দুর্গম পাহাড়ে সৈনিকদের সঙ্গে সেনাপ্রধানের ‘দ্বিতীয় ঈদ’, স্নেহ-মমতার বন্ধন বাড়াবে মনোবল

প্রকাশিতঃ 12:47 am | July 11, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে তিনি একটি পরিবার হিসেবেই দেখেন। এই পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেন সৈনিকরা। যারা আনন্দ-খুশির ঈদেও পরিবারের মায়া ত্যাগ করে দুর্গম পাহাড়ে জীবন হাতের মুঠোয় নিয়েই দিন-রাত কাজ করে চলেন দেশের তরে।

শান্তি-শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে নিরাপত্তা এবং আর্থ-সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা এসব সৈনিকদের সঙ্গে আবারও ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে প্রচলিত চিত্রই পাল্টে দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ। কথাও বলেছেন একজন অভিভাবকের মতোই। ঈদের সকালে খাওয়া হয়েছে কীনা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বা কোন রকমের অসুবিধা রয়েছে কীনা-সবকিছুই জেনেছেন যেন পরম নির্ভরতার প্রতীক হয়েই।

আপত্য স্নেহ-মমতার চিরন্তন বন্ধনে স্মরণ করিয়ে দিলেন যারা পরিবারের ভেতর সবচেয়ে বেশি কষ্ট করে ‘অভিভাবক’ হিসেবে তাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা। মানবিকতার নান্দনিক বৈভাষিক রূপে অনুভবনীয় মহিমায় তাদের সামগ্রিক খোঁজ খবর নেওয়া। ঈদের প্রকৃত আনন্দ ভাগাভাগি করা।

নব প্রাণের সলতে জ্বালিয়ে নির্মল আনন্দের ফোঁয়ারায় মুহুর্তেই ভুলিয়ে দেন স্বজন থেকে দূরে থাকার ওদের সব কষ্ট। হৃদয়ের পাতা ছুঁয়ে জানিয়ে দেন সৈনিকরা যতো দুর্গম জায়গায় থাকুক না কেন ওদের অভিভাবক এবং নেতৃত্বরা সব সময়ই তাদের কথা মনে রাখে এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকে।

এসব ঘটনা প্রবাহ রোববার (১০ জুলাই) পবিত্র ঈদ-উল-আযহার দিনে। এদিন দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার পাংখুপাড়া আর্মি ক্যাম্প, রাঙ্গামাটির বাঘাইহাট জোন সদর দপ্তর ও খাগড়াছড়ির দিঘীনালা জোন সদর দপ্তর পরিদর্শন করেন সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ।

সৈনিকদের হাতে হাতে তুলে দেন ঈদ উপহারও। নিখাদ আনন্দঘন এমন মুহুর্তে রীতিমতো উচ্ছ্বসিত সেনা সদস্যরাও। তৃণমূলের সৈনিকদের মনোবল বৃদ্ধিতে বাহিনীর সর্বোচ্চ ব্যক্তির সান্নিধ্য দায়িত্ব পালনে তাদের যেন আরও আন্তরিক ও উৎসাহিত করে তুলেছে।

সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন এর আগে ২০২১ সালের বুধবার (২১ জুলাই) পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই সেনা ক্যাম্প পরিদর্শনের মাধ্যমে সৈনিকদের সঙ্গে নিজের প্রথম ঈদ উদযাপন করেছিলেন। রোববার (১০ জুলাই) ফের ঈদ আনন্দ ভাগাভাগির মাধ্যমে আনন্দময় করে তুলেন তাদের ঈদও।

দীর্ঘ বর্ণাঢ্য চাকরি জীবনে জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে কাউন্টার ইন্সারজেন্সি অপারেশন এলাকায় একটি পদাতিক ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে কমান্ড নিযুক্তিতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ফলত পার্বত্য অঞ্চলে সেনাদের প্রতিটি ক্ষণের কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং দায়িত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশের এই ১৭ তম সেনাপ্রধানের।

পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন সৈনিকদেরও। তিনি বললেন, ‘ছুটির দিনেও অনেকে অন ডিউটিতে থাকে। আমার চাকরিই শুরু হয়েছে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে। তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল। কোন যোগাযোগ ছিল না। সেই তুলনায় এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। তারপরেও তোমরা আত্নীয় স্বজন থেকে দূরে। ঈদের পবিত্র দিনে তোমাদের পাশে এসে দাঁড়াতে পেরে আমি খুব আনন্দিত’-বলছিলেন জেনারেল শফিউদ্দিন।

খুশি-আনন্দের ঈদের দিনে দুর্গম পাহাড়ে সৈনিকদের পাশে দাঁড়াতে পেরে নিজেকে পরম ‘ভাগ্যবান’ মনে করেন সেনাপ্রধান। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে সেনা সদর দপ্তর থেকে যারা এসেছেন তাদের সবাইকে দেখে সেনা সদস্য যারা পাহাড়ে রয়েছেন তাদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে তাদের অভিভাবক এবং নেতৃত্বরা তারা যতো দুর্গম জায়গায় থাকুক না কেন তাদের কথা মনে রাখে এবং প্রয়োজনের সঙ্গে তাদের পাশেই থাকে।’

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সেনাবাহিনী প্রধান প্রথমে রাঙ্গামাটির পাংখুপাড়া আর্মি ক্যাম্পে যান। তিনি সেখান থেকে বাঘাইহাট জোন সদর দপ্তরে যান।

এ সময় ড. এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশে বিদেশে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আত্মীয়স্বজন থেকে দূরে থেকে যারা দায়িত্ব পালন করছেন এই শুভ দিনে তাদের অভিভাবক হিসেবে দেখতে এসেছি।’

তিনি পবিত্র ঈদ-উল-আযহার ত্যাগের মহিমায় সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে আত্মনিয়োগ করতে সেনাসদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সেনাবাহিনী প্রধান বলেন, ‘স্থানীয় জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে সেনাবাহিনী যা যা প্রয়োজন সব করবে।’

পরে সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বাঘাইহাট জোন সদর দপ্তর হতে দিঘীনালা জোন সদর দপ্তরে যান। সেখানে সৈনিক ও অফিসারদের সাথে মধ্যাহভোজ করেন। এ সময় ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আবেদীন, সেনাসদরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পাংখুপাড়া আর্মি ক্যাম্প, বাঘাইহাট এবং দিঘীনালা জোনের অন্যান্য কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

ঈদের দিনে দুর্গম পাহাড়ি সেনা ক্যাম্পে সেনাপ্রধানের আগমনে সেনাসদস্য এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মনোবল উঁচু করেছে বলেও জানিয়েছে আইএসপিআর।

এছাড়া এদিন সকালে সেনাবাহিনী প্রধান ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেন এবং সেখানে সেনাবাহিনীর সকল স্তরের অফিসার, জেসিও এবং অন্যান্য পদবির সৈনিকদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email