ময়মনসিংহ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১, ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

লাইসেন্সের ফাঁসে থমকে গেছে দেশের প্রথম কুমির খামার

ময়মনসিংহ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১, ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

লাইসেন্সের ফাঁসে থমকে গেছে দেশের প্রথম কুমির খামার

ময়মনসিংহের ভালুকায় দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কুমির খামারে বর্তমানে হাজারো কুমির থাকলেও লাইসেন্স জটিলতায় বন্ধ রয়েছে চামড়া ও মাংস রপ্তানি। ফলে কুমিরের খাবার, পরিচর্যা, কর্মীদের বেতন ও সরকারি ফি পরিশোধসহ খামার পরিচালনার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। খামারে নিয়মিত খাবার ও পরিচর্যার ঘাটতির অভিযোগও উঠেছে।

ভালুকার হাতিবেড় গ্রামে ১৩ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর ২০০৪ সালে মালয়েশিয়া থেকে ৭৫টি কুমির এনে ‘রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড’ নামে খামারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। উদ্যোক্তা ছিলেন লেখক ও ব্যবসায়ী মুশতাক আহমেদ এবং মেজবাউল হক।

খামারটি চালুর প্রায় এক দশক পর কুমিরের চামড়া রপ্তানি শুরু হয়। প্রথম চালানে প্রায় ৪৫০টি চামড়া বিদেশে রপ্তানি করে আড়াই লাখ ডলার আয় করে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে ৪৩০টি, ২০১৫ সালে ৪০০টি, ২০১৬ সালে ২০০টি, ২০১৮ সালে ২২৬টি এবং ২০১৯ সালে ২৫১টি কুমিরের চামড়া জাপানে রপ্তানি করা হয়। প্রথম পাঁচ বছরে মোট ১ হাজার ৫০৭টি চামড়া রপ্তানি হয়, প্রতিটির দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার।

তবে ২০২০ সালের পর কুমিরের চামড়া রপ্তানির আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ সময় খামারে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার অভিযোগও ওঠে।

মালিকানা নিয়ে জটিলতার পর ২০২২ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে কুমির খামার পরিচালনায় ছয় সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। পরে ২০২৩ সালে নিলামের মাধ্যমে খামারের জমি ও কুমির ৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। খামারটি কিনে নেয় বেসরকারি সংস্থা উদ্দীপন।

উদ্দীপন কর্তৃপক্ষের দাবি, খামার কেনার পর নতুন করে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হলেও এখনো লাইসেন্স নবায়ন বা নতুন লাইসেন্স পাওয়া যায়নি। ফলে কুমিরের চামড়া ও মাংস রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না।

খামার সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি কুমির রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০০টি কুমিরের চামড়া রপ্তানির উপযোগী। কুমিরের খাবার বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হয়। পাশাপাশি কর্মীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়ও রয়েছে। বর্তমানে ১০ জন কর্মী দিয়ে বিশাল খামারটি পরিচালনা করা হচ্ছে।

সরেজমিনে খামারের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। কুমিরের পুকুরের পাড়ের বিভিন্ন অংশও ভেঙে গেছে। নিয়মিত খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে খামারের কর্মীরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া কুমির পালন, খামার স্থাপন কিংবা কুমিরের আমদানি-রপ্তানি করা যায় না। পাশাপাশি পজিশন সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো খামারি নিজের মালিকানায় বা দখলে কুমির রাখতে পারেন না। বন বিভাগের নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি কুমিরের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা পজিশন ফি নির্ধারিত রয়েছে।

কুমির প্রকল্পের ব্যবস্থাপক চিকিৎসক আবু সাইম মো. আরিফ বলেন, কুমিরের চামড়া, মাংস ও দাঁত—সবকিছুরই বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে। বন বিভাগের অনুমতি পাওয়া গেলে ৪০০ কুমিরের চামড়া রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

উদ্দীপনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইস্তেয়াক হাসান বলেন, তারা জমিসহ কুমিরগুলো কিনে নিয়েছেন। আগের মালিকের নামে লাইসেন্স ছিল। তারা নতুন করে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন। লাইসেন্স পাওয়া গেলে কুমিরের চামড়া ও মাংস রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

লাইসেন্সের বিষয়ে সংরক্ষক (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল) ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, ফাইল না দেখে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। উদ্দীপনের কর্মকর্তারা তার কাছে এসেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ফার্ম হস্তান্তরের সঠিক কাগজপত্রসহ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে তাদের বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, উদ্দীপনের নামে লাইসেন্স না থাকলেও কুমিরগুলো অবৈধ নয়। কারণ কুমিরগুলো রেপটাইলস ফার্মের নামে থাকা লাইসেন্সের আওতায় রয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!