‘জবাবদিহি শব্দটা আমরা গুম করে দিয়েছি’

প্রকাশিতঃ 10:35 am | August 20, 2022

আমীন আল রশীদ:

ঢাকা মেট্রো গ ২২-৬০০৮। হ্যাঁ, এটি আপনার গাড়ির নম্বর নয়। কিন্তু হতে পারতো আপনার নিজের কিংবা কোনও বন্ধু বা স্বজনের। রাজধানীর উত্তরায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের একটি গার্ডার এই প্রাইভেট কারটির ওপর পড়ে যায়। তারপর যা হবার তা-ই। প্রাইভেট কারের ভেতরে থাকা পাঁচ জন নিহত। তাদের মধ্যে একজন শিশু। তারা একটি বউভাতের অনুষ্ঠান থেকে ফিরছিলেন। জিহ্বায় তখনও নিশ্চয়ই খাবারের সুগন্ধ লেগেছিল। কেন এই মৃত্যু? দায় কার? নিছক অবহেলা নাকি খামখেয়ালি? এটি কি স্রেফ একটি দুর্ঘটনা কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি হত্যাকাণ্ড?

ঘটনাটি গত ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিকাল সোয়া ৪টার দিকে রাজধানীর উত্তরার জসীমউদ্‌দীন এলাকার প্যারাডাইস টাওয়ারের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল প্রাইভেটকারটি। এ সময় একটি ক্রেন দিয়ে বিআরটির একটি গার্ডার ওঠানোর সময় এটি উল্টে প্রাইভেট কারের ওপরে পড়ে। এতে প্রাইভেটকারটি দুমড়েমুচড়ে যায়। গার্ডারটি সরাতেও ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও সংশ্লিষ্টদের বেগ পেতে হয়। ঘটনার পরে বিআরটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুল ইসলাম এই ঘটনার জন্য যান্ত্রিক ত্রুটিকে দায়ী করেছেন। এরইমধ্যে গণমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে যাওয়া সিসি ক্যামেরার ধারণ করা ভিডিওটি নিশ্চয়ই আপনিও দেখেছেন।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসির সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু প্রতিদিন ঠিক এই পথে যাওয়া-আসা করেন। এই ঘটনার পরে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রতিবারই মনে আশঙ্কা জাগে যদি গার্ডার ভেঙে গাড়ির ওপর পড়ে। বাঁচার সুযোগ নেই। আবার ভাবি, ব্যাক ডালার ওপর পড়লে নিশ্চয়ই বেঁচে যাব। বাঁচার সে কী আকাঙ্ক্ষা! গাড়িতে কেউ থাকলে ভাবনাটা প্রকাশও করে ফেলি। শবনম থাকলে রেগে যায়। সাবধান করে দেয় আবোল-তাবোল না ভাবার জন্য। ভয়টা এমনভাবে ঢুকে গিয়েছিল যে, একবার এক টকশোতে এই প্রকল্পের পরিচালককে এই সড়কে চলাচলকারীদের নিরাপত্তার কথা বলেছিলাম। ভদ্রলোক যেভাবে জবাব দিচ্ছিলেন কথা বাড়াতে আর রুচি হলো না। আজ যে ভাবনটা সত্যি হয়ে গেলো। গাড়িটা শুধু অন্য কারও। ৫ জন মানুষ মারা গেল। জানি, তবু কারও বোধোদয় হবে না। জবাবদিহি শব্দটা যে আমরা রাষ্ট্র থেকে গুম করে দিয়েছি।’

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২২-এ বলা হয়েছে, ‘সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের আওতায় গাজীপুর হতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি লেন নির্মাণ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় দুই হাজার ৩৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৪.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড অংশ সেতু কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করবে। এরইমধ্যে এলিভেটেড অংশের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে এবং গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাজের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৬৩.৮৭ শতাংশ।’

