কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগের এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ফারজানা ইসলাম নামের ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর স্বামী নাজমুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার আগে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে কিছু বলতে রাজি হয়নি।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সাইনবোর্ড এলাকার স্বামীর বাসা থেকে ফারজানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর স্বামী নাজমুল ইসলাম একই বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
বিয়ের পর নির্যাতনের অভিযোগ পরিবারের
ফারজানার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন তাঁর স্বামী। প্রায় তিন বছর আগে একই বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এরপর থেকে দাম্পত্য জীবনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
ফারজানার ভাই আরিফুল ইসলাম জানান, তাঁর বোনের পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, নাজমুল প্রথমদিকে বেকার থাকলেও চাকরি পাওয়ার পর অর্থের চাহিদা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে অর্থের জন্য চাপ দেওয়ার পাশাপাশি ফারজানার ওপর নির্যাতনও চলতে থাকে।
নারী নির্যাতনের মামলা করেছিলেন ফারজানা
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে মারধরের শিকার হয়ে ফারজানা স্বামীর বাসা ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। পরে এ ঘটনায় তিনি নারী নির্যাতনের মামলা করেন।
পরিবারের দাবি, মামলার পর নাজমুলের পরিবারের সদস্যরা ভবিষ্যতে আর নির্যাতন করা হবে না বলে আশ্বাস দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। পরে দুই পরিবারের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে মামলাটি প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ফারজানার ভাই আরিফুলের অভিযোগ, ঘটনার আগের দিন বিকেলে নাজমুলের দুলাভাই তাঁকে ফোন করে মামলা প্রত্যাহার হয়েছে কি না, তা জানতে চান। জবাবে তিনি জানান, মামলা প্রত্যাহার হয়ে গেছে এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্রও পাওয়া গেছে বলে তিনি জানেন।
পরিবারের দাবি, মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ফারজানাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে এটি পরিবারের অভিযোগ; পুলিশি তদন্ত ও ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও কথা হয়েছিল ভাইয়ের সঙ্গে
আরিফুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাঁর সঙ্গে ফারজানার কথা হয়েছিল। তখন বোনের কথাবার্তায় অস্বাভাবিক কিছু বুঝতে পারেননি তিনি। রাতে খাওয়ার জন্য ফারজানা চিপস ও কোমল পানীয়ও কিনেছিলেন বলে জানান আরিফুল।
তবে রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে তাঁকে ফোন করে ফারজানার মৃত্যুর খবর জানানো হয়। হঠাৎ এমন খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গাজী সুমন মাহতাব জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফারজানাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পায়। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী নাজমুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ঘটনাটি আত্মহত্যা হতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
ফারজানার মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতন ও পরিকল্পিত হত্যার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
কালের আলো/এসএ/এমএএইচ
