‘সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’

প্রকাশিতঃ 11:24 am | November 22, 2021

প্রভাষ আমিন :

দেড় বছরেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশের মাঠে দর্শক ফিরেছে, এটা ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য দারুণ আনন্দের উপলক্ষ। উপলক্ষটা আরও বেশি আনন্দের, যখন মাঠে থাকছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই আনন্দের উপলক্ষটা এমন গ্লানির কালিমায় লিপ্ত হবে সেটা আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে হেরেছে, এটা খারাপ লাগার হলেও গ্লানির নয়। সদ্য সমাপ্ত টি-২০ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের যে অসাধারণ পারফরম্যান্স আর বাংলাদেশের যে লজ্জাজনক বিদায়, তাতে পাকিস্তানের জয় অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল না। প্রথম ম্যাচে কিছুটা আশা জাগালেও দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ হেরেছে অসহায়ভাবে।

খেলায় জয়-পরাজয় আছে; কখনো বাংলাদেশ জিতবে, কখনো হারবে; সেটা নিয়ে আমরা উল্লাস করবো, মন খারাপ করবো। কিন্তু সেদিন মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে যা ঘটেছে তা বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের পরাজয়ের চেয়েও অনেক বেশি লজ্জার, গ্লানির। আসলে হেরেছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এমন দৃশ্য দেখার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। ভেতরে ভেতরে আমরা কতটা পিছিয়ে গেছি, তা ভেবে আমি শঙ্কিত।

সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ফুটেজ দেখে এদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হোক। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হোক। বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আছে; রাজনীতিতে মত থাকবে, ভিন্নমত থাকবে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি করার বা প্রকাশ্যে ঘুরে বেরানোর কোনো অধিকার নেই।

বিতর্ক শুরু হয়েছিল খেলা মাঠে গড়ানোর আগেই। পাকিস্তান দল নজিরবিহীনভাবে অনুশীলনের সময় মাঠে তাদের জাতীয় পতাকা টানিয়ে সব নিয়ম-কানুন, শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছে। ম্যাচের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার পাশে প্রতিপক্ষ দলের জাতীয় পতাকা উড়বে, খেলার আগে দুই দলের জাতীয় সঙ্গীত বাজবে; সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি একটি স্বাধীন দেশে এসে নিজেদের ইচ্ছামতো পতাকা ওড়াতে পারবেন না।

এমনকি আপনি বাংলাদেশি হলেও আপনার গাড়ি বা বাড়িতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়াতে পারবেন না। বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ রুল যেখানে কাউকে নিজেদের ইচ্ছামতো নিজের দেশের পতাকাই ওড়াতে পারবেন না, সেখানে ভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর তো কোনো সুযোগই নেই। বিসিবি বা সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, এমন কোনো খবর পাইনি।

জাতীয় পতাকা উড়িয়ে পাকিস্তান দলের অনুশীলনের খবর একজন গর্বিত দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী হিসেবে আমাকে ক্ষুব্ধ করেছে। সরকার প্রতিবাদ না করলেও আমি করেছি। সেই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছেন পাকিস্তানের অধিনায়ক বাবার আজম। ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানের অনেক সমর্থক আছে।

বাংলাদেশে যে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অনেক সমর্থক আছে, সেটা বাবর আজম যেমন জানেন, আমিও জানি। ক্রিকেটে পাকিস্তানের যে পারফরম্যান্স তাতে শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই তাদের সমর্থক আছে। পাকিস্তানে অনেক অসাধারণ ক্রিকেটার আছেন। কিন্তু আমি কখনোই পাকিস্তান ক্রিকেটের সমর্থক। শুধু ক্রিকেট নয়, পাকিস্তানের সবকিছুই আমি অপছন্দ করি, ঘৃণা করি। তবে যারা নিছক ক্রিকেটীয় কারণে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে সমর্থন করেন, তাদের ব্যাপারে আমার বলার কিছু নেই। কিন্তু যারা ক্রিকেটকে অবলম্বন করে আসলে পাকিস্তানকেই ভালোবাসেন, অন্তরে পাকিস্তানকে লালন করেন; তাদেরও আমি ঘৃণা করি। আমি তাদের বলি আটকেপড়া পাকিস্তানি।

