বঙ্গমাতা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের সাফল্যের ৩ বছর

প্রকাশিতঃ 8:32 pm | November 18, 2021

বশেফমুবিপ্রবি সংবাদদাতা, কালের আলোঃ

একটা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেয়া মানে ‘শূন্য’ থেকে শুরু করা। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে হাটি হাটি পা করে এগিয়ে চলেছে জামালপুরে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেফমুবিপ্রবি)।

আর নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়টির নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, প্রখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ ও দক্ষপ্রশাসক প্রফেসর ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ। তার নেতৃত্বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার নামে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বিশ্বমানের গবেষণাসমৃদ্ধ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রূপে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে কাজ করে করছে কর্তৃপক্ষ।

ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিষয়টি মাথায় রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দেশের উচ্চশিক্ষায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়া তোলার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া স্বত্বেও আমরাও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার দিকে জোর দিয়েছি।

ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদকে ২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বশেফমুবিপ্রবির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন। দায়িত্বগ্রহণের পরই তিনি বঙ্গমাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় দেশের ‘রোল মডেল বিশ্ববিদ্যালয়ে’ পরিণত করার মহাপরিকল্পনা হাতে নেন।

এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমিত সম্পদের মাঝেই বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকবৃন্দের গবেষণা কার্যক্রমে উৎসাহ ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে সামাজিক বনায়ন, মাছের পোনা অবমুক্তকরণ, বঙ্গবন্ধু কর্ণার স্থাপন, মুজিব শতবর্ষের ইতিহাস শীর্ষক বই প্রকাশসহ বছরজুড়ে বর্ণাঢ্য কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের ওপর ‘অবিনাশী জনক তুমি’ শীর্ষক স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ দিনের কর্মসূচি পালন করা হয়।

গত ১৮ মাস ধরে করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-কার্যক্রম বন্ধ ছিলো। তবে এর মাঝেই স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থাপনার সংস্কার কাজ করা হয়। এই সময়ে অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ, হলের সংস্কার, প্রশাসনিক ভবন, ডরমিটরি সংস্কার করে ব্যবহারের উপযুক্ত করা হয়। বর্তমানে দু’টি হোস্টেল শিক্ষার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে।

করোনার প্রভাবে যাতে শিক্ষার্থীদের সেশনজটের মতো সমস্যায় পড়তে না হয় সেজন্য ক্যাম্পাস খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের আটকে যাওয়া পরীক্ষাগুলো নেয়া হয়। এখন প্রতিটি বিভাগেই পুরোদমে ক্লাস চলছে। করোনা মহামারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরিদ্র অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয়া হয়।

বশেফমুবিপ্রবির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য-ই বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই যেন তারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। আমরা সবসময় তাদের পাশে রয়েছি এবং থাকবো। এক্ষেত্রে আমাদের ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, শিক্ষক-কর্মকর্তা- সবাই সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করে চলেছেন।


‘নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টিকে এক অনন্য জায়গায় নিয়ে যেতে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বশেফমুবিপ্রবিকে রোলমডেল হিসেবে গ্রহণ করবে — আমি এমন স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলেছি,’ যোগ করেন তিনি।

ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শূন্যে’ দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকে আকৃতি দেয়া বেশ চ্যালেঞ্জের। আমি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে এই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করি। খুবই অল্পসংখ্যক লোকবল দিয়েই ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

এদিকে প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ভর্তির পর জামালপুর শহরের দেওয়ানপাড়ায় বঙ্গবন্ধু আইডিয়াল স্কুলের একটি ভবন ভাড়া নিয়ে তাদের ক্লাস শুরু হয়। অন্যদিকে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত শেখ ফজিলাতুন্নেছা ফিশারিজ কলেজের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি দেয়া হতো। শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় মানুষের দাবি ছিল যে, এই কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হোক। এর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীরও একটা অনুশাসন ছিলো।

কিন্তু ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১৭’ এ ওই বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। ফলে এ নিয়ে একটা জটিলতা সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর বিষয়টি আমিও অবগত হই। এরপর আমি যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মির্জা আজমও এ বিষয়ে সহযোগিতা করেন। পরে মন্ত্রণালয় এ কলেজটির বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায় সে বিষয়ে একটি ত্রি-পক্ষীয় কমিটি গঠন করে দেয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি ও মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকে।

‘কমিটি কয়েকবার সভা ও সরেজমিনে পরিদর্শন করে এ বিষয়ে আত্তীকরণের সুপারিশ করে। এরই আলোকে তৎকালীন ফিশারিজ কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতার ভিত্তিতে আত্তীকরণ করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের ফিশারিজ বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে।’

এরপর ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি স্থায়ী ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালেয়ের পাঁচটি অনুষদের অধীনে ছয়টি বিভাগ,  যথাক্রমে- কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, গণিত বিভাগ, ফিশারিজ বিভাগ, ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সমাজকর্ম বিভাগে ৫০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।  

মানসম্পন্ন শিক্ষা ও আন্তর্জাতিকমানের বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে উপাচার্য বলেন, ছোট বিশ্ববিদ্যালয় হলেও শুরু থেকেই কোনো বিষয়ে নজর দেয়া বাদ পড়েনি। যেহেতু এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তাই শুরু থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারে গবেষণা খাতকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে দেশি-বিদেশি সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন করা হচ্ছে। ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল-আইকিউএসি স্থাপনের বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি জায়গায় স্থান করে নেবো, ইনশাল্লাহ।

শিক্ষা-গবেষণা তথা মানবকল্যাণে বশেফমুবিপ্রবি কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে- এমন প্রশ্নের উত্তরে উপাচার্য ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন বলেন, ‘জামালপুরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে এখানকার মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এখানকার গবেষকরা জনমানুষের সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের পথ বাতলে দেবেন। যাতে উপকৃত হবে মানুষ তথা পুরো দেশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস স্থাপনের বিষয়ে উপাচার্য ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প অনুমোদিত হলে আমরা বশেফমুবিপ্রবির একটি দৃষ্টি-নন্দন, আধুনিক সুবিধাসহ একটি আন্তর্জাতিকমানের গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার কাজে হাত দেবো। যা আমাদের মহাপরিকল্পনায় রয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল জ্ঞান বিতরণ নয়, জ্ঞান অনুসন্ধান ও আহরণ করা হয়। জ্ঞান আহরণের বিষয়টা একান্তই গবেষণার ওপর নির্ভরশীল। গবেষণা ছাড়া নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। গবেষণার কাজটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা একাডেমিক আদলে প্রচলিত। এই জ্ঞান আহরণের কাজটি অর্থাৎ গবেষণার সব সুযোগ-সুবিধা বলতে যা বোঝায়, তা যাতে বশেফমুবিপ্রবি-তে নিশ্চিত হয় আমরা সেভাবেই পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ নিচ্ছি’,’ যোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য।

কালের আলো/টিআরকে/এসআইএল

Print Friendly, PDF & Email