‘এন-৯৫’ মাস্ক নিয়ে তুঘলকি কারবার, স্বাস্থ্যমন্ত্রী-সচিবকে টার্গেটের নেপথ্যে

প্রকাশিতঃ 7:22 pm | April 19, 2020

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো :

সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্কের গায়ে ‘ভুল’ করে লেখা হয়েছিল ‘এন-৯৫’ মাস্ক। গত মার্চের শেষের দিকে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছিল এ রকমের প্রায় তিন শতাধিক মাস্ক। স্বভাবতই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

পরবর্তীতে চলতি এপ্রিলের শুরুর দিকে এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদ উল্লাহ সপ্তাহ দুয়েক আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক ব্রিফিংয়ে স্বীকার করেন, ‘ওই মাস্ক সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক ছিল। প্যাকেটের গায়ে জন্য এন-৯৫ লেখা হয়েছিল ‘ভুল করে’।

পাশাপাশি সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ ওই মাস্ক ফেরত দিয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেএমআই’র কাছে লিখিত জবাব চায়। ধারণা করা হচ্ছিল, মাস্ক নিয়ে তুঘলকি কারবারের যবনিকাপাত ঘটবে এখানেই। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে মাস্ক সরবাহ করতে ব্যর্থ একটি বিশেষ মহল এ নিয়ে আরও জল ঘোলা করে। এবার তাদের মূল ‘টার্গেট’ হয়ে উঠেন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব থেকে শুরু করে তাদের পরিবারের সদস্যরাও।

এ নিয়ে গত কয়েকদিন যাবতই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্ত্রী, সচিব ও তাদের পরিবারকে টার্গেট করে বিভিন্ন ফেসবুক থেকে নানামুখী প্রপাগন্ডা ছড়ানো শুরু হয়। আবার মুহুর্তেই সেইসব স্ট্যাটাস অখ্যাত বিভিন্ন অনলাইন নিউজপোর্টালে রিপোর্ট আকারে প্রকাশিত হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জিম্মি করতেই মূলত পুরো বিষয়টি ভাইরাল করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন সূত্র কালের আলো’র কাছে দাবি করেছে।

একই সূত্র কালের আলোকে আরও বলেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা কেন্দ্রীয় ঔষধাগার কোন অবস্থাতেই জেএমআই’কে এন-৯৫ মাস্ক সবরাহের আদেশ দেয়নি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এই মাস্ক স্বভাবতই বাংলাদেশের কোন প্রতিষ্ঠান তৈরি করার মতো সক্ষমতা অর্জন করেনি।

কিন্তু এরপরেও প্যাকেটের মোড়কে একটি ভুলের কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের হেনস্থা করতেই রীতিমতো আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে পড়ে সুবিধা হাতছাড়া ওই বিশেষ মহলটি।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) সূত্র মতে, নরমাল সার্জিক্যাল মাস্কের মোড়কের গায়ে ওই প্রতিষ্ঠানটি ভুলবশত এন-৯৫ মাস্ক লিখে দিয়েছে। জরুরি ওই সময়টিতে পুরো বিষয়টি দেখার মতো সুযোগ ছিল না সিএমএসডি কর্তৃপক্ষের।

জনবল সঙ্কটের মধ্যেও কোভিড-১৯’র মতো মহাদুর্যোগ পাড়ি দিতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে সেখানে যাচাই-বাছাই না করার কারণেই এমন সামান্য ভুলের অজুহাতেই যে লঙ্কাকান্ড ঘটবে এমন পরিস্থিতির সঙ্গেও অতীতে তাদের পরিচয় ঘটেনি। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা এরকমের ভুল সংশোধন করে নব উদ্যমে কোভিড-১৯ মহাপ্রলয় সামলে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করবে বলেও মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রটি।

একটি সূত্র কালের আলোকে অভিযোগ করে বলেছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তিক্ততা বেশ পুরনো। সেই তিক্ততার প্রতিশোধ হিসেবেই ‘এন-৯৫’ মাস্ক কান্ডে গরম হয়ে উঠেছে ওই কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে ভুলকে ‘ভুল’ হিসেবে না দেখে রীতিমতো ‘সাইজ’ করার নেতিবাচক নজিরও স্থাপিত হয়েছে কীনা এই বিষয়টিও খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছে ওই সূত্রটি।

একাধিক সূত্র কালের আলোকে বলছে, বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী এবং চিকিৎসার সঙ্গে সহায়ক যন্ত্রাংশ ইত্যাদি প্রস্তুত করে ওষুধ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে। এবং ওষুধ প্রশাসন তাদের মান এবং মুল্য নির্ধারণ করে দেয়। সেই প্রেক্ষিতে জেএমআই যা সরবরাহ করুক না কেন তা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমতি সাপেক্ষেই করে থাকে। এক্ষেত্রে তাদের গুণগত মান এবং মূল্যের মধ্যে অন্য কারও হাত দেওয়ার নুন্যতম কোন সুযোগ নেই।

