বিশেষ সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম

দুই বছরেও মেলেনি পুরস্কার, ১৩০ শিক্ষার্থীর 'স্বর্ণপদক' রহস্য

বিশেষ সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম

দুই বছরেও মেলেনি পুরস্কার, ১৩০ শিক্ষার্থীর 'স্বর্ণপদক' রহস্য

একবার নির্বাচিত হয়েছিলেন, নির্ধারিত হয়েছিল পুরস্কার বিতরণের তারিখও। প্রস্তুতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল স্বর্ণপদক ও ক্রেস্ট। কিন্তু অনুষ্ঠান স্থগিত হওয়ার পর কেটে গেছে প্রায় দুই বছর। এর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নতুন করে ৫৮ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। অথচ ২০২৪ সালে একই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত ১৩০ শিক্ষার্থীর ভাগ্যে জোটেনি প্রত্যাশিত স্বীকৃতি। তাঁদের জন্য প্রস্তুত করা স্বর্ণপদক ও ক্রেস্টের কী হয়েছে, পুরোনো তালিকা কেন বদলানো হলো, নতুন তালিকায় কারা কী প্রক্রিয়ায় স্থান পেলেন—কোনো প্রশ্নেরই স্পষ্ট জবাব পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। বিষয়টি গড়িয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।

  • নির্বাচিতদের বাদ দিয়ে নতুন তালিকায় অ্যাওয়ার্ড
  • পদক তৈরি ও অর্থ ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
  • তদন্ত চেয়ে দুদকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ

গত ২২ সেপ্টেম্বর দুদক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে পুরস্কারবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের ১৩০ জনের তালিকা ও ২০২৬ সালের ৫৮ জনের তালিকা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে তালিকা পরিবর্তনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট কমিটির কার্যবিবরণী, অনুমোদনের নথি এবং স্বর্ণপদক কেনা ও বিতরণসংক্রান্ত আর্থিক হিসাব তদন্তের আওতায় আনার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা। আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি প্রশ্ন—নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া হলো কেন, সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলো কোন প্রক্রিয়ায় এবং ১৩০টি স্বর্ণপদকের কী হলো।

স্থগিত অনুষ্ঠান, আর ফেরেনি নতুন তারিখ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই জারি করা অফিস আদেশে ২০১৮, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালের অনার্স এবং ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালের ডিগ্রি (পাস) পরীক্ষায় ভালো ফল করা ১৩০ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত করা হয়। ২৪ জুলাই ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে তাঁদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু কোটা আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে অনুষ্ঠানের তিন দিন আগে, ২১ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠানো হয়। জানানো হয়, অনিবার্য কারণে অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে; পরবর্তী তারিখ পরে জানানো হবে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সেই তারিখ আর জানানো হয়নি। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁদের পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগের কথা জানতে পারেননি তাঁরা।

অনুষ্ঠান স্থগিত হওয়ার পেছনে তৎকালীন পরিস্থিতি ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নতুন তালিকায় পুরস্কার বিতরণ করা হলেও আগের সিদ্ধান্তের পরিণতি কী হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের জায়গাটি এখানেই—অনুষ্ঠান স্থগিত হওয়া আর নির্বাচিতদের তালিকা থেকে বাদ পড়া এক বিষয় নয়।

পদকের জন্য টেন্ডার, হিসাব কোথায়
পুরস্কারবঞ্চিত শিক্ষার্থী রোকসানা আক্তারের দাবি, ১৩০টি স্বর্ণপদক তৈরির জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। পদক ও ক্রেস্ট প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকলে সেগুলোর বর্তমান অবস্থান কী, তা জানতে চান তিনি। তাঁর প্রশ্ন, পদকগুলো তৈরি হয়েছিল কি না, সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছিল কি না এবং এ বাবদ অর্থ পরিশোধ করা হয়ে থাকলে তার হিসাব কোথায়।

রোকসানা বলেন, চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর যাঁরা পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের স্বর্ণপদক দেওয়া হয়নি; দেওয়া হয়েছে নগদ ২৫ হাজার টাকা ও সনদপত্র। তাঁর মতে, শুধু পুরস্কার বিতরণের তথ্য জানলেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে না। পদক তৈরির ক্রয়াদেশ, বিল-ভাউচার, সরবরাহের প্রমাণ, অর্থ পরিশোধ এবং সংরক্ষণসংক্রান্ত নথি যাচাই করা জরুরি।

