হলি আর্টিসানে হামলার ৬ বছর

প্রকাশিতঃ 9:41 am | July 01, 2022

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

১ জুলাই, ২০১৬। এক অবরুদ্ধ দিন। এ দিন সারা বিশ্ব তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশের দিকে। কারণ, এ দিনই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নারকীয় জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ। এ হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ নিহত হন মোট ২২ জন।

নিহতদের মধ্যে দুজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। জঙ্গিদের গুলি ও বোমায় আহত হন পুলিশের অনেকে। আজ সেই হামলার ছয় বছর পূর্ণ হলো।

ঘটনার দিন রাত ৮টা ৪৫-৫০ মিনিটের দিকে ওয়ারলেস সেটে পুলিশ জানতে পারে গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে গোলাগুলি হচ্ছে। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ সেখানে হাজির হয়। এভাবে কয়েক বার প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও স্পর্শকাতর বিবেচনায় রাতে হলি আর্টিসানে অভিযান চালানো থেকে বিরত থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো সদস্যদের পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টে’ অবসান হয় জিম্মিদশার, নিহত হয় হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি।

ভয়াবহ ওই জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে জঙ্গিদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নীল নকশা। বিভিন্ন সময় এ হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের যোগসাজসের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

তবে, তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ জানিয়েছে—হামলায় জড়িত জঙ্গিরা সবাই ‘হোম গ্রোন’, অর্থাৎ দেশীয়। জেএমবির কিছু সদস্য নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়, যারা ‘নব্য জেএমবি’ বলে আখ্যায়িত।

নব্য জেএমবির সদস্যদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকলেও হলি আর্টিসানের ঘটনার পর ধারাবাহিক অভিযানে জঙ্গিদের রুখে দিতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব অভিযানে অনেক নব্য জেএমবির সদস্য নিহত হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয় আরও অনেককে।

তবে, হলি আর্টিসানে নৃশংস জঙ্গি হামলার ছয় বছরেও শেষ হয়নি মামলার বিচার প্রক্রিয়া। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর এ মামলায় ৭ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে বেকসুর খালাসের রায় দেন আদালত। এরপর আসামিরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে, আর রায়ে খালাস পাওয়া একজনের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর প্রায় দীর্ঘ ২৯ মাস পেরিয়ে গেলেও উচ্চআদালতে বিচারিক কার্যক্রমের আর তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—হামলার মূল সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ।

আসামিদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করেন বিচারিক আদালত। আর, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলার অপর আসামি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, হলি আর্টিসানের হামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে র‍্যাবের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। হামলার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী জেএমবি আমির সারোয়ার জাহান র‍্যাবের অভিযানে পালাতে গিয়ে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা গেছেন। এ ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয় জেএমবির সূরা সদস্য মামুনুর রশীদ রিপন এবং অপর শীর্ষনেতা শরিফুল ইসলাম খালিদকে। তারা ঘটনার পরিকল্পনা, অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল।

র‍্যাব সূত্রে জানা যায়, এ ছাড়া র‍্যাবের অভিযানে বন্ধ হয় হলি আর্টিসানের বীভৎস ছবি তাৎক্ষণিক প্রচার করা আত্-তামকীন ওয়েবসাইট এবং গ্রেপ্তার হয়েছিল অ্যাডমিনসহ বেশ কয়েক জন সদস্য। হলি আর্টিসান ঘটনার পরে অভিযানে র‍্যাব জঙ্গি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, অর্থদাতা ও বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের গ্রেফতার করে জঙ্গি সংগঠনগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে। এখন সে অর্থে জঙ্গিদের কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায় না।

সেদিন যা ঘটেছিল

১ জুলাই, শুক্রবার। সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে খবর আসে গুলশানে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে’ পুলিশের গোলাগুলি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা গেল—একটি রেস্তোরাঁয় সশস্ত্র হামলাকারী ঢুকে বেশ কয়েক জনকে জিম্মিও করেছে।

কিন্তু, ঘটনাটি আসলে কী? গুজব, নাকি সত্য—সেটি নিশ্চিত হতেও ঘণ্টাখানেক সময় চলে গেল। পরে জানা গেল হামলাকারীরা ওই রেস্তোরাঁয় থাকা বিদেশি নাগরিকসহ বেশ কয়েক জনকে জিম্মি করেছে। একপর্যায়ে জানা যায় গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছে।

জিম্মি সংকটের ঘটনায় ১ জুলাই সন্ধ্যা থেকে দিবাগত সারা রাত অর্থাৎ ২ জুলাই সারা বিশ্বের গণমাধ্যমের নজর ছিল ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিসান বেকারির দিকে।

সে সময় গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ছিলেন বর্তমানে মতিঝিল বিভাগের উপকিমশনার (ডিসি) আবদুল আহাদ। তিনি বলেন, ‘অফিস থেকে ঘটনাস্থলে যেতে সময় লেগেছিল পাঁচ-ছয় মিনিট। যাত্রাপথে আমি ঘটনাস্থলের আশপাশের মোবাইল টহল টিমগুলোকে হলি আর্টিসান বেকারিতে যাওয়ার নির্দেশ দিই। তাদের বলি, তারা যেন হলি আর্টিসানের গেটগুলোতে এমনভাবে অবস্থান নেয় যাতে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যেতে না পারে। আমি যখন গাড়িতে বসে এসব নির্দেশ দিচ্ছিলাম, সে মুহূর্তে পাশের সিটে বসা ডিসি স্যার হামলার বিষয়টি ফোনে তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ও ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া স্যারকে জানান।

