রংপুর সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ১১:০৯ এএম

অনাবাদি জমিতে তেজপাতা চাষ, কাউনিয়ার কৃষকের ঘরে বাড়তি আয়

রংপুর সংবাদদাতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ১১:০৯ এএম

অনাবাদি জমিতে তেজপাতা চাষ, কাউনিয়ার কৃষকের ঘরে বাড়তি আয়

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের বাজেমসকুর গ্রামে তেজপাতা চাষ বদলে দিচ্ছে কৃষকের আয়ের চিত্র। বাড়ির আঙিনা, গ্রামীণ সড়কের পাশ, ক্ষেতের আইল কিংবা অনাবাদি পতিত জমি—যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই দেখা মেলে তেজপাতার গাছ। অল্প খরচ, কম পরিচর্যা এবং দীর্ঘদিন ধরে পাতা সংগ্রহের সুযোগ থাকায় স্থানীয় কৃষকদের কাছে তেজপাতা এখন বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস।

তেজপাতা চাষের বিস্তার শুধু বাজেমসকুর গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। টেপামধুপুরের চৈতারমোড়, রাজীবসহ আশপাশের গ্রামেও বাড়ছে এ মসলাজাতীয় ফসলের আবাদ। উৎপাদিত পাতার ক্রেতা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান। এখানকার তেজপাতা দেশের বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সৌদি আরব, দুবাই ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

৩০ হাজার টাকা খরচে আয় দুই লাখ

বাজেমসকুর গ্রামের তেজপাতাচাষি আবু সুফিয়ান জানান, তিনি ৬৬ শতক জমিতে সাড়ে তিন শ তেজপাতার গাছ লাগিয়েছিলেন। এ জন্য তাঁর খরচ হয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এখন পর্যন্ত তিনি অন্তত দুই লাখ টাকা আয় করেছেন। আবু সুফিয়ানের ভাষ্য, একবার গাছ লাগালে দীর্ঘদিন ধরে সেখান থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। ফলে বারবার নতুন করে জমিতে ফসল লাগানোর প্রয়োজন হয় না। তেজপাতা বিক্রির জন্যও তাঁকে খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় না। বিভিন্ন ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠান সরাসরি বাগান থেকে পাতা কিনে নিয়ে যায়। কৃষকের এই অভিজ্ঞতা স্থানীয়ভাবে তেজপাতা চাষের সম্ভাবনা তুলে ধরছে। তবে জমির পরিমাণ, গাছের বয়স, উৎপাদন ও বাজারদরের ওপর কৃষকের প্রকৃত লাভ নির্ভর করে।

ধান-ভুট্টা ছেড়ে তেজপাতা চাষে আশরাফুল

একই গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম আগে ধান, ভুট্টা ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করতেন। এখন তাঁর পুরো জমিতেই তেজপাতার গাছ রয়েছে। আশরাফুল জানান, তেজপাতা চাষে তুলনামূলকভাবে পরিশ্রম ও খরচ কম, অথচ আয় বেশি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রথম বছরে তিনি তিন মণ পাতা বিক্রি করেছিলেন। বর্তমানে বছরে প্রায় ১৬ মণ তেজপাতা বিক্রি করেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, সময়ের সঙ্গে গাছ বড় হওয়ার পর পাতা সংগ্রহের পরিমাণও বেড়েছে। এ কারণে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তেজপাতা চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

প্রতিটি গাছ থেকে বছরে ২৫ থেকে ৪০ কেজি পাতা

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি তেজপাতাগাছ থেকে বছরে গড়ে ২৫ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত পাতা সংগ্রহ করা হয়। উৎপাদিত পাতা বিক্রির জন্য কৃষকদের সব সময় দূরের বাজারে যেতে হয় না। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাগান থেকেই কাঁচা পাতা কিনে নেন। কেউ কেউ আবার পুরো মৌসুমের জন্য বাগান ইজারা নেন। এতে কৃষকেরা আগেই ক্রেতা নিশ্চিত করতে পারেন, আর ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট সময় ধরে পাতা সংগ্রহের সুযোগ পান। তবে উৎপাদনের পরিমাণ গাছের বয়স, পরিচর্যা ও অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তাই সব বাগানে একই পরিমাণ পাতা পাওয়া যায় না।

সপ্তাহে ৩০০ বস্তা তেজপাতা পাঠানো হয় ঢাকায়

চৈতারমোড় এলাকার তেজপাতা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতি সপ্তাহে কাউনিয়া থেকে প্রায় ৩০০ বস্তা তেজপাতা কিনে ঢাকায় পাঠান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি তেজপাতা ১০৮ থেকে ১১২ টাকায় বিক্রি হয়। রফিকুল ইসলাম বলেন, এখানকার তেজপাতার মান ভালো হওয়ায় রপ্তানিকারকেরা তা সৌদি আরব, দুবাই ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে পাঠান। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি স্কয়ার, প্রাণ, পুষ্টি, তীর ও ইস্পাহানিসহ বিভিন্ন পরিচিত কোম্পানিও সরাসরি তেজপাতা কেনে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে উৎপাদিত পাতা বিক্রির জন্য কৃষকদের বাজার খোঁজার চাপ তুলনামূলকভাবে কম।

৬৫ হেক্টর জমিতে তেজপাতার আবাদ

কাউনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সালাহউদ্দিন জানান, কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সম্ভাবনা থাকায় তেজপাতা এ অঞ্চলের কৃষকদের কাছে লাভজনক ফসল হয়ে উঠেছে। বর্তমানে কাউনিয়া এলাকায় ৬৫ হেক্টর জমিতে তেজপাতার আবাদ হচ্ছে। তিনি আরও জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত চাষিদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। তেজপাতা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ার পেছনে কম পরিচর্যা, দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন এবং সহজে বাজারজাত করার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সঠিক পরিচর্যা, মানসম্মত উৎপাদন ও বাজারের চাহিদা বজায় থাকলে কাউনিয়ার এই চাষ স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!