শিক্ষা, আশঙ্কা, কুশিক্ষা

প্রকাশিতঃ 10:33 am | November 17, 2022

রেজানুর রহমান :

আমি খুব স্বস্তিতে আছি যে আমার বাবা বেঁচে নেই। অনেকে হয়তো অবাক হচ্ছেন। কেউ কেউ হয়তো ইতোমধ্যে আমার ওপর রুষ্ট হয়ে গাল-মন্দ শুরু করে দিয়েছেন। এই লোক বলে কী। বাবা বেঁচে নেই এটা কি স্বস্তির কথা? না, স্বস্তির কথা নয়। বাবা হলেন সন্তানের সাহস। মাথার ওপর নির্ভরতার ছাদ। যার বাবা নেই সেই মর্মে মর্মে টের পায়, হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে বাবা না থাকলে জীবনটা কেমন হয়। আমার বাবা বেঁচে নেই। অথচ আমি স্বস্তিতে আছি এটা কেমন কথা? বোধকরি এ ব্যাপারে একটা ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

তার আগে আমার বাবার একটা পরিচয় দিয়ে নিই। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে সাবর্ডিনেট কলোনি নামে একটি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। দেশ-বিদেশে তাঁর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় জড়িয়ে আছেন। সবাই তাকে ‘খেলার স্যার’ বলে বেশি চেনে। কেন তিনি ‘খেলার স্যার’ নামে পরিচিত? তারও একটা ব্যাখ্যা আছে।

দেশ স্বাধীনের আগের কথা বলছি। তখনকার দিনে সাবর্ডিনেট কলোনি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সৈয়দপুর শহরে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। রেল কারখানার বাবু অর্থাৎ অফিসারদের ছেলেমেয়েরা এই স্কুলে পড়তো। ক্লাস ওয়ানের ভর্তি পরীক্ষার ৭০টি আসনের জন্য কখনও ২ হাজার কখনও আড়াই হাজার বাচ্চা ভর্তি পরীক্ষা দিতো। দুটি সেকশনে ৩৫+৩৫ মোট ৭০টি বাচ্চাকে ভর্তি করে নেওয়া হতো। এদের মধ্যে ক্লাসে অমনোযোগী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাচ্চার লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগ সৃষ্টি করতে আমার বাবা বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে স্কুলে খেলাধুলা অর্থাৎ শরীরচর্চা জাতীয় নানা ধরনের আনন্দময় গেম উদ্ভাবন করেন। ফলে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি দারুণভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠে। ‘খেলার স্যার’ নামে বাবার নতুন পরিচয় ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরের বছর স্কুলটিতে ভর্তি ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা উল্লেখজনক হারে বেড়ে যায়।

শিক্ষক পিতার জন্য আমাদের অনেক গর্ব। তবু কেন তার অবর্তমানে স্বস্তি প্রকাশ করছি, এবার তার ব্যাখ্যা দিতে চাই।

তার আগে একটি ছোট ঘটনা উল্লেখ করি। একদিনের ঘটনা। স্কুলের ছুটি হয়েছে। বাবা বাসায় ফিরেছেন। কিন্তু তিনি স্বাভাবিক আচরণ করছেন না। বেশ অস্থির। মা বারবার জিজ্ঞেস করছেন– কী হয়েছে তোমার? খুলে বলো। স্কুলে কোনও সমস্যা হয়েছে?

বাবা হঠাৎ বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, বেনু (আমার মায়ের ডাকনাম) আমি আজ একটা মারাত্মক অন্যায় করেছি…।

মা অবাক কণ্ঠে জানতে চাইলেন– তুমি অন্যায় করেছো? ঘটনা কী? আমাকে খুলে বলো…।

বাবা চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, আমি আজ স্কুলে একজন ছাত্রকে খুব মেরেছি। সাধারণ একটা অঙ্ক ভুল করেছে। আমি মেনে নিতে পারিনি। বেত দিয়ে তার হাতে মেরেছি। এখন মনে হচ্ছে কাজটা আমি ঠিক করিনি। একজন ছাত্র সাধারণ একটা অঙ্কে ভুল করবে এজন্য দায়টা তো শুধু তার নয়। দায় শিক্ষকেরও আছে। শিক্ষক হিসেবে আমি দায় এড়াতে পারি না। যাই ছেলেটাকে একবার দেখে আসি…।

