একুশের প্রতিবেদনে আনন্দবাজারীয় হীনম্মন্যতাজনিত বিদ্বেষ

প্রকাশিতঃ 1:29 pm | March 03, 2018

দিদার মালেকী:

‘কলকাতায় হিন্দু রমণীদের শাঁখা-সিঁদুরের ব্যবহার কমছে’। পাঠক আপনি কল্পনা করুন, বাংলাদেশের কোনো একটি জাতীয় দৈনিক এই শিরোনমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করল। প্রতিবেদনে বলা হলো, কোনো এক দিবস উপলক্ষে কলকাতার রাস্তায় ঢল নেমেছে অজস্র নারী-পুরুষের। তবে লক্ষণীয় হলো, নারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে শাঁখা এবং কপালে সিঁদুর দেখা যায়নি তেমন!

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর কলকাতার সাংবাদিক মহল বাংলাদেশের সাংবাদিকদের নানা অজ্ঞতা তুলে ধরতে সচেষ্ট হলেন! তারা দেখাতে চাইলেন, ঢাকার সাংবাদিকতা খুবই নিম্নমানের! আর এ প্রতিবেদন দেখে সেখানকার বুদ্ধিজীবী মহল বলা শুরু করল, এটা হিন্দু রমণীদের নিজস্ব ব্যাপার। কারওর ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে এভাবে বলা অন্যায় শুধু নয়, গর্হিত অপরাধও! এমনকি জোরালো প্রতিবাদ বক্তৃতা-বিবৃতি দিলো পশ্চিমবঙ্গের মায় খোদ ভারতের কর্তাব্যক্তিরাও!

প্রিয় পাঠক, এটি ছিল নিছক সংবাদকল্পনা মাত্র। দেশ-বিদেশের কোনো বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম এ ধরনের প্রতিবেদন করেনি। অন্তত এ যাবতকালে এমন ‘ফালতু’ প্রতিবেদন এ মতামত লেখকের চোখে পড়েনি। বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের কোনো বিষয় নিয়ে তো নয়ই। দেশটিতে নিত্যদিন সংবাদ হওয়ার মতো সহস্র পশ্চাৎপদ বিষয় থাকলেও ঢাকার গণমাধ্যমগুলো তা এড়িয়ে যায়। কারণ এখানকার সাংবাদিক মহল পারস্পরিক শ্রদ্ধা-সম্মানের জায়গাটি আদতেই সম্মান করেন। আর অপর দেশের অভ্যন্তরীণ কিংবা ধর্মগতভাবে স্পর্শকাতর কোনো অপ্রাসঙ্গিক প্রতিবেদন প্রকাশের তো প্রশ্নই আসে না। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বাংলাদেশের ক্ষতি চায় এমন রাষ্ট্রের বেলায়ও ঢাকার মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর সেই স্থৈর্য লক্ষণীয়।

গৌরচন্দ্রিকায় এই কাল্পনিক সংবাদবিলাসের চেষ্টা কেন—দেখার চেষ্টা করি। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হলো বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের আর কোথাও এদিনটি কে কীভাবে পালন করছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে সেটা গৌণ। তাদের কাছে মুখ্য হলো এদিনটি তারা কে কীভাবে পালন করছে সেটা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ার আগে থেকেই বাংলাদেশে এটি ভাষাশহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এদিন যে জায়গাটি মূল কেন্দ্রের ভূমিকায় থাকে, সেটি শহীদ মিনার। ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহর থেকেই শহীদ মিনারের দিকে ঢল নামে ভাষাপ্রেমী সর্বস্তরের মানুষের। নানা বয়সী নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে গোটা দিনটি ব্যাপক এক মাত্রা পায়, যার সঙ্গে যুক্ত থাকে তাদের ভাষাপ্রেম, আবেগ এবং ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টি।

কথা হলো, সেদিনটিতে সমাগত মানুষের, আরও খোলাসা করে বললে নারীদের পরিধেয় কী হবে না হবে, সেটি নিতান্তই তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। পশ্চিমবঙ্গীয় বুদ্ধিজীবীদের যুক্তিতেও যদি বলি—সেটা তাদের ব্যক্তিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। এমনকি তার সঙ্গে যার যার ধর্মগত কারণও যুক্ত থাকতে পারে। কেউ যদি মনে করেন নিজেকে আগাগোড়া ঢেকেই শহীদ মিনারে যাবেন—তিনি যেতেই পারেন। আবার কেউ যদি মনে করেন খোলামেলা পোশাক পরে যাবেন—তাকেও বাধা দেয়ার কিছু নেই। মোদ্দাকথা শহীদ মিনারমুখো মানুষের মধ্যে কে কী পরিধান করে এসেছেন— সেটা দেখতে চাওয়াও রুচিহীন ও অশোভন ব্যাপার।

আর এমনই এক অশোভন পর্যবেক্ষণের নমুনা দেখাল আনন্দবাজার পত্রিকা। পশ্চিমবঙ্গের এই পত্রিকাটির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে সংবাদ করার মতো যেন আর কোনো বিষয় ছিল না! তারা অমর একুশে নিয়ে এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে ‘একুশের ঢাকায় কোনও আবরণ নেই হিজাবের’। (সংবাদটির ভেতরে কী আছে সে প্রসঙ্গের অবতারণা নাই-বা করলাম। আগ্রহী পাঠক সেটি দেখে নিতে পারেন)। ভাবুন তো একবার, এটা সাংবাদিকতার মধ্যে পড়ে নাকি আনন্দবাজারীয় হীনম্মন্যতাজনিত বিদ্বেষ!

দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমের ভিতর-বাহির নিয়ে যারা অল্পবিস্তর খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন যে আনন্দবাজারের কাছ থেকে বাংলাদেশ নিয়ে ভালো কোনো প্রতিবেদন আশা করা যায় না। এই পত্রিকাটি সেখানকার নানা মহলেও নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশের কারণে সমালোচিত। অমর একুশের প্রতিবেদনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অহেতুক নারীদের হিজাবের প্রসঙ্গ টেনে এনে তারা সেই বিদ্বেষের প্রকাশ করেছে।

আনন্দবাজারে এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর কয়েকজন সহকর্মী সাংবাদিককে দেখেছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এর বাইরে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যার শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক এক নতুনতর উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছেছে। এমন এক সময়কালে আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা গোষ্ঠীর এ ধরনের বিদ্বেষপ্রসূত সংবাদ বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভুল বার্তা দেবে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলোকে ঢাকার সাংবাদিক মহল থেকেও এই বার্তা দেয়ার সময় এসেছে— ঢাকা তথা বাংলাদেশের ওপর কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন তারা স্বাভাবিকভাবে নেবে না। অন্যথায় বাংলাদেশ নিয়ে যা ইচ্ছে তাই প্রতিবেদন তৈরিতে এদের হীন উদ্দেশ্যকেই প্রশ্রয় দেয়া হবে।

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও গবেষক

কালের আলো/ওএইচ

Print Friendly, PDF & Email