বেড নেই। তাই হাসপাতালের মেঝেই ভরসা। কোথাও সিঁড়ির গোড়ায়, কোথাও লিফটের পাশে, আবার কোথাও ওয়ার্ডের ফাঁকা ফ্লোরে শুয়ে চলছে ডেঙ্গুর চিকিৎসা। রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৯, ১১ ও ১২ তলায় এখন এমনই চিত্র। নির্ধারিত ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে রোগীদের থাকতে হচ্ছে মেঝেতে। চিকিৎসক-নার্সদের সেবা নিয়ে সন্তুষ্টি থাকলেও পরীক্ষা করানো, রিপোর্ট সংগ্রহ এবং লিফটে ওঠানামার দীর্ঘ অপেক্ষায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের।
১৪ বছরের জামিলের তিন দিন ধরে জ্বর। জ্বর উঠছে ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত। সঙ্গে হাত-পায়ে ব্যথা, বমি ও পাতলা পায়খানা। গতকাল তাকে নিয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন মা নাহিদা ও পরিবারের আরও চার সদস্য। বেড না পেয়ে নয়তলার লিফটের পাশের একেবারে শেষ প্রান্তে মেঝেতে ঠাঁই হয় জামিলের। স্যালাইন চলছে, পাশে বসে আছেন পরিবারের সদস্যরা। ডেঙ্গুসহ তিনটি পরীক্ষা করানো হলেও তখনো রিপোর্ট মেলেনি। তবে হাসপাতালে আসার পরপরই ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে।
- দুই ওয়ার্ডে ১৪৯ রোগী, ঠাঁই হচ্ছে মেঝেতে
- লিফটের পাশে ১৪ বছরের জামিল, স্যালাইন চলছে মেঝেতে
- চিকিৎসায় স্বস্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাতায়াতে ভোগান্তি
নাহিদার কাছে মেঝেতে থাকার কষ্টের চেয়ে বড় বাস্তবতা, ছেলের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ অনেক বেশি। তাই বেড না পেলেও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়াই তার ভরসা। জামিলের মতো রোগীদের উপস্থিতি বলে দিচ্ছে, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা চলছে, কিন্তু শয্যা ও সেবা গ্রহণের বিভিন্ন ধাপে চাপ অনুভব করছেন রোগী ও স্বজনেরা।
দুই ওয়ার্ডে ১৪৯ রোগী, নতুন ভর্তি ৩০
গতকাল হাসপাতালের ১২ তলার নারী ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ৭৪ জন এবং ১১ তলার পুরুষ ওয়ার্ডে ৭৫ জন। দুই ওয়ার্ডে মোট রোগী ১৪৯ জন। এর মধ্যে গতকাল নতুন ভর্তি হয়েছেন পুরুষ ওয়ার্ডে ১৬ জন এবং নারী ওয়ার্ডে ১৪ জন। বেডে জায়গা না হওয়ায় অনেককে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে।
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা মূলত ১১ ও ১২ তলায়। তবে নয়তলার মেডিসিন ওয়ার্ডেও রয়েছেন ডেঙ্গু সন্দেহভাজন রোগী এবং ডেঙ্গুর সঙ্গে টাইফয়েডে আক্রান্ত ব্যক্তিরা। হাসপাতালের এসব তলায় গিয়ে দেখা যায়, কেউ বেডে, কেউ মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীদের অবস্থান ছড়িয়ে পড়েছে সিঁড়ির গোড়া ও লিফটের পাশেও। কেউ ভর্তি হয়েছেন আগের দিন, কেউ দুই দিন ধরে হাসপাতালে, আবার কেউ পাঁচ থেকে সাত দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অসুস্থ শরীরে মেঝেতে থাকা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো এবং এক তলা থেকে অন্য তলায় যাতায়াত—সব মিলিয়ে রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়তি দুর্ভোগ সামলাতে হচ্ছে।
চিকিৎসায় সন্তুষ্টি, অভিযোগ পরীক্ষার দীর্ঘ সারি নিয়ে
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের সেবা নিয়ে কথা বলা রোগীদের মধ্যে সন্তুষ্টি দেখা গেছে। তবে পরীক্ষা করানো ও রিপোর্ট সংগ্রহের দীর্ঘ প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ রয়েছে ব্যাপক। রোগীর স্বজনদের ভাষ্য, সকাল ৮টায় পরীক্ষা করাতে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার আগে সিরিয়াল পাওয়া যায় না। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর রিপোর্ট সংগ্রহ করতে আবারও লাইনে দাঁড়াতে হয়। এতে আরও প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় চলে যায়।
