হেফাজতের আত্মশুদ্ধি না আত্মরক্ষার কৌশল?

প্রকাশিতঃ 10:23 am | April 27, 2021

আনিস আলমগীর :

হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর বাংলা ট্রিবিউনেই গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ‘আল্লামা শফী, হেফাজত এবং হাটহাজারী মাদ্রাসা’ শিরোনামের কলামটির উপসংহারে লিখেছিলাম যে, ‘আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর এখন প্রশ্ন, হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক কে হবেন এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান কে হবেন, সর্বোপরি রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হেফাজতের নেতৃত্ব কার কাছে যাবে? পরিবেশ পরিস্থিতি বলছে, সেটি বিএনপি-জামায়াত অনুগত লোকদের হাতে যাবে। সেক্ষেত্রে দুই বাবুনগরীর কেউ যাতে হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রধান বা হেফাজতের প্রধান না হতে পারেন সেই প্রচেষ্টাও ভিন্ন মহল থেকে থাকবে। আহমদ শফীর সঙ্গে ওই দুই বাবুনগরীর অনুসারীরা সর্বশেষ যা করেছে সেই অমানবিক ক্ষত মুছে তারা সহজে সফল হবেন কিনা জানি না। তারা নেতৃত্বে এলে হাটহাজারী মাদ্রাসা এবং হেফাজত ভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করবে এমন একটা আশঙ্কা রয়েছে, যদিও এটা পরিষ্কার যে আল্লামা আহমদ শফীর সমতুল্য কোনও নেতার উত্থানের সম্ভাবনা আপাতত খুবই ক্ষীণ। ’

ছয় মাস যাওয়ার আগেই সব কয়টি কথা সত্য প্রমাণ করেছে হেফাজতে ইসলাম। তারা ভিন্নরূপেই আত্মপ্রকাশ করেছে। তার পরিণতিতে ভাস্কর্য নিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন, বিদেশি অতিথির আগমন নিয়ে জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচি, ধর্মীয় হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ শেষে সরকারের রোষানলে পড়েছে। এরমধ্যে হেফাজত ২৫ এপ্রিল কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছেন হেফাজত প্রধান জুনায়েদ বাবুনগরী।

গত মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ-সহিংসতার পর হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সরকারের গ্রেফতার অভিযান চলমান রয়েছে। কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠনটির কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দিয়ে বাবুনগরী যে নতুন রণকৌশল নিয়েছেন, আবার যে সুযোগ মতো মাঠে আসবেন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পর পরই তিনি তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। এরা নতুন কমিটি করবে বলছেন। তাদের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত জানাবেন বলেও ঠিক হয়েছে।

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্রদের বরাবর রাস্তায় নামিয়ে তাণ্ডব চালিয়ে বাবুনগরীরা এখন বলছেন, কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকেরা প্রচলিত সব ধরনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকবে। এতদিন যারা কে আস্তিক কে নাস্তিক, কথায় কথায় ফতোয়া দেওয়া, মানুষকে কাফের বলা, রাষ্ট্রের সংবিধানের বিরুদ্ধে যাওয়া, অন্যের ব্যক্তিগত অধিকারে নাক গলানোকে ইসলামের হেফাজত মনে করেছেন, তারা হঠাৎ রিসোর্টকাণ্ডের পর ‘ব্যক্তিগত অধিকার’, ‘মৌলিক অধিকার বিষয়ে জাতিকে লেকচার দিচ্ছেন। মামুনুলের রাষ্ট্র এবং ইসলামবিরোধী ভ্রষ্টাচারকে মিটিং করে ‘শুদ্ধ’ ঘোষণা করেছেন। তার মৌলিক অধিকার নিয়ে কথা বলছেন।

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের রাজনীতি করতে নিষেধ করেছে কে? রাজনীতি করাতো তাদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু রাজনীতি করতে হবে রাজনীতির নামে। অরাজনৈতিক সংগঠন নাম দিয়ে রাজনীতি করার ভণ্ডামি চলবে না। রাজনীতি তারা এখনও করছে। ইসলামি আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলামি এবং ইসলামি ঐক্যজোট- এই দলগুলো মিটিং করে কাদের দিয়ে! সব তো নিজস্ব কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, এতিম ছেলেদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করে।

