আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অসাম্প্রদায়িকতা ও বাস্তবতা

প্রকাশিতঃ 10:57 am | January 25, 2024

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

২০০৮ সালে নির্বাচনে জিতে যখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলো তখন মানুষের প্রত্যাশা কী ছিল? সেইসব প্রত্যাশাকে সহজেই দুইভাগে ভাগ করা যায়—এক ভাগে থাকে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি সরকারের সময় যেসব সমস্যা মানুষ মোকাবিলা করেছে তা থেকে জাগ্রত প্রত্যাশা—যে আওয়ামী লীগ সরকারে এলে সেইসব সমস্যার সমাধান হবে।

আরেকটা ভাগ হচ্ছে আওয়ামী লীগের কাছে মানুষ স্বাধীনতার আগে থেকেই যেসব আদর্শগত পরিবর্তনের আশ্বাস পেয়েছে, সেইসব আশ্বাস পূরণের প্রত্যাশা। অন্যভাবে বললে, প্রত্যাশার একভাবে ছিল বৈষয়িক উন্নয়ন আরেকদিক ছিল আদর্শগত বা নীতিগত অগ্রসরতার প্রত্যাশা।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচন থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তিন মেয়াদ ক্ষমতা পূর্ণ করেছে আর এবারের নির্বাচনে জিতে আরেক মেয়াদের জন্য ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। বিগত তিন মেয়াদে বৈষয়িক উন্নয়ন বিবেচনা করলে আওয়ামী লীগকে কৃতিত্ব দিতেই হয়। ২০০৬ সালে বিএনপির বিদায়ের সময় যে সমস্যা আমাদের সবার জীবনের জন্য ভয়ংকর রূপ পরিগ্রহ করেছিল সেইটা ছিল বিদ্যুৎ সমস্যা।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বেশ দ্রুত সেই সমস্যার সমাধান করেছে। বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান ছাড়াও অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশ যে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছে সেই কথা বিস্তারিত বলার দরকার নেই। কিন্তু আদর্শগত বা নীতিগত পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা মানুষের ছিল সেই দিকে আমরা কতটুকু অগ্রসর হয়েছি? আদৌ কোনো অগ্রগতি কি আমাদের হয়েছে?

আদর্শগত কি পরিবর্তন আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম? প্রথম যে প্রত্যাশাটা ছিল তা ছিল যে আওয়ামী লীগের অধীনে বাংলাদেশ আবার একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে—দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর হবে। আওয়ামী লীগের কাছেই বিশেষ করে এই প্রত্যাশাটা ছিল দেশের সব মানুষের, তার ঐতিহাসিক কারণ আছে।

স্বাধীনতার জন্য যে সুদীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ সেই আন্দোলন এবং চূড়ান্ত পর্বে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি তার মৌলিক ভিত্তি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদ। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ উল্টো পথে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৯৬ পর্যন্ত এই সময়ে যারাই ক্ষমতায় ছিল সবাই নানাভাবে চেষ্টা করেছে ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরিয়ে দিতে। ওরা যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়নি তার প্রমাণ এখনো আমাদের সংবিধানে এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্র রয়ে গেছে। সংবিধানে এখনো রাষ্ট্রধর্মের বিধান রয়ে গেছে, অন্য ধর্মের নাগরিকদের প্রতি বৈরী আচরণ এখনো অব্যাহত।

এইসব সমর্থনের পেছনে কাজ করেছে মূলত একটা চিন্তা যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই কেবল একদিন আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় ফিরতে পারব তথা অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পথে যাত্রার সূচনা করতে পারবো।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগের অধীনে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সমাপ্ত হয়েছে বাকিটা এখনো অব্যাহত আছে। এইসব বিচার তো কেবল দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা—কিন্তু এসব লোক রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন করে বাংলাদেশকে যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে কার্যত একটি মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত করেছে সেই কলঙ্ক থেকে তো আমরা এখনো বেরিয়ে আসতে পারিনি। এর ফলে এক অর্থে এইসব বিচার আসলে এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।

এই আওয়ামী লীগ পরপর তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থেকে চতুর্থ মেয়াদেও নির্বাচিত হয়েছে এই পথটা মসৃণ ছিল না। এই বন্ধুর পথযাত্রায় বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সেক্যুলার লিবারেল অংশটি প্রায় পুরোটাই ক্রমাগত আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে গেছে। অস্বীকার করা যাবে না যে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করতে গিয়ে আমাদের এইসব বুদ্ধিজীবীরা অনেক সময় ওদের অন্যায্য অনেক কাজের পক্ষে সমর্থন দিয়ে গেছে; কখনো কখনো কোনো কোনো বুদ্ধিজীবীর এইরকম সমর্থনের মাত্রা অনেকটা দালালির পর্যায়েও নেমে গেছে। আওয়ামী লীগের সমর্থনে বুদ্ধিজীবীদের এইরকম সমর্থন সবসময় যে ব্যক্তিগত স্বার্থবুদ্ধি দিয়ে পরিচালিত হয়েছে সেই রকম ভাবার কোনো কারণ নেই।

