করোনার রাজত্বে ‘নতুন চেহারায়’ আনসার সদস্যরা; মাতোয়ারা কৃষকের মন

প্রকাশিতঃ 10:04 am | April 24, 2020

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো :

দেশের গুরুত্বপূর্ণ ‘শস্য ভান্ডার’ বলা হয় হাওরাঞ্চলকে। হাওরের সাতটি জেলায় ফসলহানি হলেই ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কটের মুখে পড়বে দেশ- এমন শঙ্কা নিয়েই দিশেহারা কৃষককে ‘খাবি’ খেতে হচ্ছে করোনাভাইরাসের ভয়ানক থাবায়।

প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকিতে হাওরে কৃষকের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে শ্রমিক সঙ্কট। আবার আগাম বন্যার সতর্ক বার্তাতেও ‘মুর্ছা’ যাওয়ার অবস্থা ফসলের মাঠের ‘আনসাং হিরোদের’। কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সরকার। নানাভাবে তাদের দেওয়া হচ্ছে উৎসাহ-সহযোগিতা।

ফলশ্রুতিতে সঙ্কটময় এমন সময়ে হাতগুটিয়ে বসে নেই দেশের সর্ববৃহৎ বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীও। সুনামগঞ্জের হাওরে তারা রীতিমতো অবতীর্ণ হয়েছেন কৃষকের ভূমিকায়। এই বাহিনীটির প্রায় এক হাজার সদস্য সোনালী ধানে ভরপুর হাওরের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠকে সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে রীতিমতো ‘ত্রাতা’র ভূমিকায় নিজেদের উপস্থাপন করেছেন।

চলতি বোরো মৌসুমে সব শঙ্কা-দুশ্চিন্তাকে পায়ের ভৃত্য করে ‘হাওরভাটি’ সুনামগঞ্জের কৃষকদের মনে আনন্দের প্লাবন তৈরি করে দিয়েছেন একেকজন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। বিষয়টি ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।

করোনা ক্রাইসিসে নিজের বিশাল এই বাহিনীর কৃষকের পাশে থাকার এমন ‘মানবিক’ দৃষ্টান্তে যারপরেনাই খুশি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ। তিনি কালের আলো’র সঙ্গে আলাপে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে উৎপাদন নিশ্চিত করার কথা বলেছেন।

৩১ দফা নির্দেশনায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের কৃষকদের সহায়তা করতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের ধান কাটায় যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জেও জয়ী হতে চাই আমরা।’

কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশে এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট আউশ, আমন ও বোরো মিলে প্রায় তিন কোটি ৮৭ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার বেশির ভাগই পূরণ করবে বোরো ধান।

চলতি বছর প্রায় দুই কোটি চার লাখ ৩৬ হাজার টন বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যা মোট উৎপাদন লক্ষ্যের ৫৩ শতাংশ। এছাড়া আমন এক কোটি ৫৩ লাখ ৫৮ হাজার ও আউশ ২৯ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা রয়েছে। গত বছর (২০১৮-১৯) দেশে মোট ধান উৎপাদন হয়েছিল তিন কোটি ৭৩ লাখ ৬৩ হাজার মেট্রিক টন।

একই সূত্র জানায়, হাওরাঞ্চলে সবার আগে ধান কাটা শুরু হয়েছে। দেশের মোট আবাদের ২৩ ভাগই হয়েছে হাওরবেষ্টিত সাত জেলা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। এবার হাওরের এই সাত জেলার বোরো আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে কেবলমাত্র সুনামগঞ্জ জেলার হাওরে এবং সমতলে বোরো আবাদ হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে।

স্থানীয়রা জানায়, দুই বছর আগের হাওরের ফসলহানির দগদগে স্মৃতি এখনো কৃষকের মনে। এবার এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি আর হতে চান না তারা। আবার ঐতিহাসিকভাবেই বোরো মৌসুমে হাওরে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসেন বেশিরভাগ শ্রমিকেরা।

তাঁরা এক একটি দলে এক একটি গ্রামের গৃহস্থ বাড়িতে বা ধানের খলায় থাকতেন। হাওরে ধানশ্রমিকদের বিদায় জানানো হতো ‘কর্মাদি’ নামক এক আনুষ্ঠানিক কৃত্যের মাধ্যমে। কিন্তু সেসব যেন এখন স্মৃতিময় দীর্ঘশ্বাস।

