একসময় অবসর কাটানোর অন্যতম সঙ্গী ছিল বই। গল্প-উপন্যাস, কবিতা কিংবা প্রবন্ধের পাতায় ডুবে থাকতেন পাঠকেরা। বাসা, লাইব্রেরি কিংবা যাত্রাপথে হাতে বই নিয়ে সময় কাটানোর দৃশ্যও ছিল পরিচিত। তবে সময়ের পরিবর্তনে পাঠের ধরনেও এসেছে নতুন মাত্রা। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-বুক ও অডিওবুকের বিস্তারে এখন বই পড়ার অভিজ্ঞতা অনেকটাই বদলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কি সত্যিই কমছে, নাকি কেবল বদলে যাচ্ছে পড়ার মাধ্যম?
প্রযুক্তির প্রসারে বই পড়ার জন্য এখন আর মুদ্রিত বইয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় না। স্মার্টফোনেই পড়া যাচ্ছে গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও নানা ধরনের প্রবন্ধ। অডিওবুকের মাধ্যমে বই শোনার সুযোগও তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যস্ত জীবনে অনেকে যাতায়াতের সময় কিংবা কাজের ফাঁকে ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠের সুযোগ নিচ্ছেন।
তবে ডিজিটাল কনটেন্টের সহজলভ্যতা যেমন পাঠের নতুন দরজা খুলেছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছোট ভিডিও ও অনলাইন বিনোদনের সঙ্গে সময়ের প্রতিযোগিতাও বাড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়ার পরিবর্তে দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা পাঠাভ্যাসের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন।
মুদ্রিত বইয়ের আবেদন কি কমছে?
প্রযুক্তির বিস্তার সত্ত্বেও মুদ্রিত বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বইয়ের পাতা উল্টে পড়া, নিজের পছন্দের অংশে দাগ দেওয়া কিংবা বই সংগ্রহে রাখার অভিজ্ঞতা অনেক পাঠকের কাছে এখনও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বিশেষ করে উপহার হিসেবে বই দেওয়া, ব্যক্তিগত সংগ্রহ গড়ে তোলা এবং বইমেলা থেকে পছন্দের বই কেনার অভ্যাস মুদ্রিত বইকে আলাদা পরিচয় দেয়। তবে পাঠকের আগ্রহের প্রকৃত পরিবর্তন বুঝতে বই বিক্রির পরিসংখ্যান, প্রকাশনা খাতের তথ্য এবং পাঠকের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
স্মার্টফোন কি বইয়ের বিকল্প হয়ে উঠছে?
স্মার্টফোন এখন তথ্য ও বিনোদনের অন্যতম সহজলভ্য মাধ্যম। একই যন্ত্রে সংবাদ পড়া, ভিডিও দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং ই-বুক পড়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে অনেকের পাঠের সময় বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্টের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
একদিকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বই পাওয়া সহজ হওয়ায় নতুন পাঠক তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে নোটিফিকেশন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য কনটেন্টের কারণে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ উপন্যাস বা বিশ্লেষণধর্মী লেখা পড়তে যে একাগ্রতা প্রয়োজন, তা ধরে রাখতে পাঠককে সচেতনভাবে সময় বের করতে হতে পারে।
তবে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করলেই কেউ কম বই পড়ছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। একজন পাঠক মুদ্রিত বই কম কিনলেও ই-বুক বা অডিওবুকের মাধ্যমে নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারেন। তাই পাঠাভ্যাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু বই কেনার হিসাব নয়, মানুষ কতটা পড়ছেন এবং কী ধরনের লেখা পড়ছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তরুণ প্রজন্মের পাঠাভ্যাসে কী পরিবর্তন আসছে?
তরুণদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাহিত্য, বইয়ের পর্যালোচনা ও লেখকদের পরিচিতি সম্পর্কে জানতে পারছেন। অনলাইনে বই নিয়ে আলোচনা, পাঠকের মতামত এবং বিভিন্ন সাহিত্যভিত্তিক পেজ নতুন বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
আবার ডিজিটাল বিনোদনের বিপুল বিকল্প থাকায় নিয়মিত বই পড়ার জন্য সময় বের করা অনেকের কাছে কঠিন হতে পারে। পড়াশোনার বাইরে অবসর সময়ে বই পড়ার অভ্যাস কতটা বজায় থাকছে, তা জানতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও গ্রন্থাগারিকদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে প্রজন্মভিত্তিক তুলনার পাশাপাশি শহর ও গ্রামের পাঠক, বিভিন্ন বয়সের মানুষ এবং ভিন্ন আর্থসামাজিক অবস্থার পাঠকদের অভিজ্ঞতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ সবার জন্য বইয়ের প্রাপ্যতা, অবসর সময় ও ডিজিটাল সুবিধা এক রকম নয়।
পাঠক তৈরি করতে লাইব্রেরি ও প্রকাশকদের ভূমিকা
পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঠাগার, প্রকাশক ও সাহিত্য সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুদের ছোটবেলা থেকে বইয়ের সঙ্গে পরিচিত করা, স্কুলে নিয়মিত পাঠচর্চার সুযোগ তৈরি এবং স্থানীয় পাঠাগারগুলোকে সক্রিয় রাখা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
একই সঙ্গে পাঠকের আগ্রহ অনুযায়ী মানসম্মত বই প্রকাশ, বই সম্পর্কে সহজবোধ্য আলোচনা এবং লেখক-পাঠকের যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগও প্রয়োজন। মুদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক ও অডিওবুকের মতো মাধ্যমকে কাজে লাগানো গেলে ভিন্ন ধরনের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কমছে পাঠ, নাকি বদলাচ্ছে অভ্যাস?
বই পড়ার অভ্যাস কমছে কি না, তার উত্তর কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পাঠাভ্যাসবিষয়ক জরিপ, বই বিক্রির তথ্য, গ্রন্থাগারের ব্যবহার এবং ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠের পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রযুক্তি মানুষের পড়ার সুযোগ ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন সব পাঠকের ক্ষেত্রে একই রকম নয়। কেউ মুদ্রিত বইয়ের প্রতি আগ্রহ ধরে রেখেছেন, কেউ ডিজিটাল মাধ্যমে ঝুঁকেছেন, আবার কেউ নানা ধরনের বিনোদনের চাপে নিয়মিত পড়ার সময় হারাচ্ছেন।
বই পড়ার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য তাই শুধু মুদ্রিত বইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর কথা বললেই হবে না; বরং মানুষের মধ্যে নিয়মিত পড়ার আগ্রহ, মনোযোগ ও সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। মাধ্যম বদলাতে পারে, কিন্তু জ্ঞান অর্জন, কল্পনাশক্তির বিকাশ এবং গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য পাঠের গুরুত্ব রয়ে যায়।
প্রশ্নটি তাই শুধু মানুষ বই পড়ছে কি না, তা নয়; বরং তারা কী পড়ছে, কতটা পড়ছে এবং পড়ার জন্য কতটা সময় দিচ্ছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কালের আলো/জেএন/এসএ