এইসব সমর্থনের পেছনে কাজ করেছে মূলত একটা চিন্তা যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই কেবল একদিন আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় ফিরতে পারব তথা অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পথে যাত্রার সূচনা করতে পারবো। এখনো আমাদের এইসব বুদ্ধিজীবী এবং নাগরিক সমাজ আওয়ামী লীগের সমর্থনের পেছনে একটাই কারণ দেখায়—মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রশ্নে আওয়ামী লীগের বিকল্পও নেই।

পরপর চারবার নির্বাচনে জিতে এসেছে আওয়ামী লীগ। সবগুলো নির্বাচন সর্বাংশে গ্রহণযোগ্য ছিল সেই কথা হয়তো বলা যাবে না। তথাপি আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে যাচ্ছে। বিএনপিসহ বিভিন্ন দল যারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে ওদের সমর্থনে মানুষকে রাস্তায় নামতে দেখা যায়নি। এর পেছনে একটাই কারণ সম্ভবত আমরা অনুমান করতে পারি আর তা হচ্ছে মানুষের প্রত্যাশা যে বাংলাদেশ একদিন সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরবে আর তাতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কেউ নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ কি সেই পথে অগ্রসর হয়েছে? যদি আদৌ হয়েও থাকে কতটুকু অগ্রসর হয়েছে?

আওয়ামী লীগ সেই পথে মোটেই অগ্রসর হয়নি বা যদি কিঞ্চিৎ হয়েও থাকে সেইটা নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর। বরং উল্টো একটা পর্যায়ে এসে দেখা গেছে যে আমাদের সরকার যেন মৌলবাদীদের সাথে খানিকটা আপস করে ফেলেছে। আমাদের মনে আছে হেফাজতে ইসলাম ও ওদের তেরো দফা দাবির কথা। ৫ মে বাংলাদেশ সরকার তখন হেফাজতকে শক্ত হাতে দমন করলেও পরবর্তীতে ওদের সাথে আপস করেছে।

মানুষের প্রত্যাশা যে বাংলাদেশ একদিন সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরবে আর তাতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কেউ নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ কি সেই পথে অগ্রসর হয়েছে?

গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদে দেখা যায়, হেফাজতের আমির আর অন্য দুই একজন চেয়ারে আয়েশ করে বসে আছে আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে ওদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। মৌলবাদীদের হুমকির মুখে ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের প্রকল্প বন্ধ হয়ে আছে। পাঠ্যবই পরিবর্তন করা হয়েছে হেফাজতের দাবিতে। এখনো স্কুলের পাঠ্যবইয়ের ছবি ও অলংকরণে ইসলামিকরণের ছাপ রয়ে গেছে। সবচেয়ে ভয়ংকর যেটা, এখনো প্রতি বছর দুর্গাপূজায় দেশের সর্বত্র প্রতিমা ভাঙা হয় কিন্তু প্রতিমা ভাঙার জন্য কারও শাস্তি হয়েছে এই রকম কোনো খবর আমরা দেখিনি।

রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সব কর্মকাণ্ড এবং ধর্ম এই দুইটাকে বিচ্ছিন্ন করা এবং সমাজ জীবনের সব ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রভাব থেকে মানুষকে মুক্ত করে ইহজাগতিক চিন্তার প্রাধান্য স্থাপন করার আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়ন হয় না। মুসলমানদের দেশই যদি থাকবে তাহলে পাকিস্তান ভেঙে নতুন জাতি ও নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কোনো প্রয়োজনই আমাদের ছিল না। আওয়ামী লীগ এই কথা যে জানে সেই কথা আমরা বলতে পারি না।

ওরা বক্তৃতা বিবৃতিতে মাঝে মাঝেই অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেন বটে। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ যে সরকার নিয়েছে সেই কথা তো বলতে পারছি না। এমনকি নিজেদের দলের প্রতিটা পোস্টার লিফলেট বা প্রকাশনায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এখনো মুসলিম ধর্মীয় শ্লোগান ও বাণী সংযুক্ত করে দেয়—যেন সেইসব পোস্টার লিফলেট ইত্যাদি কেবল মুসলমানদের জন্যেই প্রকাশিত।

অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এই সরকার কি আদৌ কোনো পদক্ষেপ নেবে? দৃশ্যত সেই রকম কোনো লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছে না। এটা তো আর কেবল একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেই হয়ে যাবে না বা একটা আইন পাস করলেই হয়ে যাবে না। এই লক্ষ্যে গোটা জাতির মধ্যে নতুন করে একটা ঐক্য তৈরি করতে হবে—শিক্ষাঙ্গনসহ সর্বত্র ছোট ছোট অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যাতে করে আগামী প্রজন্ম চেতনাটা ওদের মধ্যে ধারণ করে।

সবার আগে সরকারই দলের নেতা নেত্রীদের মধ্যে চেতনাগতভাবে এবং ব্যক্তিগত আচরণে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ অনুসরণের চিহ্ন প্রতিফলিত হতে হবে। ওদের নিজেদের আচরণ থেকেই যেন আমরা বুঝতে পারি যে, না, ওরা আসলেই ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনতে চায়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সূচনাই হয় ধর্মনিরপেক্ষতা দিয়ে—অথচ এখন আমাদের প্রশ্ন করতে হচ্ছে দেশ কি তবে ধর্মনিরপেক্ষতার পথে আর ফিরবে না? ফিরলে কবে?

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।

Print Friendly, PDF & Email