পশু সঙ্কট নেই কোরবানিতে

প্রকাশিতঃ 10:09 am | June 15, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

দেশে পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির পশু নিয়ে কোনো সঙ্কট নেই। দেশীয় পশু দিয়েই মেটানো যাবে কোরবানির চাহিদা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, দেশে কোরবানিযোগ্য মোট পশু রয়েছে ১ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৯টি। এক বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ৬২৪ টি। ফলে আমদানির কোন প্রয়োজনও নেই।

বাজারের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবারও প্রতিবেশি দেশ থেকে পশু আনা নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে গরু-মহিষ আসা ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এতে করে আশার আলো দেখছেন খামারিরা।

মাসখানেক আগে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের সংগঠন ফিশারিজ অ্যান্ড লাইভস্টক জার্নালিস্টস ফোরামের (এফএলজেএফ) সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এমপি এই বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। পাশাপাশি আশাবাদী উচ্চারণে বলেছিলেন, ‘আমাদের যে পরিমাণ পশু উৎপাদন হচ্ছে, তা চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকে। গত বছর কোরবানিতে উৎপাদিত গরুর ১০ ভাগের এক ভাগও বিক্রি হয়নি। এর সঙ্গে এই বছরের জন্য উপযুক্ত মিলিয়ে অনেক পশু খামারিদের হাতে রয়েছে। সাড়ে সাতশ খামারি এবং গৃহস্থের কাছে থাকা গবাদিপশু দিয়ে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ঘনিয়ে আসা ঈদুল আজহায় প্রশিক্ষিত খামারিদের কাছ থেকেই আসবে ৭৫ লাখ ৯০ হাজার ৪৪২টি পশু। বাকি ৪৫ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৭টি কোরবানিযোগ্য উৎপাদিত পশু গৃহপালিত।

সূত্র জানায়, বছরজুড়ে দেশে যে পরিমাণ গবাদিপশু জবাই হয়, তার ৬০ শতাংশ হয়ে থাকে কোরবানিতে। কোরবানির পশুর যেন কোন সঙ্কট না থাকে সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সফল হয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। অভিজ্ঞ এই মন্ত্রীর নেতৃত্বে সম্পূর্ণ দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গবাদিপশু সরবরাহের মাধ্যমে কোরবানির চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে দেশ।

বাংলাদেশ পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ মনে করেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ধান ও মাছের পরেই গবাদিপশু লালনপালন সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। খামারিরা যাতে ভালো দাম পান, সে জন্য গবাদিপশু পরিবহন এবং বিক্রিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।

জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মনজুর মোহাম্মদ শাহাজাদা বলেন, ‘স্বাস্থ্যসম্মত পশু উৎপাদনের জন্য বছরব্যাপী খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশেই চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে। গত বছর থেকে যাওয়া পশু এবারও যুক্ত হবে। ফলে এই বছরে পশু সংকটের কোনো কারণ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘রপ্তানিযোগ্য চামড়া পেতে সঠিকভাবে আলাদা করার জন্য এবং হালাল উপায়ে জবাইয়ের জন্য কসাইদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আগের বছরের ঈদুল আজহা থেকে পরবর্তী বছরের ঈদুল আজহার সময়কে বছর হিসাব করে থাকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা বেড়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ৬২৪।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চলতি বছর ৬ লাখ ৮১ হাজার ৫৩২টি খামারের তথ্য অনুযায়ী এক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে, দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে গরু-মহিষের সংখ্যা ৪৬ লাখ ১১ হাজার ৩৮৩। আর ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৭৫ লাখ ১১ হাজার ৫৯৭। এছাড়া দেশে উট, দুম্বা ও গাড়লের সংখ্যা ১ হাজার ৪০৯।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পশু জবাইয়ের জন্য গতবারের চেয়ে এবার আরও বেশি কসাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গত বছর সংখ্যাটি ছিল ২২ হাজার ৪৭০ জন। আর এই বছর ২৫ হাজার।

একই সূত্র বলছে, চলতি বছর সবচেয়ে ভালো পশু উৎপাদন হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। এই বিভাগের ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬১৯ খামারির কাছ থেকে আসবে ২৭ লাখ ২৮ হাজার ৪৬০টি পশু। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের অবস্থান। এই বিভাগের ৮৬ হাজার ৩৬ জন খামারির কাছ থেকে আসবে ১৫ লাখ ৯২ হাজার ১১৪টি পশু। এছাড়া রংপুর বিভাগের ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৪০ খামারির কাছ থেকে মিলবে ১০ লাখ ৩ হাজার ২৮১টি পশু।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত মৌসুমে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে মানুষের আয়ে ভাটা পড়ায় কমে যায় কোরবানি দেওয়ার হার ও হাটে পশু সরবরাহ। ফলে গত বছর কোরবানিযোগ্য ২৮ লাখ ২৩ হাজার ৫২৩টি পশু অবিক্রীত থেকে গেছে। এতে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন খামারি ও ব্যাপারীরা। গত বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৫। তার মধ্যে কোরবানি হয়েছিল মোট ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২টি পশু।

অধিদপ্তরের তথ্য আরও বলছে, এর আগের ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পশু কোরবানি হয়েছে গত ঈদুল আজহায়। করোনা সংক্রমণের আগে প্রতিবছর পশু কোরবানির পরিমাণ বাড়ছিল। সংক্রমণের পর থেকে সেটি ক্রমশ কমছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৬ সালে ৯৮ লাখ ১৩ হাজার পশু কোরবানি হয়। এরপর থেকে ক্রমশ বেড়ে ২০১৭ সালে ১ কোটি ৪ লাখ, ২০১৮ সালে ১ কোটি ৬ লাখ, ২০১৯ সালে ১ কোটি ৬ লাখ ১৪ হাজার পশু কোরবানি হয়। ২০২০ সালের মার্চ থেকে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে ওই বছর কোরবানি কমে হয় ৯৪ লাখ ৫০ হাজার ২৬৩। গত বছর আরও কমে ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২টি পশু কোরবানি হলো।

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email