বাংলাদেশে দুই ধরনের আটকেপড়া পাকিস্তানি আছেন। কিছু আছেন, যারা ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ভারতের বিহারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে তখনকার পাকিস্তানে এসেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় তারা আটকা পড়েন। তারা অন্তরে পাকিস্তানকে ধারণ করলেও কখনোই সেখানে যেত পারেননি। তারা মোহাম্মদপুর, মিরপুর, সৈয়দপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্পে বা বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। তারা হলেন শারীরিকভাবে আটকেপড়া পাকিস্তানি। আর কিছু আছে, যাদের জন্ম বাংলাদেশে, কিন্তু অন্তরে তাদের পাকিস্তান। তাদের আমি বলি মানসিকভাবে আটকেপড়া পাকিস্তানি।

শারীরিকভাবে আটকেপড়া পাকিস্তানিরা নিজেদের মত থাকলেও মানসিকভাবে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের উৎপাত ইদানীং বেড়ে গেছে। এই মানসিকভাবে আটকেপড়া পাকিস্তানিরা যে হঠাৎ করে উদয় হয়েছে তা নয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল, সেটাই ছিল আসলে আমাদের স্বাধীনতার ম্যান্ডেট। কিন্তু সেই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ দুটি আসনে হেরেছিল এবং অল্প হলেও সব আসনে আওয়ামী লীগের বিপক্ষেও ভোট পড়েছিল।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে যারা আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল তারা আসলে বাংলাদেশেষর স্বাধীনতা চায়নি। স্বাধীনতা না চাওয়া এ অংশটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর চিনিয়ে দিয়েছে, তাদের ধরিয়ে দিয়েছে, হত্যা করেছে, ধর্ষণ করেছে, লুটপাট করেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ পর্যন্ত স্বাধীনতাবিরোধী ঘাপটি মেরে ছিল। কিন্তু সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতাবিরোধীরা আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়, রাষ্ট্রের আনুকূল্য পায়। এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতেও উড়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।

এই স্বাধীনতাবিরোধী এবং তাদের বংশধরদের ঔদ্ধত্য আজ এতটা বেড়েছে, তারা স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের বিজয় কামনা করে, বিজয়ে উল্লাস প্রকাশ করে। তারা পাকিস্তানের জার্সি গায়ে জড়িয়ে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে মাঠে খেলা দেখতে যায়। টেলিভিশনে গ্যালারিতে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা দেখে প্রথমে আমি বিভ্রান্ত হয়েছি। ভেবেছি বাংলাদেশে থাকা কোনো পাকিস্তানি বা কূটনীতিকদের কেউ হয়তো মাঠে গেছেন খেলা দেখতে।

অন্য দেশের খেলা থাকলে এমন দৃশ্য আমরা দেখি। কিন্তু জাতীয় পতাকার আধিক্য দেখে আমার ভুল ভেঙেছে। পরে ভেবেছি খেলা যেহেতু মিরপুরে, তাই হয়তো বিহারী মানে শারীরিকভাবে আটকেপড়া পাকিস্তানিরাই হয়তো পুরোনো প্রেম ভুলতে পারেনি। আটকেপড়া পাকিস্তানিদের একটা বড় অংশ থাকে মিরপুর এলাকায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যারা জানেন, তারা নিশ্চয়ই এটাও জানেন মিরপুরমুক্ত হয়েছিল, ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি, বাংলাদেশ বিজয় অর্জনের ৪৬ দিন পর। কিন্তু আমার সে বিভ্রমও কেটে যায়, যখন খেলা শেষে স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের জয়ধ্বনি উচ্চকিত হয়, যখন মানসিকভাবে আটকেপড়া পাকিস্তানিরা রীতিমতো টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়ে জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের নাগরিক কিন্তু ভালোবাসেন পাকিস্তানকে। পাকিস্তানের জার্সি পরা এক তরুণ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন করেন, জবাব বাংলায় দেবেন না উর্দুতে।

