করোনা মোকাবেলায় বগুড়া পুলিশের ‘সৃজনশীল’ কর্মকান্ডের কথা জানলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিতঃ 10:38 am | April 30, 2020

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো :

করোনা মহাপ্রলয়ে অচিন্তনীয় অবরুদ্ধতায় বিশ্ব। সামাজিক দূরত্ব আর সঙ্গরোধের সময়ে নিস্তরঙ্গ জীবনে ঘরবন্দি থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ।

কেউ বাইরে থেকে আবার কেউ ঘরে থেকেই লড়াই করছে ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে এক ভাইরাসের বিরুদ্ধে। আবার অনেকেই নিয়ম ভেঙে ঘর থেকে বের হচ্ছেন কারণে-অকারণে।

জীবনমুখী চৈতন্যে মানুষকে ঘরে থাকার লড়াইকে প্রাণিত করছেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। নিজের সৃজনশীলতার অনন্য স্বাক্ষর রেখে শিশু থেকে শুরু করে বয়স্কদের ঘরে থাকাকে আনন্দময় করে তুলতে অনলাইন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন। স্প্রিপ্ট রাইটিং থেকে শুরু করে রচনা, চিত্রাঙ্কন এবং গান/কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করা হয়েছে।

আবার নিত্যপণ্যের অজুহাতে মানুষের অপ্রয়োজনীয় ঘরের বাইরে আসা ঠেকাতে ‘ডোর টু ডোর শপ’ ব্যবস্থাও চালু করেছেন। হাট-বাজারে ছুটোছুটি না করে ঘরে বসেই মিলছে পছন্দের সব পণ্য। সৃজনশীল এমন সব কর্মপ্রবাহে নিজের এলাকার বাসিন্দাদের সুরক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে আলোচিত হয়েছেন একজন আলী আশরাফ ভূঞা। তিনি বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার (এসপি)।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে করোনা সংক্রমণ রোধে বগুড়া জেলা পুলিশের গ্রহণ করা এসব সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ নিখাঁত শব্দের গাঁথুনিতে তিনি উপস্থাপন করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী করোনা যুদ্ধ মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট পুলিশের বহুমাত্রিক এমন উদ্যোগের কথা বেশ গুরুত্ব দিয়েই শোনেছেন। প্রয়োজনীয় নোট নিয়েছেন। বগুড়ায় করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকায় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

সেদিন কী বলেছেন বগুড়ার এসপি?
প্রধানমন্ত্রী গণভবন প্রান্ত থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হবার পর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ অন্যদের বক্তব্যের পর বগুড়া জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছ থেকে সামগ্রিক পরিস্থিতি শোনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বগুড়া একটি বড় জেলা। এখানকার পুলিশ সুপারের কাছ থেকে অবস্থা শোনতে চাই।’

নিজের বক্তব্যের শুরুতেই বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আলী আশরাফ ভূঞা বিশ্বের জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিনে করোনা মোকাবেলায় সফল নারী নেতৃত্বের তালিকায় স্থান করে নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।

তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠেই যখন দেখি, বিশ্বের একটি ইন্টারন্যাশনাল ফাইনেন্সিয়াল রিয়ালেবল ফোর্বস ম্যাগাজিনে আমার দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী করোনা প্রতিরোধে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তা বিশ্বের অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরাই সক্ষম হননি।

‘আমরাই সর্বপ্রথম আপনার নির্দেশে দেশে প্রথম পর্যায়ে ৬৫ হাজার হোম কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছিল, সেটা ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যেটা অন্য কোন দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা পারেননি। এজন্য আপনাকে সশ্রদ্ধ সালাম’ যোগ করেন এসপি আলী আশরাফ।

বগুড়া জেলায় করোনা আক্রান্ত ১৭ জনের মধ্যে দুইজন সুস্থ রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দু’জনের একজন পুলিশ কনস্টেবল। যিনি ঢাকায় চাকরি করেন, এখানে ছুটিতে এসেছিলেন। আমাদের জেলায় সর্বমোট ২ হাজার পুলিশ সদস্য রয়েছে।

তারা এখনও পর্যন্ত নিরাপদে রয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপদ রাখা, পাশাপাশি হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা, লকডাউন নিশ্চিত করা এই বিষয়গুলো সামনে রেখে কাজ করছি।