বিক্ষোভ-সহিংসতার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন জেলায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অন্তত ৭৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৬৯ হাজারের বেশি জনকে আসামি করা হয়েছে। এর আগে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে তাণ্ডব চালানোর মামলাও আছে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রায় সবার বিরুদ্ধে। কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ১৯ জন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন নাম দিয়ে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক শাহ আহমদ শফীর হাত ধরে যাত্রা শুরু করেছিল হেফাজত। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত নেতারা সিংহভাগ বিভিন্ন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এদের আশ্বাসেই ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের জনসভার আগে আগে আরেক জনসভায় খালেদা জিয়া ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন শেষ হাসিনাকে পদত্যাগের জন্য। বিএনপি-জামায়াত এবং এরশাদের জাতীয় পার্টিও হেফাজতের শাপলা চত্বর কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়েছিল এবং দেশব্যাপী হেফাজত আলোচনায় আসে সেই ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি দিয়ে।

অবশ্য লাইম লাইটে আসতে শুরু করে ২০১১ সালে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে সরকার ঘোষিত ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালার’ সমালোচনায় মুখর হয়ে। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে নাস্তিকতার অভিযোগ তুলে, দেশে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করে, যার সিংহভাগ মধ্যযুগীয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৩ দফা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রথমে সংগঠনটি ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকা অবরোধ ও ৫ মে শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকে।

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর সংগঠনটির একাংশের সঙ্গে বিরোধের মধ্যে ১৫ নভেম্বর সদ্য বিলুপ্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। জুনায়েদ বাবুনগরী নেতৃত্বাধীন কমিটিতে শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানী এবং তার অনুসারী কাউকে রাখা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এবার আল্লামা শফীর অনুসারীদেরও কমিটিতে রাখা হবে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হেফাজত যখন কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘কওমি জননী’ আখ্যা দিয়ে সংবর্ধনা দিয়েছিল, শফী বিরোধীরা তথা বাবুনগরীরা সে অনুষ্ঠানকে ভালোভাবে নেয়নি। অনেকে আসেননি।

যাই হোক, হেফাজতের বিরুদ্ধে সরকারের চলমান কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং বাবুনগরীর পিছু হটা- দু’টিকেই আমি অভিনন্দন জানাই। বাবুনগরী নিশ্চয়ই খবর রাখেন যে তারা যখন বাংলাদেশে জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন করছেন তখন পাকিস্তানি তালেবান গোষ্ঠী ফ্রান্সের কার্টুন ইস্যুতে ফ্রান্স রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহারের দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গি শক্তি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে।

ইমরান খান সরকার মোল্লা গোষ্ঠীকে ছাড় দেয়নি, ‘ডাণ্ডা মেরে ঠান্ডা’ করে দিয়েছে। মোল্লাদের তেহরিক-ই-লাবিয়াক পাকিস্তান (টিএলপি) পার্টিকে নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশেও সরকার যদি হেফাজতকে বরাবরের মতো ছাড় দেওয়া, তাদের সঙ্গে সমঝোতা করার নীতি বজায় রাখে, তাহলে এই মোল্লারাও বাংলাদেশকে পাকিস্তান-আফগানিস্তান বানানোর স্বপ্ন থেকে পিছু হটবে না।

গত কয়েক মাস সমর্থকদের সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে, রাষ্ট্রের আইন-কানুনের বিরুদ্ধে উসকানি দিয়ে- এখন ‘কাউকে ক্ষমতায় বসানো-নামানো হেফাজতের কাজ নয়’ বলে পার পাওয়া উচিত হবে না। বাবুনগরীর গোপন তৎপরতা সরকারের কাছে নিশ্চয়ই অজানা নয়। কমিটি বিলোপ, রাজনীতি না করার কথা বলা হেফাজতের একটা চালাকির অংশ। এটা আত্মশুদ্ধির জন্য নাকি আত্মরক্ষার জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির দরকার আছে। সেই সঙ্গে সরকারকে অনুরোধ করবো, ঢালাওভাবে সবাইকে গ্রেফতার না করে প্রকৃত উসকানিদাতাদের বের করে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়ার জন্য। ফালতু মামলা দিয়ে সংখ্যা না বাড়িয়ে আসল মামলা দিতে হবে। যারা হেফাজতের বিরোধিতাকে ইসলামের বিরোধিতা বলে ওয়াজে, জুমার খুতবায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

আজকে ইসলামের বিপদ আসছে ভিন্ন ধর্মানুসারীদের কাছ থেকে নয়, বিপদ আসছে আলেম নামধারী ভণ্ড ধর্ম ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। আল্লামা ইকবাল এজন্যই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, যার বাংলা তরজমা করলে হয়- ‘আমার ঘরে আগুন লেগেছে আমার প্রদীপ থেকে’। হেফাজতিদের আত্মশুদ্ধির জন্য সকাল-বিকাল এই কবিতা পাঠ করা উচিত।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

Print Friendly, PDF & Email