কে হচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক?

প্রকাশিতঃ 11:06 am | April 03, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

কোন বিলম্ব নয়, আগামী ডিসেম্বরেই আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শনিবার (০২ এপ্রিল) এই ঘোষণা দিয়েছেন। সম্মেলন আয়োজনে সব প্রস্তুতিও শুরু করেছে ক্ষমতাসীনরা। তবে সব ছাপিয়ে আলোচনায় এসেছে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ সম্পাদক পদটি। এই পদে ওবায়দুল কাদের কী হ্যাটট্রিক করবেন না কী নতুন মুখ আসছে এ নিয়েও শুরু হয়েছে চূলচেরা বিশ্লেষণ।

অনেকেই আগ বাড়িয়ে বলেই দিচ্ছেন, অসুস্থতা এবং দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাওয়ার কারণে না কী ওবায়দুল কাদের তৃতীয় মেয়াদে এই পদে দায়িত্ব পাচ্ছেন না। কিন্তু এই তত্ত্বের বিপরীত ভাষ্য হচ্ছে- ওবায়দুল কাদের এখনও দলীয় সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুডবুকে রয়েছেন।

অসুস্থ হলেও দলের তৃণমূলের এখনো প্রাণভোমরা ওবায়দুল কাদের। এখনো নিয়ম করেই তৃণমূলের সেতুবন্ধ রচনায় কাজ করেন কঠোর পরিশ্রমী এই রাজনীতিক। পাশাপাশি টানা দু’মেয়াদে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পরেও তার কোন দুর্নাম নেই। কাজেই সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে তার বাদ পড়া না পড়ার ক্ষেত্রে অসুস্থতার বিষয়টি একেবারেই গৌণ হিসেবেই বিবেচিত হবে, এমন অভিমত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

জানা যায়, সমসাময়িক রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের শক্তি ও সম্পদ দু’টোই হিসেবে বিবেচিত। আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে ৪০ বছরের বর্ণাঢ্য পথচলায় বুকের উত্তাপে আগলে রেখেছেন উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত এই রাজনৈতিক দলটিকে। দলের ভেতরে-বাইরে তিনি বিকল্পহীন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলটির সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক নেতা। আসন্ন জাতীয় সম্মেলনেও কাউন্সিলরদের রায়ে শেখ হাসিনাই দলীয় সভানেত্রী হবেন এটিই নিশ্চিত। কারণ, শেখ হাসিনার বিকল্প কেবলই শেখ হাসিনা।

ওবায়দুল কাদের ছাড়াও আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাধারণ সম্পাদক পদে গুরুত্বপূর্ণ আরও ৫ নেতার নাম উচ্চারিত হচ্ছে দলীয় পরিমন্ডলে। এর মধ্যে দু’জন দলীয় সভাপতিমন্ডলীর সদস্য। তারা হলেন- কৃষিমন্ত্রী ড.আব্দুর রাজ্জাক ও জাহাঙ্গীর কবির নানক।

তিন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, ডা.দীপু মনি এবং ড.হাছান মাহমুদও রয়েছেন সাধারণ সম্পাদক হওয়ার দৌড়ে। হানিফ মন্ত্রীত্বে না থাকলেও আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদের মধ্যে দু’ মেয়াদে মন্ত্রীসভায় ঠাঁই করে নিয়েছেন দীপু মনি ও ড.হাছান। দলে ও সরকারেও তারা সমানতালেই সক্রিয় রয়েছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নতুন সাধারণ সম্পাদক কে হবেন সেটি চূড়ান্ত করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সাধারণ সম্পাদক পদের আলোচনায় সবাই সমানে সমান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শারীরিকভাবে ‘অসুস্থ’ হলেও দলে কখনও নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। সব সময়ই কাজকে ভালোবাসেন। কঠোর পরিশ্রম তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বলা হয়, এই পরিশ্রমের দৌলতেই শেকড় থেকে শিখরে উঠে এসেছেন ওবায়দুল কাদের। রাজনীতিতে শব্দ বা ভাষা প্রয়োগেও তিনি অনন্য। বিএনপির ‘গুজব’ নামক ‘আবর্জনা’র বিরুদ্ধে টু দ্য পয়েন্টে কথা বলে চলেছেন প্রতিনিয়ত। দলীয় নেতা-কর্মীদের সব ষড়যন্ত্র প্রতিহতে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিচ্ছেন। এখনও দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণ আস্থা রয়েছে ওবায়দুল কাদেরের ওপর। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তৃতীয়বারের মতো তাকে বেছে নেওয়া হলে সেটি হবে একটি ইতিহাস।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড.আব্দুর রাজ্জাক নিজের মেধা মননকে কাজে লাগিয়ে আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছেন দলের নেতা-কর্মীদের। দেশীয় পরিমন্ডল ছাপিয়ে বিদেশেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানও বিভিন্ন সময়ে তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক টিমের ঢাকা বিভাগের সমন্বয়নে রয়েছেন তিনি। কম কথার মানুষ ড.রাজ্জাক মাঠ রাজনীতিতেও সক্রিয়। তাকে ঘিরে ইতিবাচক ভাবনা রয়েছে তৃণমূলের। আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়াদে খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর দ্বিতীয় মেয়াদে মন্ত্রীত্ব বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু ওই সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য করা হয় তাকে। দলীয় সভাপতি তাকে ভালো জানেন বলেই অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তাকে রেখেছেন। ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্যই তাকে গড়া হয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকেই।