আমরা আমাদের সদস্যদের জন্য স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় যা যা প্রয়োজন সবকিছু পর্যাপ্ত পেয়েছি। নিজেরাও যেগুলো সংগ্রহ করেছি সেগুলো ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের সদস্যদের প্রত্যেককে ডিউটি বন্টন করে দিয়েছি।

যদি কোন থানায় কোন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হন, তখনই ওই থানার সকল সদস্যকে হোম কোয়ারেন্টাইনের আন্ডারে আনতে হবে না। আমরা বিকল্প যে টিম রয়েছে তাদেরকে দিয়ে ডিউটি চালিয়ে যেতে পারবো।’

করোনা সংক্রমণের পর ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও অন্যান্য জেলা থেকে বগুড়ায় যারা এসেছেন তাদের তালিকা জেলা পুলিশের হাতে রয়েছে জানিয়ে এসপি আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, ‘বগুড়া একটি বড় জেলা। এখানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও অন্যান্য জেলা থেকে যারা এসেছেন তাদের তালিকা আমাদের হাতে রয়েছে।

এই সংখ্যাটি প্রায় দুই হাজার। এই দুই হাজার পরিবারকেই আমরা হোম কোয়ারেন্টাইন করে রেখেছি। দুই হাজার পরিবারের বাড়িতেই আমরা জেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য সবার সহযোগিতায় লাল পতাকা দিয়েছি। যাতে তারা সেখান থেকে বের না হয়।’

তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিটি করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন সেটি রয়েছে। পাশাপাশি আমরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রত্যেকটি থানায় ইন্সপেক্টর এবং এসআইদের জন্য ইউনিয়নভিত্তিক ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

তেমনি হোম কোয়ারেন্টাইনের তালিকাও আমরা তাদের হাতে ভাগ করে দিয়েছি। প্রত্যেকের কাজ ভাগ করে দেওয়ায় চাপ কম পড়ে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি এবং অন্যান্য সংস্থা যারা রয়েছেন তারা আমাদেরকে সহায়তা করছেন।’

‘ডোর টু ডোর শপ সার্ভিস’
করোনার সংক্রমণ থেকে নিজে ও পরিবারকে রক্ষা করতে ‘ডোর টু ডোর শপ’ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এর ফলে পণ্য কেনার জন্য এখন থেকে আর হাট-বাজারে যেতে হবে না। টাটকা শাক-সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে বাসা-বাড়ির সামনে হাজির হচ্ছে ‘ডোর টু ডোর শপ’।

গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) থেকে শুরু হয়েছে বগুড়া জেলা পুলিশের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। সেদিনই শহরের সাতমাথায় ‘ডোর টু ডোর শপ’ ব্যবস্থার উদ্বোধন করেন স্থানীয় এসপি আলী আশরাফ ভূঞা।

এ শপ সার্ভিসের মাধ্যমে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন এসপি। এ সঙ্কটের সময়ে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।

কিন্তু এই পদ্ধতি চালুর ফলে তারা ‘ডোর টু ডোর শপ’র কাছে শাক-সবজি বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছেন। আবার ক্রেতারা ন্যায্য মূল্যে নিত্যপণ্য কিনতে পারছেন। দামও বাজার থেকে তুলনামূলক কম। প্রতিদিনের পণ্য প্রতিদিনেই বিক্রি করা হচ্ছে।

নিজেদের এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে গিয়ে এসপি আলী আশরাফ বলেছেন, ‘রমজানে লকডাউনে প্রতিদিন মানুষের অন্তত একবার বাইরে আসার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটাকে নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা ‘ডোর টু ডোর শপিং সার্ভিস’ চালু করেছি।

আমরা বগুড়া সদরে মিনি ট্রাকে করে ১৮ টি দোকান দিয়েছি। যেন ‘ডোর টু ডোর’ গিয়ে সকাল বেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং বিকেল বেলায় ইফতার সামগ্রী দিয়ে আসে। এবং এটার জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

ঠিক শেরপুরেও একইভাবে করা হয়েছে। যাতে করে যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য বের হয়ে আসতেন তারা একটু ভেতরে থাকার জন্য আগ্রহবোধ করছেন।’

