স্বাধীনতা পুরস্কার ও মননের উন্নয়ন

প্রকাশিতঃ 11:48 am | March 24, 2022

নাদির জুনাইদ:

দেশের সাহিত্য অঙ্গনে অপরিচিত একজন ব্যক্তিকে দুই বছর আগে সাহিত্যে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এর জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। ব্যাপক সমালোচনার কারণে সেই মনোনয়ন বাতিল করা হয়। আর চলতি বছর সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য ঘোষিত হয়েছিল আমীর হামজা নামে একজন প্রয়াত ব্যক্তির নাম, যার সাহিত্যকর্মের সঙ্গে দেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক এবং পাঠকরা পরিচিত নন। আবারও শুরু হয় তুমুল সমালোচনা। এর ফলে আবারও বাতিল করা হয়েছে এই মনোনয়ন। দুই বছর পর কি আবারও সাহিত্যিক হিসেবে অপরিচিত এমন কাউকে সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করা হবে? মর্যাদাপূর্ণ এ পুরস্কারের জন্য যারা নাম নির্বাচন করেন; ২০২০ সালের ঘটনায় তারা লজ্জিত হননি। যে কারণে মাত্র দুই বছর পর একই ঘটনা আবার ঘটেছে। এ বছরের মনোনয়ন বাতিলের ঘটনায় তারা লজ্জা পেয়েছেন কিনা, তা বুঝতে হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে এমন দুই ঘটনায় সহজেই বোঝা যায়- আমাদের দেশে এখন দায়িত্বশীল পদে থাকা কিছু ব্যক্তির কাছে চিন্তাশীলতা অনুধাবন এবং চর্চা করার দায়িত্বের কোনো গুরুত্ব নেই।

দ্রুতগতির ইন্টারনেট, ডিজিটাল প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সোশ্যাল মিডিয়া প্রভৃতি দিক সম্পর্কে যত আগ্রহ নিয়ে ইদানীং কথা বলা হয় আমাদের দেশে; সমাজে চিন্তা আর রুচির উন্নয়ন ঘটছে কিনা, সে সম্পর্কে কি তেমন আগ্রহ নিয়ে আলোচনা করা হয়? চিন্তার উন্নতি না ঘটলে বিবেচনা শক্তি তৈরি হয় না। আর বুদ্ধিশূন্য এবং রুচিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়নও হয়ে পড়ে অর্থহীন। তা সমাজের প্রকৃত কল্যাণ ঘটাতে পারে না। এই কথাগুলো কি আমাদের সমাজে বর্তমান সময়ে অনেকে অনুধাবন করেন? সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ (১৯৬২) ছবির একটি দৃশ্যে দেখা যায় পাঁচটি কোম্পানির মালিক রায়বাহাদুর ইন্দ্রনাথ চৌধুরী আর তার শ্যালক জগদীশকে। জগদীশ একজন পাখিপ্রেমী। বই খুলে দুর্লভ একটি পাখি সম্পর্কে সেখানে কী লেখা আছে তা যখন তিনি ইন্দ্রনাথকে দেখান; সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি ইন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন, ‘রোস্ট হয়? বলি রোস্ট করে খাওয়া যায়? তা না হলে এই পাখিতে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।’ একই পরিচালকের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ (১৯৭০) ছবির মূল চরিত্র সিদ্ধার্থ তার শৈশবে একদিন শুনেছিল এক পাখির সুমধুর ডাক। কলকাতার বর্তমান পরিবেশে হতাশ সিদ্ধার্থ খুঁজতে থাকে সেই পাখিটি। বন্ধু আদিনাথকে একদিন সে জিজ্ঞেস করে, নিউমার্কেটে পাখি পাওয়া যায়? মেডিকেল কলেজের ছাত্র আদিনাথ উত্তর দেয়, ‘পাখি? মানে মুরগি?’