সরকারে কোন পদে না থাকলেও আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়েছে বেশি। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্টে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। দলের ত্যাগী-পরীক্ষিত এই রাজনীতিক অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এখন চালকের আসনে রয়েছেন। এই ইতিবাচক ম্যাসেজটিই নানক অনুসারীদের আশাবাদী করে তুলেছে।

আওয়ামী লীগের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। একেবারেই তৃণমূল থেকে উঠে এসেছেন। এমপি বা মন্ত্রী না হলেও দলীয় রাজনীতিতে একটি আলাদা ইমেজ রয়েছে তার। রাজনীতিতে তার জ্ঞানের গভীরতা আলোচিত। দলীয় কর্মীদের সঙ্গেও রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। পরপর দু’টার্মে সাধারণ সম্পাদক হওয়ার দৌড়ে আলোচনায় ছিলেন। এবারও উচ্চারিত হচ্ছে তার নাম।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিশুদ্ধ রক্তধারার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয় ডা.দীপু মনিকে। মহান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, ভাষাবীর এম এ ওয়াদুদের এই কন্যা ওয়ান ইলেভেনে শেখ হাসিনা মুক্তি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। টানা চার মেয়াদে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও নিষ্ঠার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করছেন। দলে ও সরকারে কীভাবে দিন-রাত একাকার করে কাজ করতে হয় সেই সফলতার অনন্য এক উদাহরণও তৈরি করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি। মন্ত্রণালয়, নিজের নির্বাচনী এলাকা সামাল দিয়ে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে টিম সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ করতে ছুটছেন এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আপত্য স্নেহের জন্যই অনেকেই ঈর্ষার চোখে দেখেন তাকে। ‘অলরাউন্ডার’ এই রাজনীতিক বরাবরই সততার মহিমায় উদ্ভাসিত করেছেন নিজেকে। তার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্রই হালে পানি পায়নি। উল্টো ষড়যন্ত্রকারীদের তৃণমূল ঘৃণাভরেই প্রত্যাখান করেছেন। সাজেদা চৌধুরীর পর দীপু মনিও হতে পারেন আওয়ামী লীগের নারী সাধারণ সম্পাদক। বাগ্মীতা, ধৈর্য্য, পরিশ্রম আর তৃণমূলের সঙ্গে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ রিলেশনের কারণেই এগিয়ে থাকবেন তিনি।

সরকারের ‘স্পোকসম্যান’ ড: হাছান মাহমুদ তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী। গত সম্মেলনে তাকে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক পদ থেকে পদোন্নতি দিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটিকে তার সাংগঠনিক দক্ষতার পুরস্কার হিসেবেই দেখা হচ্ছে। মেধাবী ও পরিচ্ছন্ন এই রাজনীতিক তৃণমূলে আওয়ামী লীগকে চাঙ্গা করার মিশনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে আওয়ামী লীগের টিম সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন সফলতার সঙ্গেই। কাজের মতো কথা বলাতেও রয়েছে তাঁর নিজস্ব স্টাইল। ছন্দবদ্ধ এবং শৈল্পিক সাবলীল উচ্চারণের মাধ্যমে পূরণ করেন জনপ্রত্যাশাও। ক’দিন আগে সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বিএনপির সংসদ সদস্যদের তথ্য-উপাত্তের আলোকে গঠনমূলক ও যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের মাধ্যমে ‘ধবল ধোলাই’ করেন। প্রধানমন্ত্রীসহ গোটা সংসদ টেবিল চাপড়ে তার সুদৃঢ় বক্তব্যকে স্বাগত জানান। দলে ও সরকারে সমান গতিতে কাজ করে আসা ড.হাছান মাহমুদ প্রধানমন্ত্রীর আস্থার শীর্ষে রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাকে বেছে নেওয়া হলে সেটি চমক নয়, যোগ্যতারই মূল্যায়ন করা হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email