বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা নয়, কখনও হবেও না

প্রকাশিতঃ 10:42 am | July 15, 2022

প্রভাষ আমিন :

চোখের সামনে একটি দেশকে দেউলিয়া হয়ে যেতে দেখার মতো বাজে অভিজ্ঞতা আর হতে পারে না। একসময় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের দেশ শ্রীলঙ্কা আজ কার্যত ব্যর্থ, দেউলিয়া একটি রাষ্ট্র। শতভাগ শিক্ষিত মানুষের দেশ শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বিশ্বেও খুব পরিচিত নাম। বাংলাদেশেও শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের অনেক অনুরাগী আছে। ছবির মতো সুন্দর দেশটির অন্যতম আয়ের উৎস ছিল পর্যটন। সব শেষ হয়ে গেছে। শ্রীলঙ্কায় এখন হাহাকার। স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে দেশটি।

জ্বালানি তেলের জন্য লম্বা লাইন, বিদ্যুৎ নেই, খাবার নেই, শিশুদের দুধ নেই, এমনকি স্কুল চালানোর মতো খাতা-কলমও নেই। মূলত রাজাপাকসে পরিবারের একক নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতি, সামর্থ্যের বেশি ঋণ করা, সেই ঋণের টাকায় অপ্রয়োজনীয় ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাস্তবায়ন, টাকা পাচার আর একের পর এক ভুল নীতি দেশটিকে এমন ধ্বংসের কিনারে দাঁড় করিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সব পদই ছিল রাজাপাকসে পরিবারের দখলে। অর্থনৈতিক সংকট ছিল আগে থেকেই। তবে রাজাপাকসে পরিবার চেষ্টা করছিল চাকচিক্যের আড়ালে দৈন্যকে ঢেকে রাখতে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। আস্তে আস্তে সংকট ঘনীভূত হয়। যখন পেটে টান পড়ে, তখন মানুষ নেমে আসে রাস্তায়।

গত মার্চ থেকেই চলছিল বিক্ষোভ। আসলে বিক্ষোভ না করে শ্রীলঙ্কার মানুষের সামনে আর কোনও বিকল্প ছিল না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল সবার। বাঁচতে হলে ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়তেই হবে। সেটাই করছিলেন তারা। বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ্র রাজাপাকসে, অর্থমন্ত্রী বাসিল রাজাপাকসে বিদায় নিয়েছিলেন আগেই। বাকি ছিলেন পালের গোদা প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। গত ৯ জুলাই ঘটে এক অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থান। বিক্ষোভকারীরা দখল করে নেয় প্রেসিডেন্টের বাসভবন। সেখানে কেউ কেউ প্রেসিডেন্টের সুইমিং পুলে নেমে যায়, কেউ কেউ রাজকীয় বিছানায় একটু আয়েশ করে নেয়, কারও কারও খায়েশ হয় রাজকীয় খাবার খাওয়ার। তবে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের কোনও ক্ষতি করেনি বিক্ষোভকারীরা। তারা জানে এটা গোতাবায়ার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, শ্রীলঙ্কারই সম্পদ।

প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ থেকে উদ্ধার করা টাকাও তারা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে। অবশ্য বিক্ষোভকারীরা বাসভবন দখলে নেওয়ার আগেই নিরাপদে পালিয়ে এক সামরিক ঘাঁটিতে আশ্রয় নেন গোতাবায়া। শনিবারেই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তা কার্যকর হবে বুধবার। তার লক্ষ্য ছিল দেশ ছেড়ে পালানো। তার আশঙ্কা ছিল, পদত্যাগ করলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে। প্রেসিডেন্টকে গ্রেফতারের সুযোগ নেই, তাই তিনি প্রেসিডেন্ট থেকেই পালাতে চেয়েছিলেন। তবে দুবাই পালাতে বিমানবন্দরে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। নৌপথে পালাতে চেয়েও পারেননি। শেষ পর্যন্ত সামরিক বিমানে মালদ্বীপ যেতে পেরেছেন। তবে সেখানেও স্বস্তিতে নেই, বিক্ষোভ হচ্ছে মালেতেও। শেষ খবর হলো, মালদ্বীপ থেকে সিঙ্গাপুরে পালাচ্ছেন গোতাবায়া। তার পলায়নের মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কার রাজনীতির আকাশ থেকে রাজাপাকসে পরিবারের রাহু আপাতত দূর হলো। তবে অর্থনৈতিক সংকটের কালো মেঘ কীভাবে কাটবে, কবে কাটবে সেটা কেউ জানে না এখনও।

বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বরাবরই দারুণ আগ্রহ। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট নিয়েও বাংলাদেশের মানুষের প্রবল আগ্রহ। শুধু শ্রীলঙ্কা নয়; ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ইউক্রেন- সব দেশের রাজনীতি নিয়েই বাংলাদেশের মানুষের প্রবল আগ্রহ। শ্রীলঙ্কা নিয়ে আগ্রহটা একটু বেশি। যারা বাংলাদেশে ক্ষমতার বদল চান, তারা শ্রীলঙ্কার অভ্যুত্থান দেখে নিজেরাও অভ্যুত্থানের স্বপ্ন দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ইশারা-ইঙ্গিতে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তবে সরকারবিরোধী যারা দেশের বাইরে থাকেন, তারা ইশারা-ইঙ্গিতের ধার ধারেননি। এক প্রবাসী সাংবাদিক শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ দখলের ছবি দিয়ে লিখেছেন, গণভবন দখলের ছবি আরও সুন্দর হবে। তবে সেটা কবে হবে, তা তারা জানেন না।

‘ঈদের পরে আন্দোলন’-এর স্বপ্ন দেখা দলের লোকজন স্বপ্ন দেখতে যতটা পারদর্শী, সেটা বাস্তবায়নে ততটাই অপারগ। গণমাধ্যমে শ্রীলঙ্কার কাভারেজ দেখেও বলে দেওয়া যায় কোন পত্রিকা কোন পন্থী। সরকারবিরোধী পত্রিকাগুলো শ্রীলঙ্কা ইস্যুর বিশাল কাভারেজ দিয়েছে, তাদের উচ্ছ্বাসটাও গোপন থাকেনি।

২০০৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ ২০১৪ ও ২০১৮ সালের দুটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় আছে। এমনিতে বাংলাদেশে এক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেই একটি দলের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে যায়। সেখানে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগেরও নিশ্চয়ই জনপ্রিয়তা আগের জায়গায় নেই। দেশকে একটি শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করালেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগও কম নেই। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রশ্নে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে এন্তার অভিযোগ। দুর্নীতি, অর্থপাচার, স্বজনপ্রীতির অভিযোগও কম নয়।

একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোয় একটি দলকে ক্ষমতা থেকে হটানোর দুটি উপায়। আওয়ামী লীগকে হটানোর দুটি রাস্তা। এক হলো, নির্বাচনের মাধ্যমে জনরায় নিয়ে সরকার হটানো। কিন্তু বিরোধীদের ধারণা আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগকে হটানো যাবে না। আর দ্বিতীয় উপায় হলো, মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে শ্রীলঙ্কার মতো তীব্র গণ-আন্দোলনে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা। কিন্তু আমাদের বর্তমান বিরোধী শক্তি তার কোনোটাই করতে পারছে না। তাই তারা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছে, কখন কোনও দৈবশক্তি বাংলাদেশে একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেবে।