মেরাদিয়া থেকে ছয় দিন আগে ভাইকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন রিটন। গতকাল সন্ধ্যায় পুরুষ ওয়ার্ডে দেখা যায়, মশারির ভেতরে বসে খাবার খাচ্ছেন তার ভাই। বাইরে বসে প্রয়োজনীয় জিনিস এগিয়ে দিচ্ছেন রিটন। খাওয়া শেষে পানি ঢেলে ভাইকে হাত ধুতেও সাহায্য করেন তিনি।
রিটন জানান, হাসপাতালের চিকিৎসার মান ভালো। কিন্তু প্রতিদিন সকালে পরীক্ষা করাতে অন্তত দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। রিপোর্ট সংগ্রহে অপেক্ষা করতে হয় আরও অন্তত এক ঘণ্টা। তার অভিযোগ, রোগীর স্বজনদের লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অনেক সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়। স্বজনদের প্রতি তাদের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
চারটি লিফটেও কমছে না অপেক্ষা
পরীক্ষার ভোগান্তির পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের বড় সমস্যা লিফট। প্রতিবার লিফটে উঠতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ তাদের। হাসপাতালে চারটি লিফট রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি রোগীদের জন্য নির্ধারিত। তারপরও দিনের বেলায় রোগী, স্বজন ও অন্য সেবাগ্রহীতাদের ভিড়ে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
কুমিল্লা থেকে ছেলেকে নিয়ে আসা তোফাজ্জল হোসেন জানান, তার ছেলে ডেঙ্গু ও টাইফয়েড—দুই রোগেই আক্রান্ত। পরীক্ষা করানো, রিপোর্ট সংগ্রহ ও লিফটে যাতায়াত—তিন ক্ষেত্রেই ভোগান্তি হচ্ছে। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত লিফটে চাপ বেশি থাকে, এরপর কিছুটা কমে। বিশেষ করে দুর্বল রোগীকে নিয়ে লিফটের সামনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা কঠিন। রোগীর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বারবার ওঠানামা করতেও স্বজনদের বাড়তি সময় ও শ্রম দিতে হচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা কম খরচে, তবু ব্যয়ের চাপ
বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ কম হওয়ায় স্বস্তি পাচ্ছেন অনেক রোগী ও স্বজন। তবে ওষুধ, পরীক্ষা ও খাবারের ব্যয় মিলিয়ে পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ থাকছে। স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারও দৈনিক খরচ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, আবার কারও ক্ষেত্রে তা ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত হচ্ছে। রোগীর অবস্থা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-ওষুধের ওপর ব্যয় নির্ভর করছে।
সুজন নামের এক রোগীর স্বজন জানান, হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ ও স্যালাইন দেওয়া হলেও সব প্রয়োজন মেটে না। ছয় দিনে তাদের প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। তার মতে, এই খরচ অনেক পরিবারের কাছে সহনীয় হলেও অতিদরিদ্র মানুষের জন্য তা বড় বোঝা।
চিটাগাং রোডের বাসিন্দা মো. মোস্তফা ছেলে সিয়ামকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। তিনি জানান, জ্বরের পাঁচ দিন পর ছেলের পাতলা পায়খানা শুরু হয়। তৃতীয় দিন থেকে প্লাটিলেট কমতে থাকে। প্রথমে প্লাটিলেট ছিল ১ লাখ ৭ হাজার, চতুর্থ দিনে ৮৫ হাজার এবং পঞ্চম দিনে ৫৫ হাজারে নেমে আসে। গতকাল হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসার খরচ তুলনামূলক কম হলেও ফলমূলের দাম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্লাটিলেট ২৯ হাজারে নেমে যাওয়ার পর মুগদায় ভর্তি