ভয়াবহ শ্রমিক সঙ্কটে উল্টো ‘ত্রাহি’ অবস্থা সুনামগঞ্জসহ হাওরের কৃষককূলের। হাওরের সম্ভাব্য ফসলহানি ঠেকানোর পাশাপাশি খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক মন্দার সম্ভাব্য শঙ্কা উড়িয়ে দিতে বোরো চাষীদের স্বপ্নের সোনার ফসল কেটে ঘরে তুলে দিতে কৃষি শ্রমিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন প্রায় এক হাজার আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদের নির্দেশনায় বাহিনীটির সিলেট রেঞ্জের পরিচালক রফিকুল ইসলাম প্রায় ৪ হাজার সদস্যকে প্রস্তুত করেছেন। সুুনামগঞ্জের জেলা কমান্ড্যান্ট এনামুল খাঁন স্থানীয় জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বোরো ধান কাটা কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জ জেলার ১১টি উপজেলায় প্রায় ১ লক্ষ ৮১ হাজার আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বেশিরভাগ সদস্যই নিম্ন আয়ের। অনেকেরই আবার প্রান্তিক বোরো চাষী। এসবের মধ্যে থেকে ১১টি উপজেলার বাহিনীটির প্রায় ৪ হাজার তরুণ সদস্যদের তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বাহিনীটির স্থানীয় দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা কালের আলোকে জানান, চার হাজার আনসার সদস্যদের মধ্যে জেলা প্রশাসনের বাছাইকৃত এক হাজার সদস্য মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ, জগন্নাথপুর এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ধান কেটেছেন।

একইভাবে পরের দিন বুধবার (২২ এপ্রিল) জেলার সদর, দিরাই, জগন্নাথপুর এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় বোরো চাষীদের জন্য ধান কাটা অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা পুরো বিষয়টি তদারকি করছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, গরিব আনসার সদস্যদের আর্থিক বিষয়টি বিবেচনা করে কৃষি মজুর হিসেবে তাদের অর্থ সহায়তা দিচ্ছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। এতে কৃষকদের কোন খরচা না হলেও তারা উপকৃত হচ্ছেন। আনসার সদস্যদের মজুরির পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে খাবার সহায়তাও।

সুনামগঞ্জ জেলার আনসার সদস্যরা জানান, আমরা নিজেরাও কৃষক পরিবারের সন্তান। সরকারের নির্দেশে আমরা সব রকমের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত। শ্রমিক সঙ্কটের বিষয়টি বিবেচনা করে আমরা ধান কাটায় যুক্ত হয়েছি। যতদিন নির্দেশনা থাকবে ততদিনই আমরা কৃষকদের এই সহায়তা করে যাবো।

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সিলেট রেঞ্জের পরিচালক রফিকুল ইসলাম কালের আলোকে জানান, সিলেট জেলার ১২টি উপজেলায় ৮০ হাজার ৫৬৫ হেক্টর, হবিগঞ্জ জেলার ৬টি উপজেলায় ৪৬ হাজার ৩৬০ হেক্টর এবং মৌলভীবাজার জেলার দু’টি উপজেলায় ৫৩ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে চাষ করা ফসল কাটা ও ঘরে তোলার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক আনসার ও ভিডিপি সদস্য প্রস্তুত রয়েছেন।

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ কালের আলোকে বলেন, ‘হাওরের ফসল উত্তোলন কৃষকের শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়। সারাদেশের খাদ্য ঘাটতি মেটাতেও বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই হাওর বাঁচাতে, দেশ বাঁচাতে হাওরের ফসল সুষ্ঠুভাবে উত্তোলনে আমাদের সর্বাত্নক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বোরো ফসলের উৎপাদন নিশ্চিত করতে দ্রুত হাওরের ধান কেটে গোলায় তোলার প্রচেষ্টায় আমরা সম্পৃক্ত হতে পেরে পরম মানসিক তৃপ্তি অনুভব করছি। সবার সম্মিলিত উদ্যোগ সকল শঙ্কাকে উড়িয়ে হাওরে শান্তি নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।’

কালের আলো/এসএম/আরআর

Print Friendly, PDF & Email