ভারতে কংগ্রেস সরকারের অবসানেও এই মহলটি উৎফুল্ল হন, ভাবেন বিজেপি সরকার আওয়ামী লীগকে হটিয়ে দেবে। তালেবানরা আফগানিস্তান দখলের পর সে দেশের বিমানবন্দরে দেশ ছাড়তে চাওয়া মানুষের ঢল নেমেছিল। তখন বাংলাদেশের অনেকে বলেছিলেন, একদিন বাংলাদেশের বিমানবন্দরেও এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। পাকিস্তানে ইমরান খানের পতনের পরও অনেকে উৎফুল্ল হয়েছিলেন, এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশেও ক্যু করার সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর অনেকে বলেছিলেন, এরপর সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসছে। এখন তো শ্রীলঙ্কার অভ্যুত্থান দেখে উল্লাসের বান ডাকে তাদের মধ্যে। তারা অঙ্ক করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, বাংলাদেশও শিগগিরই দেউলিয়া হয়ে যাবে, বাংলাদেশেও অভ্যুত্থান হবে। তাদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কার মতো দেউলিয়া হয়ে যাওয়াটা বুঝি আনন্দের ব্যাপার। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার গল্প অনেক শুনেছি। কিন্তু দেশকে দেউলিয়া বানিয়ে সরকার পতনের স্বপ্ন দেখা মানুষগুলোর ভাবনা দেখে অবাক না হয়ে পারছি না। যারা আওয়ামী লীগের পতন চাইতে বাংলাদেশকে দেউলিয়া বানাতে দ্বিধা করেন না, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়।

আওয়ামী লীগ অনেক খারাপ কাজ যেমন করেছে, অনেক অনেক ভালো কাজও করেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। করোনার ধাক্কা সামলে অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করছিল, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সেই লড়াইকে কঠিনতর করে তুলেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটা কঠিন সময় পার করছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, মুদ্রাস্ফীতির চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে, দুই বছর পর রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমেছে, বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়েও সরকার প্রবল চাপে আছে। অনেকেই ভাবছেন, এই সংকট বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার পথে নিয়ে যাবে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার সংকট আর বাংলাদেশের সংকট এক নয়। শ্রীলঙ্কার সংকট শুরু হয়েছে যুদ্ধের আগেই। আর যুদ্ধের কারণে এখনকার যে সংকট সেটা শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা বিশ্বের। এখনকার সংকটটা আসলে আমদানি করা। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথেই সংকট ওঠানামা করবে। সংকট মোকাবিলায় সাশ্রয়ের নীতি নিয়েছে সরকার। এছাড়া আসলে আর কোনও উপায় নেই। আমদানি কমানো, রফতানি বাড়ানোর মাধ্যমে রিজার্ভের অবনতি ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে। যতদিন যুদ্ধের প্রভাব থাকবে, ততদিন সামগ্রিকভাবে আমাদের মিতব্যয়ী থাকতে হবে, রাশ টানতে হবে চাহিদার। যুদ্ধ আসলে একটা ঝড়ের মতো। যার ঝাপটা সবার ঘরেই লাগবে। আপনার ঘর যদি মজবুত হয়, তাহলে আপনার গায়ে ঝড়ের ঝাপটা কম লাগবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত এখন অনেকটাই মজবুত, তাই যুদ্ধের ঝড় আমাদের হয়তো উড়িয়ে নিতে পারবে না, তবে ঝাপটা তো কম বেশি লাগবেই।

বিপদে-আপদে আমরা নিজেদের পারিবারিক ব্যয় যেমন কাটছাঁট করি, রাষ্ট্রেরও তেমন কাটছাঁট করতে হয়।

শ্রীলঙ্কা সামর্থ্যের অনেক বেশি ঋণ নিয়েছিল, সেই ঋণে তারা বিনিময় আসবে না জেনেও দেখনদারি প্রকল্প বানিয়েছে। ভুল নীতিতে ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের সংকট নেই। বাংলাদেশ কেন শ্রীলঙ্কা হবে না, তা অর্থনীতিবিদরা নানা পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন আগেই। সাধারণ চোখেও আমরা বুঝি, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা নয়, কখনও হবেও না। দেশকে যদি ভালোবাসেন, তাহলে আমাদের সবার দায়িত্ব হলো, নিজ নিজ জায়গা থেকে সংকট উত্তরণে কাজ করা। বাংলাদেশ আর আওয়ামী লীগ এক নয়। আওয়ামী লীগের পতন দেখতে যারা বাংলাদেশকে দেউলিয়া বানাতে চান, তারা আর যাই হোক দেশপ্রেমিক নন। শকুনের মতো অপেক্ষা করা কোনও কাজের কথা নয়।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Print Friendly, PDF & Email