নয়তলার মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন খিলগাঁও গভর্নমেন্ট স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাসনুরের মা রোকেয়া জানান, জ্বরের পাঁচ দিনের মাথায়, ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত, ছেলের প্লাটিলেট কমে ২৯ হাজারে নেমেছিল। ষষ্ঠ দিনে তা বাড়তে শুরু করে এবং ৪৩ হাজারে পৌঁছায়।
রোকেয়া বলেন, ছেলের জ্বর ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছিল। সঙ্গে পেটব্যথা ও বমি ছিল। খাবার খেলেই বমি করে দিত। প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে প্লাটিলেট কমতে থাকায় চিকিৎসকেরা যেকোনো সময় আইসিইউ প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান এবং সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে ১৭ অক্টোবর ছেলেকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন তিনি। তার ভাষ্য, এখানে আসার পর প্লাটিলেট বাড়তে শুরু করে। রোকেয়া জানান, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ অনেক বেশি। মুগদা হাসপাতালে প্রায় বিনা খরচেই ভালো সেবা পাচ্ছেন। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে ভোগান্তি হচ্ছে।
গত বছরের তুলনায় রোগী কম, তবু চাপের অভিজ্ঞতা
হাসপাতালের নার্সদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তুলনায় এবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কম। ১২ তলার নারী ওয়ার্ডের সেবিকা সুজাতা মল্লিক জানান, বর্তমানে এই ওয়ার্ডে প্রতিদিন প্রায় ৮০ জন রোগী থাকছেন। ২০২৩ সালে রোগীর সংখ্যা ৩০০ থেকে ৩৫০ পর্যন্ত উঠেছিল। সেই তুলনায় এবার চাপ কম বলে মনে করছেন তিনি।
পুরুষ ওয়ার্ডের সেবিকা সুচি জানান, দুই দিন আগে রোগী ছিলেন ৮৬ জন। পরবর্তী দুই দিন রোগীর সংখ্যা ৭৪ থেকে ৭৫ জনের মধ্যে রয়েছে। তার মতে, রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে রোগীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কম হলেও মেঝেতে চিকিৎসা নেওয়া, পরীক্ষা করাতে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং লিফটের ভিড়ের মতো সমস্যাগুলো থেকেই যাচ্ছে।
সেবার পাশাপাশি নজর দরকার রোগী ব্যবস্থাপনায়
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান চিত্রে চিকিৎসাসেবার প্রতি আস্থার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। রোগীরা চিকিৎসক-নার্সদের সেবায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন, সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসাও পাচ্ছেন। কিন্তু বেডের অভাবে মেঝেতে থাকা, পরীক্ষা ও রিপোর্টের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং লিফটে ওঠানামার ভোগান্তি চিকিৎসা গ্রহণের প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলছে।
জামিলের মতো কিশোরকে লিফটের পাশে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, রিটন ও তোফাজ্জল হোসেনের মতো স্বজনদের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিদিন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সময় কাটাতে হচ্ছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু চিকিৎসা চালু রাখাই যথেষ্ট নয়; রোগীর শয্যা নিশ্চিত করা, পরীক্ষা ও রিপোর্ট সরবরাহের প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং লিফটে ভিড় কমানোও জরুরি। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাই মূল চ্যালেঞ্জ শুধু রোগীর চাপ সামলানো নয়, বরং চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে এই বাড়তি ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়া।
কালের আলো/টিইকে/এমকে
