করোনাভাইরাস ঠেকাতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

প্রকাশিতঃ 10:30 am | February 09, 2020

মীর আব্দুল আলীম :

সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও ঘনীভূত করোনাভাইরাস আতঙ্ক। যত দিন গড়াচ্ছে, করোনাভাইরাসের হানায় সন্ত্রস্ত হচ্ছে গোটা দুনিয়া। এরই মধ্যে চীন থেকে ‘করোনা ভাইরাস’ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। সবখানে আতঙ্ক। বাংলাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বেশি; সতর্কতা কম। রোগব্যাধি নিয়ে আতঙ্ক নয়, দরকার হলো সতর্কতা ও সচেতনতা। এখনও বাংলাদেশে চীনা নাগরিক এবং প্রবাসীরা প্রবেশ করছে। করছে বহু চীনা নাগরিক দেশে বসবাস। তাদের ব্যাপারে সতর্কতা কম, বিধি নিষেধ কম। আমাদের বিমানবন্দর, স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর গুলো এখনও সুরক্ষিত বলা যাবে না। কারা আসছে? কোথা থেকে আসছে? ট্রানজিট হয়ে করোনাভাইরাস আক্রান্ত দেশ থেকে কেউ আসছে কি-না তা নিয়ে সতর্কতা নেই, কোন হিসাব নেই। এ অবস্থায় বাংলাদেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চলতি সপ্তাহে ভারতের হুগলীতে সাহিত্যসভায় যোগ দিয়ে দেশে ফিরছিলাম। কলকাতা বিমানবন্দরে আমরা বেশ সতর্কতা লক্ষ করলেও, ঢাকা হজরত শাহজালাল (রা) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে সতর্কতা তেমন একটা চোখে পড়েনি আমাদের। কলকাতা থেকে ট্রানজিট হয়ে চীন থেকে আসা প্রবাসী সহজেই বিনা বাধায়, বিনা স্ক্যানিংয়ে দেশের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। এমনটা হচ্ছে বিভিন্ন বন্দরে। বিষয়টা গাছাড়াই মনে হলো। এমনটা হলে বাংলাদেশের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। করোনাভাইরাস এ দেশে ঢুকে পড়লে দ্রুত মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। কারণ আমরা সচেতন নই। এখনও আমাদের দেশের ১৬ কোটি মানুষের বেশিরভাগই এ ভাইরাস সম্পর্কে ধারণা রাখে না। অধিকাংশই শুনছে এ ভাইরাসে মানুষ মারা যায়। সতর্কতার বিষয়ে জানে কম। এদেশে এ ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক আছে বেশ, সতর্কতা নেই। এটা ভয়ানক বিষয়।

আমাদের বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরসমূহে এ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্তের বিশেষ মেডিকেল চেকআপের ব্যবস্থা যাতে সার্বক্ষণিকভাবে চালু থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, আমাদের মতো জনবহুল দেশে এই ভাইরাস মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এ ভাইরাস যেহেতু আক্রান্তের হাঁচি-কাশি-সর্দির মাধ্যমে ছড়ানোর ক্ষমতা রাখে, সে কারণে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। যেমন, সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া, সর্দি-কাশি হলে মাস্ক পরিধান করা, হাঁচি-কাশি হলে মুখ ঢেকে হাঁচি বা কাশি দেয়া এবং সে হাত সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে। অন্যদিকে পোল্ট্রিসহ, পশুপাখি হতে দূরে থাকতে হবে। কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ ডিম বা মাংস না খাওয়া এবং এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে চলাচল করতে হবে। এমন সতর্কতা কমই অবলম্বন করছি আমরা। এ ভাইরাস এদেশে প্রবেশ করতে পারলে কেবল মানুষই মরবে না, দেশের অর্থনীতির চাকা একেবারে অচল হয়ে পড়বে।

গত ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে। চীন ছাড়াও থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়াসহ ১৮ দেশে ৯৮ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। প্রতিনিয়ত এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক দেশ যোগাযোগ ছিন্ন করেছে দেশটির সাথে। চীনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ায়, করোনাভাইরাস নিয়ে চীন যুদ্ধকালীন তৎপরতা চালাচ্ছে। সর্বশেষ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’ ৪২৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এ ভাইরাসে আরও অনেক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুধু মানুষের জীবন নয়, এখন চীনের অর্থনীতির জন্যও হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে করোনাভাইরাস।

চীনের অভিযোগ, করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ঐ দেশসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চীনে ব্যবসা পরিচালনা সাময়িক বন্ধ করে দিয়েছে। এ সংকটে চীনের আর্থিক ক্ষতি ৬ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দেশের অর্থনীতিতে আরো ২ হাজার ২শ’ কোটি ডলার যোগ করতে যাচ্ছে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে বৈকি!