এরইমধ্যে এই দুর্ঘটনা। এই ঘটনায় বিআরটি প্রকল্পের চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নিহত ফাহিমা আক্তার ও ঝর্না আক্তারের ভাই আফরান মণ্ডল বাবু উত্তরা পশ্চিম থানায় এই মামলা করেন। অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটায় ক্রেনের চালক, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।

এই ঘটনায় দোষীদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেইসঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানসহ কয়েকটি কোম্পানিকে শর্তসাপেক্ষে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাক লিস্ট) করারও নির্দেশ দিয়েছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিআরটি প্রকল্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি বৃহস্পতিবার নগরভবনে বৈঠক করবেন। সে পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মেয়র বলেন, ‘কমপ্লায়েন্স (সড়কে নিরাপত্তা দেওয়ার নিয়ম) নিশ্চিত করার পর সড়কে কাজ করা যাবে। কোথাও একটু সিমেন্ট পড়ে যাবে, কোথাও রড পড়ে যাবে, তখন আবার প্রাণহানি হবে, সেটা হতে পারে না।’ খামখেয়ালির কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আর খামখেয়ালিপনার দায় ঠিকাদারের ওপর চাপিয়ে বিআরটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘আসলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে আমরা এই খামখেয়ালিপনা পাচ্ছি। কোনোভাবেই আমরা তাদের কমপ্লায়েন্সে আনতে পারছি না। সড়ক নিরাপত্তা যে একেবারে নেই, তা নয়। তবে ঘাটতি রয়েছে। আমরা দুঃখিত।’

প্রশ্ন হলো, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যে কমপ্লায়েন্সে আনা যাচ্ছে না, এই কথাটি তিনি এতদিন কেন বলেননি? তাদের কমপ্লায়েন্সে বাধ্য করার এখতিয়ার তো তার। তিনি যদি তাদের কমপ্লায়েন্সে আনতে না পারেন, তাহলে তার উচিত ছিল বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো কিংবা ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করা। এই কথাটি বলার জন্য তাকে এত বড় একটি দুর্ঘটনার জন্য অপেক্ষা করতে হলো কেন? এত বড় ঘটনার পরেও কি তিনি পদত্যাগ করবেন? নিশ্চয়ই না। কারণ আমাদের সংস্কৃতিতে পদত্যাগ বলে কোনও শব্দ নেই। আমরা শুধু দায় চাপাতে জানি। আমাদের সংস্কৃতিতে যেহেতু জবাবদিহি বলে কোনও শব্দ নেই, ফলে ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগও নেই।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে ১৩ জন প্রাণ হারান। কিন্তু ১০ বছরেও ওই মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি। ২৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ৩ অক্টোবর। মামলায় আসামি করা হয়েছিল ২৫ জনকে। তবে চার্জশিট দেওয়া হয় ৮ জনের বিরুদ্ধে। এত বড় একটি ঘটনার বিচারকাজ চলছে ১০ বছর ধরে। সেই হিসেবে রাজধানীর উত্তরায় সবশেষ যে ঘটনা ঘটলো, তার বিচার কী হবে এবং বিচারে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধ কতটা প্রমাণ করা যাবে এবং বিচারে তাদের কী শাস্তি হবে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, যে পাঁচ জন মানুষ প্রাণ হারালেন; যে সংসারটা তছনছ হয়ে গেলো, কোনও কিছুর বিনিময়ে কি তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব? রাজধানীর উত্তরায় দুর্ঘটনার শিকার ওই গাড়িতে থাকলেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন নববধূ রিয়া আক্তার। তার ভাষায়: ‘দুইটা টাকা লাভের জন্য নিরাপত্তা ছাড়াই ব্যস্ত রাস্তায় গার্ডার ঝুলিয়ে রেখেছে তারা। আমার তো সব শেষ হয়ে গেলো। তারা আমার এমন সর্বনাশ করলো।’