এদিকে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তার ছেলে, স্বাস্থ্য সেবা সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জড়িয়ে ‘মানহানিকর সংবাদ’ প্রকাশিত হওয়ায় মামলা করার হুমকি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি)।

পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ওইসব ‘খবরের’ প্রতিবাদ জানিয়ে সিএমএসডি পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদ উল্লাহ বলেছেন, ‘অপপ্রচারগুলিতে ইচ্ছাকৃতভাবে উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গকে জড়িয়ে মিথ্যা রাজনৈতিক এবং চরিত্রগত রটনারও অবকাশ করা হচ্ছে।”

মাস্ক কেনার সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তার ছেলে, স্বাস্থ্য সেবা সচিব বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ‘কোনো সংশ্লেষ নেই’ জানিয়ে ‘স্বার্থসিদ্ধিমূলক বিভ্রান্তিকর’ তথ্যে বিভ্রান্ত না হতে চিকিৎসকসহ সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে ওই বিজ্ঞপ্তিতে।

মুগদা হাসপাতালে কীভাবে ‘ভুল মাস্ক’ গেল সেই বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন সিএমএসডি পরিচালক।

সেখানে বলা হয়েছে, “সিএমএসডি কোনো দেশীয় চিকিৎসা সামগ্রী প্রস্তুতকারী কোম্পানি/প্রতিষ্ঠানের নিকট এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের কার্যাদেশ প্রদান করে নাই। বাংলাদেশি চিকিৎসাসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জেমএআই কোভিড-১৯ সংক্রমণের পূর্বে থেকে হ্যান্ড গ্লাভস, স্যানিটাইজার, সাধারণ মাস্ক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত লাইসেন্স/ কোয়ালিটি সার্টিফিকেট/ ছাড়পত্র অনুযায়ী সিএমএসডিকে সরবরাহ করে আসছে।

‘উক্ত কোম্পানি যে মোড়কে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করে, সে মোড়কগুলোতে এন-৯৫ মুদ্রিত ছিল। সিএমএসডি ভুলক্রমে সাধারণ মাস্ক হিসেবেই পণ্যগুলো সরবরাহ করে। বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়েই নজরে আসে। সিএমএসডি তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহকারী কোম্পানিকে মাস্কগুলো ফেরত দেয়। কেন এমন মোড়কে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করেছে তার লিখিত জবাব চায়।’

বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়- ‘সরবরাহকারী কোম্পানি জেমএআই তখন ‘দেরি না করে’ ভুলের ব্যাখ্যা দেয় এবং সিএমএসডি পরিচালক বিষয়টি গণমাধ্যমকে ব্যাখ্যাও করেন।

বিষয়টি সেখানেই ‘শেষ হওয়া উচিৎ ছিল’ মন্তব্য করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সিএমএসডি বর্তমান কোভিড-১৯ বৈশ্বিক দুর্যোগকালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারি ক্রয় আইন অনুসরণ করেই ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। অথচ বিভ্রান্তিমূলকভাবে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়ের পুত্র, স্বাস্থ্য সেবা সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জড়িয়ে মানহানিকর সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে।

‘সিএমএসডি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চায় যে, এই ক্রয় প্রক্রিয়ায় উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গের কোনো সংশ্লেষ নাই এবং তাদের আর্থিক বা অন্যান্যভাবে লাভবান হওয়ার কোনো সুযোগ নাই।’

মাস্ক কেনার সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ অন্যদের জড়িয়ে ‘রটনা’ ছড়ানো হচ্ছে অভিযোগ করে সিএমএসডি বলেছে, ‘এই ধরনের অপরাধী চক্রকে হুঁশিয়ার করা যাচ্ছে যে, তারা এ ধরনের অপচেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত না করলে ডিজিটাল তথ্য আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হবে।’

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এন-৯৫ মাস্ক কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই উৎপাদিত হয়। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে তারা ওই মাস্ক রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সংস্থা এর সমমানের একাধিক মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দেয়। এগুলো হল টঝ-ঋউঅ বা ঈঊ সনদপ্রাপ্ত কেএন-৯৫, এফএফপি ২ বা পি ২ মাস্ক।

সিএমএসডি এন-৯৫ মাস্ক পর্যাপ্ত সংখ্যায় সরবরাহ করতে না পারলেও ‘সনদপ্রাপ্ত বিকল্প মানসম্পন্ন’ মাস্ক সরবরাহ করছে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ অর্থ থেকে নিজ উদ্যোগে পিপিই, মাস্ক ও অন্যান্য সুরক্ষা ও চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয় বা সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছে।’

কালের আলো/এসএকে/এমএন

Print Friendly, PDF & Email