আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম

বিশ্বের শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়তে কিমের নির্দেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম

বিশ্বের শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়তে কিমের নির্দেশ

উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করতে প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধপ্রস্তুতি জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির নেতা কিম জং উন। সেনাবাহিনীর প্রতিটি ইউনিটকে আরও দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একই সময়ে নতুন নির্মিত একটি সেতু দিয়ে চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে কিমের পৌঁছানোর খবর প্রকাশ করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম। তবে তাঁর চীন সফরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) জানায়, রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত সেনাবাহিনীর কোম্পানি কমান্ডারদের দুই দিনের সম্মেলনে কিম এসব নির্দেশ দেন। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে দেশটির সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ জোরদার এবং যুদ্ধপ্রস্তুতি উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি ও ইয়োনহাপ জানিয়েছে, কিম নতুন ইয়ালু নদীর সেতু ব্যবহার করে চীনে প্রবেশ করে থাকতে পারেন। দুই দেশের সীমান্তসংযোগকারী এই সেতু দিয়ে তাঁর সম্ভাব্য যাত্রা উত্তর কোরিয়া ও চীনের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

সামরিক বিপ্লবের আহ্বান কিমের
কোম্পানি কমান্ডারদের সম্মেলনে কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে ‘কোরীয় ধাঁচের সামরিক বিপ্লব’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি সুপরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন তিনি।

কিমের বক্তব্যে সামরিক বাহিনীর তৃণমূল পর্যায়ের ইউনিটগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, প্রতিটি সেনা কোম্পানিকে সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতার দিক থেকে আরও উন্নত করতে হবে।

সেনাবাহিনীর কোম্পানি পর্যায়ের ইউনিটগুলো সামরিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ইউনিটের প্রশিক্ষণ ও সমন্বয় উন্নত হলে সামগ্রিক যুদ্ধপ্রস্তুতি জোরদার হতে পারে। উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব এখন সেই লক্ষ্যেই প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

কিমের নির্দেশনায় শুধু সৈন্যদের শারীরিক ও সামরিক প্রশিক্ষণ নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র পরিচালনা, যোগাযোগ, নজরদারি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীকে এসব ক্ষেত্রে আরও সক্ষম করে তোলাই নতুন পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সেনাবাহিনীর সম্মেলন ঘিরে বিশেষ গুরুত্ব
কেসিএনএর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার পর পুরো সেনাবাহিনীকে নিয়ে এ ধরনের সম্মেলন এই প্রথম। ফলে সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা নিয়ে কিমের বক্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির দলীয় কংগ্রেসে কিম উত্তর কোরিয়ার প্রচলিত সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে প্রশিক্ষণ জোরদার এবং যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ সামনে এসেছে।

উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলে আসছে। দেশটির সামরিক কর্মসূচিতে প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। নতুন সম্মেলনে কিমের নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, অস্ত্রের উন্নয়নের পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনাকারী সেনাদের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধপ্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে উত্তর কোরিয়া কী ধরনের সময়সীমা বা নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, সে বিষয়ে কেসিএনএর প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

এআই প্রযুক্তির অস্ত্র পরীক্ষায় জোর দিচ্ছে পিয়ংইয়ং
সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়া বেশ কয়েকটি অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন ধরনের নির্ভুল লক্ষ্যভেদী টর্পেডো ব্যবস্থা এবং একটি মধ্যম পাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। দেশটির দাবি, এসব অস্ত্রের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের ক্ষেত্রে লক্ষ্য শনাক্ত করা, গতিপথ নির্ধারণ এবং আঘাতের নির্ভুলতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের উচ্চ গতি ও গতিপথের বৈশিষ্ট্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। উত্তর কোরিয়া এসব প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে অস্ত্রগুলোতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সেগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে উত্তর কোরিয়ার দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য নেই। সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্রের পরীক্ষা এবং প্রচলিত ও কৌশলগত সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে দেখা যায়, পিয়ংইয়ং তার সামরিক কর্মসূচির বিভিন্ন দিক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

নতুন ইয়ালু নদীর সেতু দিয়ে চীনে কিম
সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়ার খবরের পাশাপাশি কিম জং উনের সম্ভাব্য চীন সফর নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি সূত্রের বরাতে এএফপি জানিয়েছে, কিম চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে পৌঁছে থাকতে পারেন। নতুন নির্মিত নিউ ইয়ালু নদীর সেতু দিয়ে তিনি চীনে প্রবেশ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সরকারি সূত্র এএফপিকে জানায়, কিম ওই সেতু ব্যবহার করে দানদংয়ে পৌঁছেছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে তাঁর যাত্রার উদ্দেশ্য, সফরের সময়সূচি কিংবা চীনে তাঁর সম্ভাব্য কর্মসূচি সম্পর্কে সূত্রটি বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

পরে দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপও অজ্ঞাত সরকারি সূত্রের বরাতে জানায়, দিনের শুরুতে কিম নতুন সেতু দিয়ে চীনে প্রবেশ করেন। এ খবর প্রকাশের পর তাঁর সম্ভাব্য সফর নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে কিমের চীন সফর এবং সেতু দিয়ে তাঁর যাত্রার বিষয়ে উত্তর কোরিয়া বা চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। এএফপি এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে জানানো হয়েছে।

উত্তর কোরিয়া-চীন যোগাযোগ নিয়ে বাড়তি আগ্রহ
উত্তর কোরিয়া ও চীনের মধ্যে সীমান্তসংযোগ দুই দেশের যাতায়াত ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী দানদং দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের বাণিজ্যিক ও পরিবহন যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। নতুন সেতু দিয়ে কিমের সম্ভাব্য যাত্রার খবর তাই শুধু তাঁর সফরসংক্রান্ত বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের সীমান্ত যোগাযোগ এবং উচ্চপর্যায়ের সম্ভাব্য যাতায়াত নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে কিমের সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় এটিকে সামরিক বা কূটনৈতিক কোনো নির্দিষ্ট উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ নেই। সফরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হলে এর কর্মসূচি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও সম্ভাব্য সফর ঘিরে নজরদারি
একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সেনাদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন কিম জং উন। অন্যদিকে, নতুন সেতু দিয়ে তাঁর চীনে প্রবেশের খবর প্রকাশিত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমে।

এই দুই ঘটনা একই সময়ে সামনে এলেও এগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সামরিক সম্মেলনের বক্তব্য উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনার ওপর আলোকপাত করছে। আর সম্ভাব্য চীন সফরের খবর দুই দেশের যোগাযোগ নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। কিমের সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং তাঁর চীন সফরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কী তথ্য প্রকাশ করা হয়, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। সূত্র:কেসিএনএ, এএফপি, রয়টার্স, ইয়োনহাপ

কালের আলো/এসএ/এএইচ

Link copied!