মূল্যের সামান্য অংশও পাবে না। তাঁর দাবি, এয়ারলাইন্সগুলো নিজেরাই উড়োজাহাজ বিক্রি করতে চেয়েছিল, যাতে বিক্রির অর্থ থেকে কিছু টাকা তাদের হাতে আসত এবং বেবিচকের পাওনারও একটি অংশ পরিশোধ করা যেত। কিন্তু বেবিচক নীতিগতভাবে সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি।

তাঁর মতে, উড়োজাহাজগুলো পুরোনো হলেও পুনর্বিক্রয়মূল্য রয়েছে। তবে এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যাংকঋণ থাকায় ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বিক্রি করা সম্ভব নয়। ফলে বিষয়টি কেবল ক্রেতা পাওয়া বা দর নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঋণদাতাদের অধিকার ও আইনি জটিলতা।

১ লাখ ৯২ হাজার বর্গফুট জায়গা আটকে
উড়োজাহাজগুলোর কারণে বিমানবন্দরের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা শুধু বিক্রির দামে সীমাবদ্ধ নয়। বেবিচকের হিসাব অনুযায়ী, উড়োজাহাজ ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামসহ প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গা দখল হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় জায়গার সংকটের কারণে উড়োজাহাজ পার্কিং, কার্গো ওঠানামা এবং যানবাহন চলাচলে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। অথচ উড়োজাহাজগুলো সরানো গেলে ওই জায়গায় প্রায় ১২টি নতুন পার্কিং বে নির্মাণের সুযোগ রয়েছে।

এসব বে ব্যবহার করে উড়োজাহাজের অবতরণ, রুট নেভিগেশন এবং রাতের অবতরণ ও উড্ডয়নসহ বিভিন্ন সেবার বিপরীতে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন বেবিচক কর্মকর্তারা। এখানেই সংকটের আরেকটি দিক স্পষ্ট হচ্ছে। উড়োজাহাজগুলো বিক্রি করে এককালীন যে অর্থ পাওয়া যাবে, তার বাইরেও জায়গাটি ব্যবহার করতে না পারার কারণে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে বেবিচক। অর্থাৎ, নিষ্পত্তি যত বিলম্বিত হচ্ছে, অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও সম্ভাব্য রাজস্ব বৃদ্ধির পথও তত পিছিয়ে যাচ্ছে।

বিক্রির টাকা পৃথক হিসাবে রাখার সুপারিশ
আইনি জটিলতার মধ্যেও বিক্রির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার একটি পথ দেখিয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। তাদের আইনি মতামতে উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রি করে পাওয়া অর্থ আপাতত বেবিচকের পৃথক হিসাবে জমা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বিক্রির অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে কারও কাছে চূড়ান্তভাবে হস্তান্তর না করে পরবর্তী আইনি নিষ্পত্তির জন্য সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে প্যানেল আইনজীবীর চূড়ান্ত মতামত এবং মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন এখনো প্রয়োজন। পরবর্তী কার্যক্রম নির্ভর করছে এই দুই ধাপের অগ্রগতির ওপর।

বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান একটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

Link copied!