একবছর পর সংসদে ফিরেই প্রাণবন্ত-উদ্দীপ্ত রওশন এরশাদ!

প্রকাশিতঃ 9:21 pm | June 29, 2022

কালের আলো রিপোর্ট:

মৃত্যুর দুয়ার থেকে জীবনে ফিরেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ এমপি। ফিরেছেন নিজের চেনা সংসদে। কথা বলেছেন আগের মতোই অমিত দৃঢ়তায়। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়েছেন।

নিজের নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহ-৪ সদর আসনের বাসিন্দাদের জন্য বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করেছেন। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রায় একবছর পর বুধবার (২৯ জুন) সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় প্রাণবন্ত একজন রওশন এরশাদকেই দেখেছেন সবাই। সংসদে তার বক্তব্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তার নিজ নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহেও। সংসদে নিজেদের প্রিয় রওশন এরশাদকে দেখে আবেগ-আপ্লুত হয়েছেন অনেকেই। শুকরিয়া আদায় করেছেন মহান আল্লাহর কাছে।

চিকিৎসা শেষে সাত মাস পর সোমবার থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফেরেন রওশন। জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশনকে গত বছরের ৫ নভেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড নেওয়া হয়। ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলে। এর আগে ফুসফুসের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) টানা ৮৪ দিন ছিলেন তিনি। আগামী ৪ জুলাই স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তার আবার ব্যাংকক যাওয়ার কথা রয়েছে।

সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, ‘গত বছরের আগস্ট থেকে আমি অসুস্থ। সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছি। আপনারা সবাই দোয়া করেছেন। মাননীয় স্পিকার আপনি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক আমার খোঁজ নিয়েছেন। সংসদে কথা হয়েছে।’

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের জন্য সরকার প্রধানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশর মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে শত বাধা অতিক্রম করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। পদ্মাসেতু শুধু একটি স্থাপনা নয় এটা আমাদের সক্ষমতার, আত্মমর্যাদার প্রতীক। পদ্মা সেতু নিয়ে অনেকে অনেক ধরণের বিরোধীতা, কুকথা বলেছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে সেই পদ্মা সেতু নির্মাণ হওয়ায় তাদের মুখে চুনকালি পড়েছে।’

বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান রওশন। তিনি বলেন, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের কারণে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। সিলেট, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এর ফলে এসব অঞ্চলে বাড়ি, ঘর, রাস্তাঘাট, স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে।’

‘মানুষ অত্যন্ত কষ্টে আছে। আমি জানি সরকার এদের অনেক ধরনের সহায়তা করছে। তার পরও আমি বলবো এদেরকে আরও বেশী সহায্য করা যায়, সেজন্য পদক্ষে নিতে। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলবো ত্রাণ সামগ্রী সেখানে পৌঁছানো ছাড়াও এই বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নেওয়ার’- যোগ করেন রওশন এরশাদ।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদের বেশির ভাগ সময় আমরা পূর্ণ করেছি। দেশের সবকটি রাজনৈতিক দলই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি মনে করি, সকল দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, অবাধ প্রতিযোগিতা মূলক একটি নির্বাচন, যা গণতন্ত্রের মূলনীতি। দেশের উন্নয়নের জন্য টেকসই গণতন্ত্রের প্রয়োজন। আর সেজন্যেই আমাদের সকলকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।

২০২২-২৩ অর্থ বছরের বাজেট সম্পর্কে বেগম রওশন এরশাদ বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটের প্রাক্কলিত ব্যয় ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে জিডিপির ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল। যদিও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ব্যয়ের প্রাক্কলন চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকা বেশি হলেও অর্থনীতির আকার বিবেচনায় একে সম্প্রসারণমূলক বা উচ্চাভিলাষী না বলে কিছুটা রক্ষণশীল বলা যেতে পারে।

তিনি বলেন, আমি মনে করি প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জগুলো হলো- হচ্ছে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তেল, গ্যাস ও সারের মূল্যবৃদ্ধিজনিত বর্ধিত ভূর্তুকির জন্য অর্থের সংস্থান। বেসরকারি বিনিয়োগ অব্যাহত রেখে কর্মসৃজন। আমদানি সহনীয় পর্যায়ে রেখে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ স্থিতিশীল রাখা। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বর্তমান পর্যায়ে ধরে রাখা। করের আওতা বৃদ্ধিকরে রাজস্বের পরিমাণ বাড়ানো ও বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনা।কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বাড়ানো। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি কমানোর কৌশল নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যের শিরোনাম ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’ এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘শেখ হাসিনা এক ফিনিক্স পাখির গল্পগাথা’ শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের বিভিন্ন অর্জনের তথ্য দিয়েছেন। করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলায় গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়ন করা দেশের ৫১ তম বাজেট প্রস্তাব করেছেন তিনি। তবে করোনা মহামারির সংকট কাটার আগেই শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব যা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের বাজারে বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা। করোনা মহামারি-পরবর্তী নতুন বিশ্বের সামনে কঠিন এক চ্যালেঞ্জ এনে দিয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যার প্রভাবে সারা বিশ্বেই জ্বালানিসহ সব ধরনের পণ্যমূল্য বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। বাংলাদেশে বেড়েছে অসহনীয়ভাবে। ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থা। ডলারের বাজার অস্থির হয়ে ওঠায় আমদানি-রফতানি খাতেও পড়ছে এর বিরূপ প্রভাব। এমন এক বৈরী সময়ের মধ্যে সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ।

ময়মনসিংহবাসীর জন্য বিভিন্ন দাবি
বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আপনার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আবারও ধন্যবাদ জানাই ময়মনসিংহ বিভাগ বাস্তাবায়ন করায়। বিভাগ বাস্তবায়িত হলেও বিভিন্ন কারনে আজও ময়মনসিংহ বিভাগটি পূর্ণতা পাচ্ছে না। ময়মনসিংহে একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা জরুরী। ছেলে এবং মেয়েদের জন্য বিভাগীয় শহরে পৃথক দুটি কলেজকে সরকারিকরণ এখন সময়ের দাবী। আপনার প্রতিশ্রুত নতুন উপ-শহর এর কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে সম্পন্ন হওয়ার কারণে উন্নয়ন কর্মকান্ড জনগণের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে না। এ ব্যাপারে আপনার সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

তিনি বলেন, ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ময়মনসিংহ জেলা স্কুল ও বিদ্যাময়ী সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের কোন ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে না। এতে করে ময়মনসিংহের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার উন্নত পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অতি পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী এ শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে রেলক্রসিং এর কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। তাই আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে সড়কে রেলক্রসিং এর দুর্ভোগ থেকে শহরবাসীকে মুক্ত করে পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা খুব দরকার। এ বিষয়ে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email