চাঁদপুরে তারেকের বক্তব্য প্রচার, আ.লীগ ও প্রশাসনের ‘প্রশ্নবোধক’ নীরবতা কেন?

প্রকাশিতঃ 1:28 pm | May 08, 2022

রাজনৈতিক ভাষ্যকার, কালের আলো:

চাঁদপুরে বিএনপির ইফতার মাহফিলে দলটির দন্ডিত ও পলাতক ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার বক্তব্য প্রচারকে ঘিরে ক্ষোভ-অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত তারেকের বক্তব্য বিবৃতি প্রচার বা প্রকাশ হাইকোর্ট নিষিদ্ধ করলেও প্রকাশ্যে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে স্থানীয় বিএনপি সেটি প্রচার করেছে। স্থানীয় জেলা আওয়ামী লীগ বা প্রশাসন কেউই এই ঘটনায় অ্যাকশনে না গিয়ে উল্টো নীরব থেকেছে।

ওই দিনের ইফতার কর্মসূচি বিরাট এলাকাজুড়েই মাইকে প্রচারের পাশাপাশি ১ ঘন্টা ১০ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের ভিডিও ব্যাপকভাবে ইউটিউব ও ফেসবুকেও ছড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় বিএনপি। অথচ অনলাইন-অফলাইন কোথাও কোন প্রতিবাদ হয়নি।

দ্বাদশ ভোটের আগে চাঁদপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এমন নীরবতা আদতে কী স্থানীয় জেলা নেতৃত্বের অযোগ্যতা, ব্যর্থতা না সমঝোতা এমন প্রশ্নও উঠে এসেছে বড় পরিসরেই। অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রশাসনের ‘অতি কঠোরতা’ যেখানে মূল ফোকাস সেখানে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে কেন তাদের নূন্যতম তৎপরতা চোখে পড়েনি এ নিয়েও জনে জনে চলছে নানান কানাঘুষা, গুঞ্জন-গুঞ্জরণ।

কেউ কেউ মনে করছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্যের এ সময়টিতে শিক্ষামন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা.দীপু মনি ওমরাহ পালনে সৌদি আরব অবস্থান করছিলেন। তিনি দেশে থাকলে স্থানীয় বিএনপি এই শোডাউনের সাহস করতো কীনা এই নিয়েও চলছে বিভিন্নমুখী বিশ্লেষণ। দীপু মনিকে ছাড়া চাঁদপুরে আওয়ামী লীগ কী তবে ‘দন্তহীন’ এমন আলোচনাও ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনীতির অন্দরে-বাইরে।

কারও কারও ভাষ্য হচ্ছে- স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির নেতারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত হয়ে মন্ত্রীর ইমেজ ক্ষুন্নের অপচেষ্টা চালানোর কসরতের মাধ্যমে বিএনপিকে ‘ওপেন স্পেস’ দিয়েছে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা না নিলে সামনের ভোটে চরম মাশুল গুণতে হতে পারে দলকে। স্থানীয় প্রশাসনেরও অতি উৎসাহী ভূমিকার পরিবর্তে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা প্রতিপালনে মনোযোগী হলে জনমনে চলা এখনকার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার অবতারণারই কোন সুযোগ ছিল না।

গত ৩০ এপ্রিল চাঁদপুর জেলা বিএনপি আয়োজিত এই ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হলেও হাইকোর্টের আদেশ লঙ্ঘিত হওয়ার এই অভিযোগটি এখনও মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। দন্ডিত তারেকের বক্তব্য প্রচারে বাংলাদেশে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইনের ক্ষেত্রেও হাইকোর্টের একই রকম নির্দেশনা প্রযোজ্য। কিন্তু কোন কোন গণমাধ্যমের অনলাইন ভার্সনে তারেকের বক্তব্য রাখার প্রসঙ্গটি ঠাঁই করে নিয়েছে। চলতি বছরের সোমবার (৩১ জানুয়ারি) আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটির করোনা প্রতিরোধ সামগ্রী ও শীতবস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছিলেন, ‘আমি গণমাধ্যমকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, হাইকোর্টের নির্দেশ আছে তারেক রহমানের কোনও সংবাদ গণমাধ্যম প্রচার করতে পারবে না। এটা করা (সংবাদ প্রচার) হাইকোর্টের নির্দেশের বরখেলাপ।’

সোশ্যাল হ্যান্ডেলে চাঁদপুর আওয়ামী লীগের এক কর্মী লিখেছেন, ‘আমাদের জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার থাকলেও তারা কেন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি? রাজনৈতিকভাবেই এটি মোকাবেলা না করে তারা চুপ রইলেন কি করে? এমন নীরবতায় তারা কী বুঝাইতে চাইলেন?’

একটি বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম পাটোয়ারী দুলাল নিজেদের ‘দায়’ না দেখে কেবলমাত্র প্রশাসনের দূয়ারেই বল ঠেলে দিয়েছেন। মূল দলের জেলার দায়িত্বশীল নেতা হয়েও তারা কোন পদক্ষেপ কেন গ্রহণ করেননি সেই উত্তর তার বক্তব্যে না থাকলেও অনেকটা ব্যাকফুটে গিয়েই তিনি বলেছেন, ‘বিএনপি আইন মানে না। তারা আইনকে শ্রদ্ধা করে না।

হাইকোর্টের আদেশ আমান্য করে তারা তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার করে আইনত অপরাধ করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, যারা তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া।’

একই রকম কথা বলেন চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ। এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার কোন প্রয়োজন নেই। এটি দেখার দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। এখানে আমাদের সরব না নীরবতার প্রশ্ন আসবে কেন?’

চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের এমন স্ট্যান্ডের বিপরীতে স্বাধীনতার স্বপক্ষের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অনেকেই ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন।

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আয়োজকদের বিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এবং জেলা আওয়ামী লীগের রহস্যময় নীরবতায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে চাঁদপুরের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এডভোকেট রণজিৎ রায় চৌধুরী বলেছেন, সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার ও প্রকাশ বেআইনী। যারা এটা করেছে তারাও অপরাধ করেছে।

চাঁদপুর জেলা আইনজীবি সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট রুহুল আমীন বলেছেন, ওইদিনের সভায় তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার করায় হাইকোর্টের আদেশ অবমাননা হয়েছে। বিষয়টি আদলতের দৃষ্টিগোচর হলে অবশ্যই শাস্তি হবে বলে মনে করেন তিনি।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জেলা প্রশাসক (ডিসি) অঞ্জনা খান মজলিশ বা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমতিয়াজ হোসেন- কেউই ফোন রিসিভ করেননি।

কালের আলো/এমকে/জিকে

Print Friendly, PDF & Email