ডিসি আহাদ বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগে ইউনাইটেড হাসপাতালের পাশে থাকা গুলশান থানার একটি মোবাইল টিম সেখানে পৌঁছায়। একজন উপপরিদর্শকের (এসআই) নেতৃত্বে মোবাইল টিমটি হলি আর্টিজানের সামনে যাওয়া মাত্রই তাদের লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়তে থাকে। সন্ত্রাসীদের গুলির জবাবে মোবাইল টিমের সদস্যরাও গুলি ছোড়ে। এরই মধ্যে ওই মোবাইল টিমের দলনেতা হলি আর্টিসানের প্রধান ফটকটি বাইরে থেকে বন্ধ করে দেন, যাতে সন্ত্রাসীরা বের হয়ে যেতে না পারে। গুলি বিনিময়ের একপর্যায়ে ওই এসআই গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

আবদুল আহাদ বলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমরা এবং আশপাশ থেকে আসা মোবাইল টিমগুলো হলি আর্টিসানের দুটি গেটে অবস্থান নিই। এর মধ্যে ডিসি স্যার একটি গেটে, আরেকটিতে আমি। এ সময় প্রচুর গোলাগুলির আওয়াজ আসছিল হলি আর্টিসানের ভেতর থেকে। গোলাগুলির শব্দ শুনে আমাদের মনে নানা ধরনের সন্দেহ জাগছিল। তখনও আমরা নিশ্চিত ছিলাম না—এটি জঙ্গি হামলা কি না। আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আমাদের একাধিকবার গুলি বিনিময় হয়। তারা বাইরে বের হতে চেয়েছিল, কিন্তু, আমাদের প্রতিরোধের কারণে তারা বের হতে পারেনি।

আবদুল আহাদ আরও বলেন, যখন ডিএমপি কমিশনার স্যারকে হামলার বিষয়ে ব্রিফ করছিলাম তখন এক গাড়িচালক দৌড়ে এসে আমাদের বলে, “স্যার ভেতরে অনেক মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে।’ জানতে চাইলাম, সে কীভাবে জানল? তখন সে আমাদের বলে, ভেতরে তার এক পরিচিত গাড়িচালক আছে। সে বিদেশি এক নাগরিকের গাড়ি চালায়। ওই গাড়িচালক হলি আর্টিসানের খাবারের টেবিলের নিচে লুকিয়ে থেকে মোবাইল ফোনে বাইরে থাকা চালককে বলে, সন্ত্রাসীরা গুলি করে অনেক মানুষকে মেরে ফেলছে। তখন আমরা মোটামুটি নিশ্চিত হতে পারি যে, এটি জঙ্গি হামলা হতে পারে।”

এভাবে রাত ১০টার দিকে পুলিশ, র‍্যাব এবং আধা সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের কয়েকশো সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেয়। গণমাধ্যমকর্মীরাও ৭৯ নম্বর রোডের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন। রাত সোয়া ১১টার দিকে হাসপাতালে মারা যান বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) মো. রবিউল করিম নিহত হন।

এর মধ্যে পুলিশের আইজিপি ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে তৎকালীন র‍্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, হলি আর্টিসানের ভেতরে অন্তত ২০ জন বিদেশিসহ কয়েকজন বাংলাদেশিও আটকা পড়েছেন। ভেতরে যাঁরা আছেন, তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য তাঁরা বিপথগামীদের সঙ্গে কথা বলতে চান।

রাত ৪টা পর্যন্ত অস্ত্রধারীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যেরা।

আইএসের দায় স্বীকার

রাতেই ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের বার্তা সংস্থা বলে পরিচিত ‘আমাক’ এ গুলশান হামলার দায় স্বীকার করে ২০ জন নিহত হওয়ার কথা জানায়। আইএস-এর পক্ষ থেকে হামলাকারীদের মধ্যে পাঁচজনকে তাদের ‘সৈনিক’ বলে দাবি করে, হামলার দায় নেয় তারা।

২ জুলাই অভিযানের ঘটনাক্রম

সকাল ৭টা ৩০ মিনিট : রাতভর গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্ট সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখার পর যৌথ সেনা, নৌ, পুলিশ, র‍্যাব এবং বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ কমান্ডো দল গুলশানে অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়।

৭টা ৪৫ মিনিট : কমান্ডো বাহিনী অভিযান শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যেরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।

সকাল সোয়া ৮টায় রেস্টুরেন্ট থেকে প্রথম দফায় নারী, শিশুসহ ছয় জনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পাশের একটি ভবন থেকে একজন বিদেশি নাগরিক তাঁর মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন।

সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা।

৯টা ১৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয়।

‘থান্ডারবোল্ট’ নামের সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা যে অভিযান চালায়, সেখানে জঙ্গি হামলায় সরাসরি অংশ নেয়া পাঁচ তরুণের সবাই মারা পড়েন। তাঁরা হলেন—মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাজ ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।

সকাল ১০টায় চার জন বিদেশিসহ ১৩ জন জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অজ্ঞাত পাঁচজনের মরদেহ পাওয়ার কথা পুলিশ জানায়।

বেলা ১১টা ৫০ মিনিট : অভিযানে জঙ্গিদের ছয় জন নিহত এবং এক জন ধরা পড়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়।

কালের আলো/বিএস/এমএম

Print Friendly, PDF & Email