সব বয়সী নাগরিকের জন্য অনলাইন প্রতিযোগিতা
করোনা মহামারির সংক্রমণ থেকে জেলাবাসীকে রক্ষায় বাসায় অবস্থানের বিষয়ে জোর দিয়েছে বগুড়া জেলা পুলিশ।

পাশাপাশি বাসায় অবস্থানের সময়টি উপভোগ্য করতে শিশু থেকে শুরু করে অভিভাবক সকল বয়সী মানুষের জন্য অনলাইনে বেশ কিছু আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছে সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ।

প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো হচ্ছে- স্ক্রিপ্ট রাইটিং, রচনা, চিত্রাঙ্কন এবং গান/কবিতা আবৃত্তি। যার মাঝে শিশুদের জন্য রয়েছে ৪টি গ্রুপে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা।

রচনা প্রতিযোগিতায় ক বিভাগে সর্বোচ্চ ৬০০ শব্দের বিষয় হচ্ছে (এইচএসসি থেকে মাস্টার্স) কোয়ারেন্টিন কি এবং কেন? করোনা প্রেক্ষাপটে নাগরিক সচেতনতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য, খ বিভাগে সর্বোচ্চ ৫০০ শব্দের (৬ষ্ঠ থেকে এইচএসসি) বিষয় বঙ্গবন্ধুর শৈশব, কৈশোর এবং ছাত্রজীবন এবং গ বিভাগে (৩য় থেকে ৫ম শ্রেণি) সর্বোচ্চ ৩০০ শব্দের বিষয় হচ্ছে ‘যেভাবে কাটছে ছুটি’।

প্রতিযোগিতায় গান এবং কবিতা রাখা হয়েছে সবার জন্য উন্মুক্ত। যার বিষয় হচ্ছে করোনা যুদ্ধে পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে গান অথবা কবিতা যা ভিডিও করে পাঠাতে হবে ইমেইলে।

প্রতিযোগিতায় অভিভাবকদের জন্যেও রয়েছে আকর্ষণীয় একটি বিষয়ে সর্বোচ্চ ৬০০ শব্দের স্ক্রিপ্ট রাইটিং প্রতিযোগিতা। যার বিষয় হচ্ছে পারিবারিক সহিংসতার উৎপত্তি, কারণ এবং প্রতিকার।

জমাদানের শেষ তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে আগামী ৫ মে। জেলা পুলিশ বগুড়া ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার ফলাফল প্রকাশ করবে আগামী ১৫ মে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিযোগিতায় প্রতি গ্রুপে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারীদের যথাক্রমে ৫ হাজার, ৩ হাজার এবং ২ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড প্রদান করা হবে। শুধু তাই নয় প্রতি গ্রুপের উত্তীর্ণ প্রথম ২০ জনকে বগুড়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সনদপত্র প্রদান করা হবে।

বগুড়া জেলা পুলিশের সৃষ্টিশীল এমন কর্মকান্ডের বিষয়ও অবহিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এসপি আলী আশরাফ ভূঞা বলেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, যারা অনেক দিন যাবত লকডাউনে রয়েছে তারা মানসিকভাবে ঝিমিয়ে পড়ছেন।

আমরা ‘করোনার বিরুদ্ধে ঘরে থেকে যুদ্ধে’ এ স্লোগান নিয়ে একটি অনলাইন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি। যেটাতে গার্ডিয়ান থেকে শুরু করে ছাত্র-ছাত্রী যারা রয়েছে সকল বয়সের সবাই এটাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। এটাতে আমরা বেশ সাড়া পাচ্ছি।’

শ্রমিকদের সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রী
বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আলী আশরাফ ভূঞা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, ‘আমাদের বগুড়া জেলায় সর্বমোট ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৫০০ জন শ্রমিক রয়েছে।

লকডাউন দীর্ঘায়িত হলে তাদের জন্য কষ্টকর হবে। এদিকে, আমাদের একটু বেশি দৃষ্টি দিতে হবে।’

বগুড়ার পুলিশ সুপারের বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বগুড়া করোনামুক্ত থাকতে পেরেছে, যেটুকু আছে সতর্কতার সঙ্গে থাকলে আর বাড়বে না। ১৭ জন থেকে আরও যেন বৃদ্ধি না পায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আমি সব শ্রমিকদের সহযোগিতার ব্যবস্থা করবো।’

কালের আলো/এসআর/আরআই

Print Friendly, PDF & Email