রুচিস্নিগ্ধতা আর চিন্তার গভীরতা অর্জনের চেষ্টা ভোগবাদী সমাজে গুরুত্বহীন। ইন্দ্রনাথ চৌধুরী, আদিনাথ শুধু আর্থিক মুনাফা অর্জন আর ভোগ্যপণ্য উপভোগে বুঁদ হয়ে থাকা মানুষেরই প্রতীক; যাদের কাছে ফুল, পাখি বা বইয়ের চেয়ে মুখরোচক রোস্টই সব সময় বেশি আকর্ষণীয়। আমাদের সমাজে এমন মানুষের সংখ্যাই কি বাড়ছে দিন দিন? এ বছর একুশে বইমেলায় যে পরিবেশ দেখেছি; বইমেলার চিরচেনা মধুর রূপের সঙ্গে তার মিল ছিল খুবই কম। মনোযোগ দিয়ে স্টলে বই দেখছেন বহু মানুষ; ছোট ছোট দলে দাঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রাণবন্ত আড্ডা; খ্যাতিমান কবি-লেখকরা হাঁটছেন মেলা প্রাঙ্গণে- ২০-৩০ বছর আগে এমন দৃশ্যই ছিল বাংলা একাডেমির বইমেলার নিয়মিত দৃশ্য। প্রতিদিনই সাজগোজ করে আসা মানুষ সেই সময় বইমেলায় চোখে পড়ত না। আর এ বছরের বইমেলায় যে ক’দিনই গিয়েছি; দেখেছি পহেলা ফাল্কগ্দুন বা পহেলা বৈশাখে সাধারণত যেমন সাজগোজ করা হয় তেমনভাবে সেজে অনেকে মেলায় এসেছেন। আর বারবার দেখতে হয়েছে নানা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তোলার দৃশ্য।

ধারণা করি, ফেসবুকে ছবি আপলোড করার আকর্ষণের কারণেই সেজেগুজে বইমেলায় এসে ছবি তোলার এই হিড়িক। মনে হয়েছে, বিভিন্ন স্টলে যেয়ে মনোযোগ দিয়ে বই দেখার জন্য নয়, ছবি তোলার জন্যই যেন এসব মানুষ বইমেলায় এসেছিলেন। বইমেলায় একটু হাঁটলেই চোখে পড়েছে একাধিক বিরিয়ানির দোকান। সেই সঙ্গে কাবাব, পিঠা, আইসক্রিম, কফি বিক্রির দোকান। বইয়ের স্টলের খুব কাছেই বিরিয়ানিসহ অন্যান্য খাবারের দোকান রাখা কি জরুরি ছিল? অতীতে বইমেলা প্রাঙ্গণে বিরিয়ানি আর কাবাবের দোকান কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এবারের বইমেলায় বিভিন্ন ছোট প্রকাশনা সংস্থার স্টল চট করে খুঁজে পাইনি। অথচ ভালো স্থানে দেখলাম এমন খাবারের দোকান। এসব দোকানে অনেকের আনাগোনা; বই দেখার পরিবর্তে বহু মানুষের মেলা প্রাঙ্গণে বিক্ষিপ্ত ঘোরাঘুরি আর ছবি তোলার ধুম চোখে পড়ল। কিন্তু বইমেলার পুরোনো নান্দনিক পরিবেশ খুঁজে পেলাম না। অথচ একুশে বইমেলার পরিবেশ অন্য আরও বিভিন্ন মেলার মতো হয়ে ওঠা বাঞ্ছনীয় নয়- তা বোঝা কি খুবই কঠিন? বইমেলা যেন ভোগবাদী সমাজের নানা দিকের প্রভাবমুক্ত থাকে, সেই চেষ্টা সচেতনভাবে করা হয়নি; চলতি বছরের বইমেলার রূপ দেখে তাই মনে হয়েছে।