তবে টেন্ডার আহ্বান করা মানেই পদক তৈরি বা সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে, এমন নয়। এ কারণে অভিযোগের নিষ্পত্তিতে ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল কি না, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পদক বুঝিয়ে দিয়েছিল কি না, অর্থ পরিশোধ হয়েছে কি না—এসব নথি পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব। এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে পদকগুলো তৈরি হয়েছিল বা অর্থের অপব্যবহার হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

১৩০ থেকে ৫৮, বাদ পড়লেন কারা
আরেক শিক্ষার্থী অন্তরা খানমের প্রশ্ন, ২০২৪ সালে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের তালিকা পরিবর্তনের প্রশাসনিক ভিত্তি কী। তাঁর দাবি, সংশোধিত অ্যাওয়ার্ড নীতিমালা অনুযায়ী ১৩০ শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করার পর নতুন তালিকা তৈরি করা হলে তার কারণ ও অনুমোদনের তথ্য প্রকাশ করা উচিত।

অন্তরা জানান, ১৫ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের তালিকায় থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীও পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এবং পুরোনো তালিকা থেকে কতজনকে নতুন করে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, তার হিসাব তাঁরা পাননি। ফলে নতুন ৫৮ জনের তালিকায় আগের নির্বাচিতদের অবস্থান কী, আর কারা বাদ পড়েছেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, নতুন তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটির সভার কার্যবিবরণী, সুপারিশ, অনুমোদন এবং উপাচার্যের সম্মতিসংক্রান্ত নথি যাচাই করা হোক। আগের তালিকা পুনর্বিবেচনা করা হয়ে থাকলে কখন, কেন এবং কার সিদ্ধান্তে তা করা হয়েছে, সে তথ্যও প্রকাশ করতে হবে। কারণ, পুরস্কারের জন্য একবার নির্বাচিত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হলে তার যৌক্তিকতা সংশ্লিষ্টদের জানানো প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অংশ।

নীতিমালায় স্বর্ণপদক দেওয়ার বিধান
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি একাডেমিক কাউন্সিলের ১৯তম সভার সুপারিশের ভিত্তিতে ২৪ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেটের ২৫৫তম সভায় সংশোধিত অ্যাওয়ার্ড নীতিমালা অনুমোদিত হয়। নীতিমালায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতক (পাস) কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্কোর অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের পুরস্কারের জন্য বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। অনার্সের ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জনকারী একজন শিক্ষার্থী নির্বাচনের বিধান রয়েছে। ফল সমান হলে এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নীতিমালার অষ্টম ধারায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের সনদ ও স্বর্ণপদক দেওয়ার উল্লেখ রয়েছে।

এখন যাচাইয়ের বিষয়, ২০২৪ সালের ১৩০ শিক্ষার্থীর নির্বাচন ও ২০২৬ সালের ৫৮ শিক্ষার্থীর পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে নীতিমালা কীভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। তবে তালিকার পার্থক্য একাই অনিয়মের প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, অনুমোদন ও যোগ্যতা যাচাইয়ের নথি পর্যালোচনা করেই বিষয়টি স্পষ্ট করা সম্ভব।

সাক্ষাৎ না পাওয়ার অভিযোগ, দুদকের অপেক্ষা
পুরস্কারবঞ্চিত কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও তাঁরা সাক্ষাৎ পাননি। তাঁদের জানানো হয়েছে, অফিস থেকে সনদ সংগ্রহ করা যাবে; তবে নতুন করে অ্যাওয়ার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে না। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, তাঁদের নির্বাচনের সিদ্ধান্ত বহাল আছে কি না, আর পরিবর্তন হয়ে থাকলে কেন—এটুকু জানানোও কি সম্ভব নয়?

দুদকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩০ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া নিয়ে একটি অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগ যাচাই করে সিদ্ধান্তের জন্য কমিশনে উপস্থাপন করা হবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন তদন্তে নির্ধারিত হতে পারে, তালিকা পরিবর্তনের পেছনে কী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল এবং পদক তৈরির উদ্যোগ বাস্তবে কত দূর এগিয়েছিল। ২০২৪ ও ২০২৬ সালের তালিকা, অনুমোদনের নথি এবং আর্থিক হিসাব যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব। তত দিন পর্যন্ত ১৩০ শিক্ষার্থীর পুরস্কারপ্রাপ্তি এবং তাঁদের জন্য প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া স্বর্ণপদকের বর্তমান অবস্থান—দুই প্রশ্নই রয়ে যাচ্ছে অমীমাংসিত।

কালের আলো/জেএন/এমকে

Link copied!