রাষ্ট্রের চোখের সামনেই উন্নয়নের নামে এরকম আরও অজস্র সর্বনাশ হতে থাকে। যেমন উত্তরায় যেদিন এই ঘটনা ঘটলো, সেদিনই, অর্থাৎ জাতীয় শোক দিবসেই পুরানো ঢাকার চকবাজারে প্লাস্টিক কারখানায় আগুনে ছয় জন নিহত হয়েছেন। তাদের সবাই স্থানীয় বরিশাল হোটেলের কর্মচারী। এই ছয় জনের মধ্যে যদি কেউ পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যক্তি হয়ে থাকেন, তাহলে ওই পরিবারটি কী হবে? এই ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা রাষ্ট্র তাদের কী ক্ষতিপূরণ দেবে? কিছু নগদ সহায়তা যদি দেয়াও হয়, তাতেও কি ওই মানুষদের ফিরে পাওয়া যাবে? এই ঘটনার জন্য কাকে দায়ী করা হবে?

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, যে ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, সেটাসহ আশপাশের কোনও ভবন নির্মাণের নিয়মনীতি মানা হয়নি। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এত দেরি হয়েছে। আর লালবাগ পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি) জাফর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে এসব কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ, সবাই বলছে যে এখানে নিয়ম নীতি মানা হয়নি। প্রশ্ন হলো, নিয়ম নীতি মানানোর দায়িত্ব কার? পুরানো ঢাকায় নিয়ম নীতি মানাতে খোদ সিটি করপোরেশনও ব্যর্থ। অনেক সময় নীতিনির্ধারকরাও এই ব্যর্থতার দায় পরস্পরের ওপর চাপান।

এরকম আগুনের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। গত ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ আগুনে ৪৩ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়। তবে দেশের ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয় ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যালের গোডাউনে লাগা আগুনে। ওই ঘটনায় নিহত হন ১২৪ জন। এই ঘটনার ৯ বছরের মাথায় ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরানো ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে মারা যান প্রায় ৮০ জন। অথচ নিমতলীর ঘটনার পরেই আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরিয়ে ফেলার সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি; কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। যার খেসারত দিতে হয় চকবাজারে। এরপর গত বছরের জুন মাসেও রাজধানীর মগবাজারে একটি ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়, সে ভবনেও কেমিক্যাল ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ ছিল বলে ধারণা করা হয়। আবার এর এক মাস না যেতেই ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যান অর্ধশতাধিক শ্রমিক।

সীতাকুণ্ডের ঘটনাটি কেন ঘটল কিংবা এর আগে নিমতলী, চুড়িহাট্টা, মগবাজার, রূপগঞ্জে কেন একইভাবে সাধারণ মানুষ পুড়ে মারা গেলো? নিমতলীর ঘটনার পর যে কেমিক্যাল বা রাসায়নিক দ্রব্য মজুদের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল, সেই একই আলোচনা ২০ বছর পরও কেন করতে হচ্ছে? এই ২০ বছরে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কী করলো? রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আমদানির পর যেসব জায়গায় কেমিক্যাল মজুদ করে রাখা হয়, সেগুলো কতটা নিরাপদ? ব্যবসায়ীরা কতটা নিয়ম-কানুন মানেন। এর জন্য কি কোনও নীতিমালা বা গাইডলাইন আছে? কোথাও কি কোনও জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে?

জাতীয় শোক দিবসে রাজধানীর উত্তরায় গার্ডার ধসে ৫ জনের মৃত্যু নিয়ে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া যতটা সোচ্চার, একই দিনে পুরানো ঢাকায় ৬ জন শ্রমিকের দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর খবর নিয়ে মানুষ ততটা সোচ্চার নয়। সম্ভবত, মানুষ ধরেই নিয়েছে যে, পুরানো ঢাকায় নিয়মিত বিরতিতে এরকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে। রাষ্ট্র থেকে যখন ‘জবাবদিহি’ শব্দটা উধাও হয়ে যায়, তখন সব অন্যায় ও অপরাধের বিষয়ে মানুষ নির্লিপ্ত হয়ে যায়। তাদের গা সয়ে যায়।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

Print Friendly, PDF & Email