সেদিন ছাত্রের বাসায় গিয়েছিলেন বাবা। ছাত্রের বাবা-মা রীতিমতো অবাক। বাবা তাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে আপনাদের ছেলেকে অঙ্ক শেখানোর দায়িত্ব আমার’। এই গল্পের একটা সাফল্যজনক সমাপ্তি আছে। বাবার সেই ছাত্র পরবর্তী সময়ে ৫ম ও ৮ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। এসএসসি, এইচএসসি দুই পরীক্ষাতেই রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিল। পরে বুয়েটে পড়াশোনা করেছে। এখন বিদেশে থাকে।

এবার আসল কথায় আসি। শুধু বাবা হিসেবে নয়, এরকম একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক বেঁচে নেই সেটা কীভাবে স্বস্তির বিষয় হয়? স্বস্তির বিষয় এই জন্য যে বাবা এই সময় বেঁচে থাকলে শিক্ষকের অমর্যাদা এবং দায়িত্বহীনতা দেখে খুব কষ্ট পেতেন। যারপরনাই ক্ষুব্ধ হতেন। ব্যথিত হতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশিষ্ট অভিনেত্রী মৌসুমী নাগের একটি পোস্ট পড়লাম। এটি একটি সংগৃহীত পোস্ট। কোনও একটা স্কুলে বাচ্চাদের পাঁচটা ফুলের নাম লিখতে দেওয়া হয়। একটি বাচ্চা শিক্ষকের শেখানো ফুলের নাম না লিখে অন্য একটি ফুলের নাম লিখেছে বলে শিক্ষক তার মার্কস কেটেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষক কী করে এটা পারেন? বরং বাচ্চাটি অন্য একটি ফুলের নাম লিখেছে বলে তার তো বাহবা পাওয়ার কথা। অথচ শিক্ষক তার মার্কস কেটে নিয়েছেন। আমার বাবা এই ঘটনা নিশ্চয়ই মেনে নিতে পারতেন না।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষার একটি প্রশ্ন নিয়ে দেশে রীতিমতো তোলপাড় চলছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানো হয়েছে। যার সারমর্ম হলো, হিন্দুর জমি কেনেন একজন মুসলমান। সেখানে তিনি বাড়ি বানান। কোরবানির ঈদে গরু কোরবানি দেন। এই কারণে হিন্দু লোকটি মনের দুঃখে ভারতে চলে যান। প্রশ্নটি কয়েকবার পড়েছি। কোন যুক্তিতে একজন শিক্ষক এ ধরনের সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন করেন। তাও আবার শিক্ষা বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষায় তিনি এই প্রশ্ন করেছেন। আমার বাবা বেঁচে থাকলে এই প্রশ্ন দেখে নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন।

দেশের একজন বরেণ্য লেখককে নিয়েও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের একটি পরীক্ষায় খুবই আপত্তিকর, অসম্মানজনক প্রশ্ন যুক্ত করা হয়েছে। একজন লেখক তিনি ভালো লেখেন না খারাপ লেখেন এটা কি কোনও পরীক্ষার প্রশ্ন হতে পারে? তাও আবার লেখকের নাম উল্লেখ করে প্রশ্নটি করা হয়েছে। আমি লিখি। ভালো লিখি না খারাপ লিখি তার বিচার করবেন পাঠক। এ নিয়ে বোর্ডের পরীক্ষায় প্রশ্ন তুলে দেওয়ার যুক্তি কী?

পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে সারা দেশে এত হইচই হবে এটা কল্পনারও বাইরে ছিল। শুধু কি প্রশ্নপত্রের অস্থিরতার সঙ্গে সম্মানিত শিক্ষকরা জড়িত? পরীক্ষার আগে প্রশ্নফাঁস করে দিচ্ছেন কেউ কেউ। একজন শিক্ষক কী করে এটা পারেন? অর্থের প্রলোভনে শিক্ষক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস করেছেন। এ ধরনের অনৈতিক কাজ যে শিক্ষক পারেন তিনি কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের নৈতিকতা শিক্ষা দেবেন? আমার বাবা বেঁচে থাকলে এটা মেনে নিতে পারতেন না।

অনেকে হয়তো বলবেন, প্রশ্ন প্রণয়ন ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গের দেশের বৃহৎ শিক্ষক সমাজ জড়িত নয়। কাজেই ঢালাওভাবে সম্মানিত শিক্ষকদের দায়ী করা সঠিক হবে না। এই কথায় যুক্তি আছে। গুটি কয়েক শিক্ষকের অপকর্মের দায় তো দেশের শিক্ষক সমাজ নিতে পারেন না। তবে একটা কথা আছে। এক বালতি দুধ নষ্ট করার জন্য এক ফোঁটা লেবুর রসই যথেষ্ট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, আমাদের শেষ ভরসার জায়গাটুকুও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকরাই তো নতুন প্রজন্ম তৈরি করেন। তারাই যখন প্রশ্নফাঁসে জড়িয়ে পড়েন, তখন ভরসার জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে যায়। সত্যি বলতে কী, বাংলাদেশে বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই হ-য-ব-র-ল। প্রযুক্তিগত ফাঁকফোকর তো রয়েছেই। উপরন্তু যারা শিক্ষা দেখভালের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের অনেকের দেশপ্রেম বা দেশের প্রতি আনুগত্য প্রশ্নবিদ্ধ…।

সবার প্রিয় শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পরে তো আর কথা থাকে না। তিনি যথার্থই বলেছেন, দেশপ্রেম না থাকলে একজন শিক্ষক প্রকৃত শিক্ষক হয়ে উঠতে পারবেন না। আবারও আমার পিতার কথা বলি। শিক্ষকতার বাইরে ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থে তাকে অনেক কিছু করতে দেখেছি। প্রতিদিন স্কুলে ক্লাস শুরুর আগে অ্যাসেম্বলি করানো, সুশৃঙ্খলভাবে শ্রেণিকক্ষে ঢোকা থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীদের হাতের নখ, মাথার চুল, পায়ের স্যান্ডেল এবং ড্রেসের প্রতিও নজর রাখতেন। প্রতিবছর স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপরও ছাত্রছাত্রীদের পুরস্কার দেওয়া হতো। হাতের লেখা ও শুদ্ধ বানান চর্চার প্রতি বেশ জোর দিতেন তিনি। ছোটদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক ক্লাবও গঠন করেছিলেন। এই ক্লাবের উদ্যোগে ছবি আঁকা, সংগীত ও অভিনয় শিক্ষা দেওয়া হতো।

বাবার উদাহরণ দিতে গিয়ে একটু সংকোচবোধ হচ্ছে আমার। তবে তাঁর কথা উল্লেখ করলাম এ জন্য যে আন্তরিকতা, বিশেষ করে দেশপ্রেম থাকলে একজন শিক্ষকের পক্ষেও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পজিটিভ অর্থে বদলে দেওয়া সম্ভব। গুলশান বাড্ডা এলাকায় লেকের ধারের একটি বেসরকারি কিন্ডার গার্টেন স্কুলের উদাহরণ টেনে লেখাটি শেষ করি। প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার পথে দেখি একটি বাড়ির প্রবেশমুখের বারান্দায় স্কুলটির ২০-২৫ জন শিক্ষার্থীকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ানো হচ্ছে। এসময় বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন কয়েকজন তরুণ শিক্ষক-শিক্ষিকা। তাদেরই একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এত ছোট জায়গায় এত বড় কাজ প্রতিদিন করেন কীভাবে? তার সহজ সাবলীল উত্তর ছিল এমন, বুকে যদি থাকে দেশপ্রেম তাহলে সবই সম্ভব। হ্যাঁ, এটাই সত্যি। শিক্ষা, অশিক্ষা আর কুশিক্ষা একসঙ্গে চলতে পারে না। দেশের বর্তমান উন্নয়ন, অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে এর একটা সন্তোষজনক সমাধান হওয়া জরুরি।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক-আনন্দ আলো

Print Friendly, PDF & Email