উৎফুল্ল এই কুলাঙ্গার বলে, বাংলাদেশ বলতে তো কিছু নাই। চাই পাকিস্তান জিতুক। আরেক কুলাঙ্গারের ধারণা বাংলাদেশ-পাকিস্তান ভাই ভাই। পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়াটাই ভুল হয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে জন্ম নেয়া কোনো তরুণ এমন দম্ভোক্তি করতে পারে, এটা অবিশ্বাস্য।

মুক্তিযোদ্ধারা সবসময়ই আমার কাছে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত। নিজেদের জীবনের মায়া না করে তারা আমাদের একটা স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। আজ যখন দেখি বাংলাদেশ তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছে, আর পাকিস্তান প্রায় ব্যর্থ একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র; তখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আরও বাড়ে। রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকতে পারে, একেকজন একে দল করতে পারে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের পক্ষে বলার ঔদ্ধত্য এরা কোথায় পায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ দুটি ধারা আছে। নিজের কাছেই প্রশ্ন করি, বাংলাদেশ কবে ভেতরে ভেতরে এতটা পাল্টে গেলো যে প্রকাশ্যে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া যায়। চার দশক পরে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে কিছুটা গ্লানিমুক্ত করেছেন। কিন্তু তলে তলে তাদের উত্তরসূরিরা বংশবিস্তার করেছে, আজ তারা বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের পতাকা বহন করে! মনে হচ্ছে, কোথাও আমরা ভুল করছি। ক্ষমতার কারণে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ছাড় দেয়া হয়েছে, আপস করা হয়েছে। তাদের দাবি মেনে পাঠ্যপুস্তক বদলানো হয়েছে। আর এ সুযোগে ভুলভাবে বেড়ে উঠছে নতুন প্রজন্মের একটি অংশ।

পাকিস্তান প্রসঙ্গ এলেই অনেকে খেলার সাথে রাজনীতি মেশানোর পরামর্শ দেন। অতীত ভুলে সামনে তাকানোর নসিহত করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ও আমরা এমন অনেক নসিহত শুনেছি। এমনকি পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানোর প্রসঙ্গে অনেকে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকার প্রসঙ্গ টানেন। আমি জানি খলের কখনো ছলের অভাব হয় না।

পাকিস্তানকে সমর্থন করার জন্য যারা এমন যুক্তি টানেন তারাও সেই স্বাথীনতাবিরোধী কুলাঙ্গারদেরই দোসর। ব্রাজিলের পতাকা আর পাকিস্তানের পতাকা এক নয়। বাংলাদেশ আমাদের আবেগের জায়গা, ক্রিকেট আমাদের সেই আবেগে নতুন মাত্রা আনে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ২৩ বছরের মুক্তি সংগ্রাম আর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই স্বাধীনতায় মিশে আছে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর কোটি মা-বোনের নির্যাতনের হাহাকার।

পাকিস্তান এখনও একাত্তরের গণহত্যার জন্য ক্ষমা চায়নি, শিমলা চুক্তিতে বিচারের কথা বলে নিয়ে যাওয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেনি, আমাদের পাওনা ফেরত দেয়নি, আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেয়নি। তাই পাকিস্তানের সাথে কোনো আপস নেই। স্বাধীন বাংলায় দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের পক্ষে বলার কোনো সুযোগ নেই। মিরপুরে যারা পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে খেলা দেখতে গেছে, পাকিস্তানের পক্ষে গলা ফাটিয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভুল বলেছে; তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ফুটেজ দেখে এদের চিহ্নিত করে তাদের গ্রেফতার করা হোক। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হোক। বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আছে; রাজনীতিতে মত থাকবে, ভিন্নমত থাকবে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি করার বা প্রকাশ্যে ঘুরে বেরানোর কোনো অধিকার নেই।

মিরপুরে পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে যাওয়া কুলাঙ্গারদের জন্যই বোধহয় সপ্তদশ শতকের কবি আব্দুল হাকিম লিখে গেছেন,
‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী,
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’
২১ নভেম্বর, ২০২১

লেখক : বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ।

Print Friendly, PDF & Email