নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম

অবৈধ ফোনে বছরে ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি, কঠোর হচ্ছে বিটিআরসি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম

অবৈধ ফোনে বছরে ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি, কঠোর হচ্ছে বিটিআরসি

অবৈধ মোবাইল ফোন আমদানি, উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে জাতীয় যন্ত্রপাতি শনাক্তকরণ নিবন্ধন ব্যবস্থা (এনইআইআর) পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এ ব্যবস্থা চালু করা হবে।

এনইআইআর চালুর মাধ্যমে অবৈধভাবে আমদানি করা, চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করা এবং ক্লোন করা মোবাইল হ্যান্ডসেট শনাক্ত করার পাশাপাশি মোবাইল আর্থিক সেবায় (এমএফএস) জালিয়াতি প্রতিরোধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বছরে ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মূল্যায়ন অনুযায়ী, অবৈধ মোবাইল ফোনের কারণে সরকার বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। বিটিআরসির কমিশন সভায় উপস্থাপিত কার্যপত্রেও এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অবৈধ হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ, টেলিযোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এনইআইআর চালুর প্রথম ধাপে ব্যবস্থাটির মৌলিক কার্যক্রম শুরু হবে। এ পর্যায়ে বর্তমানে মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কে সচল থাকা সব হ্যান্ডসেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে। ফলে প্রথম ধাপেই বিদ্যমান ফোনগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হবে না।

একই সঙ্গে অনুমোদিত আমদানিকারক ও দেশীয় উৎপাদকদের কাছে অবিক্রীত থাকা মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বরের তথ্যও ব্যবস্থাটিতে যুক্ত করা হবে। এর ফলে বাজারে থাকা ফোনের পরিচয় যাচাই এবং অনুমোদিত ও অননুমোদিত হ্যান্ডসেট শনাক্ত করার প্রক্রিয়া সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে অবৈধভাবে আমদানি করা, চোরাচালানের মাধ্যমে আনা এবং শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে বাজারজাত করা হ্যান্ডসেট শনাক্ত ও বন্ধ করার ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে নিবন্ধন বাতিলের কার্যক্রম
এনইআইআরের দ্বিতীয় ধাপে উপযুক্ত সময়ে হ্যান্ডসেটের নিবন্ধন বাতিলের কার্যক্রম চালু করা হবে। এ পর্যায়ে ফোনের মালিকানা যাচাই, ক্লোন হ্যান্ডসেট শনাক্ত এবং মোবাইল আর্থিক সেবায় জালিয়াতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এনইআইআরের মাধ্যমে নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত প্রতিটি মোবাইল যন্ত্রের পরিচয় শনাক্ত করা গেলে চোরাই ফোনের ব্যবহার এবং একই আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে একাধিক ফোন চালানোর মতো অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। তবে দ্বিতীয় ধাপে ঠিক কোন পদ্ধতিতে নিবন্ধন বাতিল করা হবে এবং কোন শ্রেণির ফোনের ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বাস্তবায়ন নির্দেশনা এখনো স্পষ্ট নয়।

২০২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হলেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি
বিটিআরসির স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাপরিচালক কমিশন সভায় এনইআইআর পুনরায় চালুর বিষয়ে বিস্তারিত কার্যপত্র উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয়, ২০২১ সালের ১ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবস্থাটি চালু করা হয়েছিল। তবে তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করা এবং ক্লোন হ্যান্ডসেট প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালু করা হয়নি। ফলে ব্যবস্থাটির মূল উদ্দেশ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এবার দুই ধাপে এনইআইআর চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে বিটিআরসির স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। এ বিষয়ে সরকারের পূর্বানুমোদন পেতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে।

বিভিন্ন পর্যায়ে চালুর উদ্যোগ, এবার লক্ষ্য ২০২৭ সালের জানুয়ারি
অবৈধ হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর বিটিআরসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায় এনবিআর। পরে ২০২৫ সালের ২৮ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এনইআইআর পুনরায় চালুর পরিকল্পনায় প্রাথমিক অনুমোদন দেয়।

২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় সভায় দেশের সব মোবাইল নেটওয়ার্কে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি থাকলেও জনভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হ্যান্ডসেট বন্ধ করার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলো কার্যকর করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ৯ জুন নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয় তুলে ধরে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রয়োজনীয়তা জানায়। একই বছরের ২ জুলাই আইএমইআই, সিম নিবন্ধন এবং মোবাইল আর্থিক সেবায় জালিয়াতির ঝুঁকি নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভাতেও ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর সুপারিশ করা হয়। সর্বশেষ ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ওই সভায় ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এনইআইআর চালুর সুপারিশ করা হয়।

চোরাই ফোন ও আর্থিক জালিয়াতি ঠেকানোর লক্ষ্য
সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, অনিবন্ধিত, চোরাই ও ক্লোন হ্যান্ডসেট সংঘবদ্ধ অপরাধ, মোবাইল ফোন চুরি এবং মোবাইল আর্থিক সেবায় জালিয়াতির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত প্রতিটি যন্ত্রের পরিচয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা প্রয়োজন বলে মনে করছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।

এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে অবৈধ ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, চোরাই হ্যান্ডসেট শনাক্ত এবং টেলিযোগাযোগ খাতে অনিয়ম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিবন্ধন পদ্ধতি, তথ্য যাচাই এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কতটা নির্ভুলভাবে পরিচালিত হয় তার ওপর।

২০২৯ সালের মধ্যে ২জি ফোনের ব্যবহার বন্ধের পরিকল্পনা
এদিকে, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দ্বিতীয় প্রজন্মের (২জি) নেটওয়ার্ক-সমর্থিত মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বন্ধের পর্যায়ক্রমিক রূপরেখাও অনুমোদন করেছে বিটিআরসি। এ পরিকল্পনার আওতায় এ ধরনের ফোনের অনুমোদন, উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। অর্থাৎ অবৈধ হ্যান্ডসেট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পুরোনো প্রযুক্তিনির্ভর ফোনের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার দিকেও এগোচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তবে এনইআইআর চালুর ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যবহারকারীদের ভোগান্তি এড়ানো, বৈধ ফোনের নিবন্ধন নিশ্চিত করা এবং নতুন নিয়ম সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

Link copied!