এই মৃত্যু উপত্যকাই তবে আমার দেশ!

প্রকাশিতঃ 10:26 am | June 06, 2022

প্রভাষ আমিন

শনিবার রাত ১১টায় হঠাৎ কেয়ামত নেমে আসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোতে প্রথমে আগুন। তারপর একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে আশপাশের চার বর্গকিলোমিটার এলাকা। আর বেদনায় কেঁদে ওঠে সারাদেশ।

নিকট অতীতে এমন বেদনার রাত খুব বেশি আসেনি বাংলাদেশে। প্রথম যখন খবরটি পাই, তখন দুজনের মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম। কিন্তু বিবরণ শুনেই বুঝে গিয়েছিলাম, এ ঘটনা বাংলাদেশকে অনেকদিন কাঁদাবে। ঘটনা শোনার সাথে সাথেই এটিএন নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার ফেরদৌস রহমান রওয়ানা হয়ে যান সীতাকুণ্ডের উদ্দেশ্যে। চট্টগ্রাম প্রতিনিধি মনিরুল পারভেজ ছিলেন ঘটনাস্থলে। ফেনী প্রতিনিধি দিদারকেও ডেকে আনা হয়। কিছুক্ষণ ডর রওয়ানা হয়ে যান এ কে আজাদ।

আমরা যতই প্রার্থনা করি, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর মূল উদ্ধারকাজ শুরু হবে। তখন কী দৃশ্য দেখতে হবে বাংলাদেশকে, সেটা ভেবেই আমার মন খারাপ হয়ে যায়, কেবলই মন খারাপ হয়ে যায়। আহারে মানুষের জীবনের দাম বুঝি এতই কম।

শুধু এটিএন নিউজ নয়, সব গণমাধ্যম তাদের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে ছুটে যায় ঘটনাস্থলে। ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম এবং আশপাশের সব জেলার কর্মীদের ডেকে আনে। ঘটনাস্থলে ছুটে যায় সেনাবাহিনী। চট্টগ্রামে চিকিৎসকদের সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে। অবশ্য ছুটি বাতিলের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করেননি চিকিৎসকরা। খবর পেয়েই সবাই ছুটে এসেছেন।

কিছু কিছু দুর্যোগ আছে, আমাদের আরও বেশি মানবিক করে, আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করে। ঘটনাস্থলে এবং হাসপাতালে হাজার হাজার মানুষ তৈরি স্বেচ্ছায় কাজ করার জন্য, রক্ত দেওয়ার জন্য। সবাই উদগ্রীব, কিছু না কিছু করতে চান। গোটা বাংলাদেশের সবার নজর সীতাকুণ্ডের দিকে, সবার প্রার্থনা মৃত্যুর সংখ্যা যেন আর না বাড়ে, আহতরা যেন দ্রুত সেরে ওঠেন। কিন্তু সবার সম্মিলিত চেষ্টা, সম্মিলিত প্রার্থনা সত্ত্বেও অসহায়ভাবে মানুষের মৃত্যু দেখা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার ছিল না। কখনো কখনো কিছু কিছু দুর্যোগের সামনে মানুষ হিসেবে নিজেদের বড্ড ক্ষুদ্র মনে হয়।

রানা প্লাজার ঘটনার সময় উদ্ধারকর্মীরা যেভাবে আগপিছ না ভেবে সুড়ঙ্গে নেমে যাচ্ছিল, তা দেখে আমি শঙ্কিত হয়েছি। উদ্ধার করতে গিয়ে অনেকে আহত হয়েছেন, মারাও গেছেন। তখনই আমি বলেছিলাম, বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুমতি পেতো না। বাংলাদেশের মানুষ আসলে হৃদয় দিয়ে কাজ করে। সীতাকুণ্ডের ঘটনায়ও এই লেখা পর্যন্ত অন্তত ৯ জন ফায়ার কর্মী প্রাণ দিয়েছেন। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও আমাদের ফায়ার কর্মীরা নিজের জীবনের কথা না ভেবে উদ্ধারকাজে নেমে যায়।

আমাদের দেশে মানুষ বেশি। তাই যেন মানুষেরও জীবনের দামও কম। বাংলাদেশে কোনো একটা দুর্ঘটনা ঘটলেই মৃত্যুর মিছিল লেগে যায়। ভবনধস, আগুন, সড়ক দুর্ঘটনা, লঞ্চডুবি- যাই ঘটুক মৃত্যু শত, হাজার ছাড়িয়ে যায়। সড়কে তো প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল। সাংবাদিকদের মূল কাজ যেন লাশ গোনা। গোটা বাংলাদেশই যেন এক মৃত্যু উপত্যকা। এই মৃত্যু উপত্যকাই যেন আমাদের দেশ!

অধিকাংশ ঘটনায় দেখা যায়, কোনো না কোনো মানুষের লোভের কারণে বলি হয় নিরীহ সাধারণ মানুষ। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, বেপরোয়া গতি, দুর্বল ভিত্তির ওপর ভবন নির্মাণ, যথাযথ অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকাই দুর্ঘটনার কারণ। নিরাপত্তামূলক সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে অল্পকিছু বাড়তি ব্যয় হতো, সেটা না করে মানুষের জীবন নিয়ে আমরা জুয়া খেলি, ব্যবসা করি।

সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে একসঙ্গে এতগুলো বিপজ্জনক কনটেইনার রাখার কি অনুমতি ছিল? কমনসেন্স বলে অনুমতি ছিল না, থাকা সম্ভব নয়। এমন বিপজ্জনক রাসায়নিকের কনটেইনার একসাথে রাখতে হলে পর্যাপ্ত ও যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রাখার কথা। কিন্তু বিএম ডিপোর মালিক সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে, তাতে এসব নিয়মকানুন, অনুমতির তোয়াক্কা তার করার কথা নয়।

বিএম ডিপোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান দৈনিক ‘পূর্বদেশ’র সম্পাদক। একই সঙ্গে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। আর কী চাই। সরকারি দলের পান্ডা এবং পত্রিকার সম্পাদক। তিনি কেন আইন মানবেন, অনুমতির তোয়াক্কা করবেন। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে মালিকের উপস্থিতি খুবই দরকার ছিল। তিনি জানেন কোথায় কী আছে, কোন কনটেইনারে কোন রাসায়নিক আছে, কোনটার আগুন নেভাতে কী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু মালিককে না পাওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের কাজ করতে হয়েছে অন্ধকারে। কিন্তু ঘটনার ২০ ঘণ্টা পর এই লেখা পর্যন্ত আগুনও নেভেনি, মালিকও আসেননি।

এই লেখা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৪৯। আমরা যতই প্রার্থনা করি, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর মূল উদ্ধারকাজ শুরু হবে। তখন কী দৃশ্য দেখতে হবে বাংলাদেশকে, সেটা ভেবেই আমার মন খারাপ হয়ে যায়, কেবলই মন খারাপ হয়ে যায়। আহারে মানুষের জীবনের দাম বুঝি এতই কম।
৫ জুন, ২০২২

লেখক: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ।

Print Friendly, PDF & Email