সারা দুনিয়ায় করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে চীনে। আতংক বিশ্ব জুড়ে। চীনে রেড এলার্ট জারি হয়েছে। করোনাভাইরাস আতঙ্কে উহানসহ বিভিন্ন প্রদেশে বাংলাদেশের অনেক নাগরিক অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন। অনেকের বাসায় খাবার পর্যন্ত শেষ হয়ে গেছে। কোন কোন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি স্বজনদের অবহিত করেছেন। বাংলাদেশেও এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ বাংলাদেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার হাজার চীনা নাগরিক কাজ করছেন। আবার বাংলাদেশের হাজার শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা নিতে চীনে অবস্থান করছেন। এই দুই দেশের বাসিন্দাদের আশা-যাওয়ার মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে তা পর্যাপ্ত মনে হচ্ছে না।

করোনাভাইরাস আক্রান্ত চীনা নাগরিক কিংবা প্রবাসীরা বাংলাদেশে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। এ ছাড়াও চীনে থাকা বাংলাদেশি নাগরিক যারা এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আসছেন তাদের মাধ্যমেও এই ভাইরাস বাংলাদেশে বিস্তার ঘটাতে পারে। আমাদের আরও অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে। সতর্ক আর সচেতন হলে আমারা এ ভাইরাসের আক্রমণ থেকে দূরে থাকতে পারবো। এছাড়া এ ভাইরাস প্রতিরোধে আমাদের উদ্যোগ নিতেই হবে। আমদের বিমানবন্দর, স্থলবন্দর, নৌবন্দরে সতর্কতা জারি করতে হবে। যাতে করোনাভাইরাস আক্রান্ত একজন নাগরিকও বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার যাতে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছে। বিমানবন্দর, নৌবন্দরে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে দেশি প্রল্পে নিয়োজিত বিদেশি নাগরিকদের ওপরও নজর রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশের যেসব প্রতিষ্ঠানে চীনা নাগরিকরা কর্মরত আছেন, তাদের দেশ ত্যাগ না করা এবং যারা ইতিমধ্যে চীন থেকে বাংলাদেশে এসেছেন, তাদের পর্যবেক্ষণে রাখছেন প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। পদ্মাসেতু প্রকল্প, দক্ষিণাঞ্চলের কলাপাড়ায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রর চীনা প্রকৌশলী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে বিশেষ সচেতনতা সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কলাপাড়ায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পদ্মসেতু প্রকল্পে নিয়োজিত চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের বাংলাদেশ ত্যাগ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যারা এই মুহূর্তে চীনে অবস্থানকারী চীনা নাগরিক ও বাংলাদেশি নাগরিকদেরও দেশে না আসার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করলেই ভালো। তা না হলে আমাদের কপালে দুর্গতি আছে এটা ভাবতে হবে সকলকে।

যেভাবেই ছড়াক করোনাভাইরাস এখন আমাদের সতর্ক হওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। মনে রাখতে হবে রোগগব্যাধি নিয়ে আতঙ্ক নয়, দরকার হলো সতর্কতা ও সচেতনতা। চীন থেকে ‘করোনাভাইরাস’ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। করোনাভাইরাসের ঝুঁকি এড়াতে অধিক সতর্কতা জরুরি এখন। কারণ বাংলাদেশ এখন বিশ্ব আগ্রীহর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকেই বাংলাদেশে পর্যটক বা ব্যবসায়ীদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। ফলে এই ভাইরাসটি বাংলাদেশে প্রবেশ করার শঙ্কা প্রবল। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সব মহল করোনাভাইরাস সম্পর্কে সতর্ক রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিচ্ছে এটি আমাদের আশা এবং স্বস্তির বিষয়।

শুধু সরকারের পদক্ষেপের ওপর ভরসা করে থাকলেই চলবে না, জনগণকেও দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে। ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন, যেমন- ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার করা, বেশি লোক সমাগম হয় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যতটা সতর্ক রয়েছে তার থেকেও অধিক সতর্কতা প্রয়োজন। ভৌগোলিক অবস্থান এবং চীন থেকে আসা যাত্রীদের কারণে করোনাভাইরাস বাংলাদেশে আসার ঝুঁকি রয়েছে। করোনাভাইরাস যেভাবে দ্রুত গতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে তা বিবেচনায় রেখে আরও সতর্কতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে চীনে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস যাতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করে তা সংশ্লিষ্টদের নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক।

Print Friendly, PDF & Email