বর্তমান সময়ে দেশে যথেষ্ট পাঠাগার না থাকা আর বই-পত্র পড়ার অভ্যাস কমতে থাকা নিয়ে কি উদ্বেগ দেখছি আমরা? দেশের নাটক-চলচ্চিত্র-ওয়েব সিরিজে কমবয়সী চরিত্রদের বই আর সংবাদপত্র পড়তে দেখা যায় না। দেশের ইতিহাস কিংবা সমকালীন পরিস্থিতি নিয়েও তারা কথা বলে না। অথচ মোবাইল ফোন, গাড়ি, দামি রেস্তোরাঁ, হলিডে রিসোর্ট, পুলসাইড পার্টি প্রভৃতি ভোগবাদী সমাজের নানা উপকরণ আর চর্চা সেখানে উপস্থাপিত হয় আকর্ষণীয়ভাবে। ফেসবুকে আমাদের দেশের অনেকেই আপলোড করছে অরুচিকর ভিডিও। নাটক-চলচ্চিত্রের সংলাপে প্রমিত বাংলা নিয়মিত অবহেলিত হচ্ছে। এমন অগভীর আর স্থূলতাসর্বস্ব উপাদান বহু মানুষ বিশেষ করে কমবয়সীদের বিচারবুদ্ধি আর রুচির ওপর কতটা ক্ষতিকর প্রভাব রাখছে, তা নিয়ে সমাজের সচেতন মানুষরা চিন্তা করছেন কি? ক’দিন আগেই ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস প্রকাশ করা নিয়ে কাপাসিয়ায় সংঘর্ষে তিনজন প্রাণ হারিয়েছে। দেশজুড়ে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ। সাম্প্রতিক সময়ে কমবয়সীদের আত্মহত্যা করার বিভিন্ন ঘটনা ইঙ্গিত করছে- জীবনে যত বড় বিপদ, হতাশা, দুঃখই আসুক না কেন; মনের জোর দিয়ে তা মোকাবিলা করে আবার আনন্দ ফিরিয়ে আনতে হয়। কোনোভাবেই জীবন ধ্বংস করা যায় না। এই যৌক্তিক চিন্তা কোনো কোনো কমবয়সীর মনে তৈরি হচ্ছে না। বিবেচনাবোধ, সুরুচি আর নান্দনিক অনুভূতি বহু মানুষের মনে না থাকলে সমাজ সুন্দর আর নিরাপদ থাকবে না। মনের উন্নয়ন ঘটে এমন পরিবেশ তৈরির জন্য আমাদের আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হতে হবে সমাজের আরও ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আগেই।

বাংলা একাডেমির সামনের রাস্তাটির মধ্যে এখন সারি সারি কংক্রিটের বিশাল থাম, যার ওপর তৈরি হয়েছে মেট্রোরেল চলার পথ। অতীতে বইমেলার সময় এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেক আনন্দময় আড্ডা দিয়েছি। এখন রাস্তাটির মধ্যে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকালে আর খোলা আকাশ দেখা যায় না। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে থাকা এই রাস্তাটি এখন তাই মনে হয় অপরিচিত কোনো পথ। যদি ঢাকা শহরে মানুষের আগমন এবং বসবাস নিয়ন্ত্রণের কোনো চেষ্টাই না করা হয় এবং এই শহরের লোকসংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকে, তাহলে মেট্রোরেল কি যানজট সমস্যার সমাধান করতে পারবে? আগামী দিনে এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে, কিন্তু ইতোমধ্যে কংক্রিটের অরণ্যে পরিণত হওয়া এই শহরে দিন দিন বাড়ছে কংক্রিটের পরিমাণ। ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে আলোচিত ছাত্র আন্দোলন হয়েছিল, তখন ছাত্ররা ব্যবহার করেছিল চিন্তাশীল বিভিন্ন স্লোগান আর দেয়াল লিখন। তাদের বলা একটি কথা ছিল- ‘কংক্রিট লালন করে অনীহা আর উদাসীনতা।’ যে খোলা আকাশের নানা রূপ চিন্তার দিগন্ত বহুদূর প্রসারিত করে দেয় সেই আকাশ যদি ঢেকে যায় নিষ্প্রাণ কংক্রিটের স্থাপনায়, তাহলে মানুষের মনে সূক্ষ্ণ বোধ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও তো বাধা পায়। অবশ্য আকাশ দেখা কেন প্রয়োজনীয়, তা উপলব্ধি করার মতো বোধও বর্তমান সময়ে অনেকের আছে কিনা- এই প্রশ্নও মনে তৈরি হয়।

ড. নাদির জুনাইদ: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email