আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের যে লেখা নিয়ে ফেসবুকে তোলপাড়

প্রকাশিতঃ 9:29 am | September 04, 2019

কালের আলো ডেস্ক:

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘শাড়ি’বিষয়ক নিবন্ধটি নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে ফেসবুকে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বলা বাহুল্য ফেসবুক ইউজারদের বেশিরভাগই এ নিয়ে তার সমালোচনা করেছেন।

গত ৩০শে অগাস্ট তার লেখা ‘শাড়ি’নিবন্ধটি প্রকাশিত হয় প্রথম আলো পত্রিকায়। সেখানে তিনি শাড়ির পাশাপাশি বাঙালি নারীর শারীরিক সৌন্দর্য নিয়েও নানা রকম মন্তব্য করেন, যার বেশিরভাগই ছিলো যৌনতা সক্রান্ত। তার এই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। বিশেষ করে নারী ইউজাররা এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। অনেকে নিজেদের ওয়ালে তাদের শাড়ি পরা ছবিও পোস্ট করেন।

অনেকে এই লেখাটিকে নারী বিদ্বেষী, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আর বর্ণবাদী বলে অভিযুক্ত করেছেন। তবে অনেকে এই লেখাটির পক্ষেও তাদের অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় তার ওই লেখাটি শুরু হয়েছে এইভাবে, ‘শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথবা শালীন পোশাক। শুধু শালীন নয়, রুচিসম্মত, সুস্মিত ও কারুকার্যময় পোশাক।….’

সেখানে শাড়ি কিভাবে মেয়েদের শরীরের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে, শাড়ির সঙ্গে পশ্চিমা বা অন্যান্য পোশাকে মেয়েদের দেখতে কেমন দেখায় তার তুলনা এবং মেয়েদের শারীরিক গঠনের সঙ্গে শাড়ির সম্পর্ক, ইত্যাদি নানা বিষয় এসেছে।

তিনি লিখেছেন, ‘আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ। শাড়ি তার রূপের শরীরে বইয়ে দেয় এক অলৌকিক বিদ্যুৎ হিল্লোল।…পৃথিবীর কোনো কোনো এলাকার নারী শরীরেই কেবল শাড়িতে এ অলীক রূপ ফুটে ওঠে, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রিয়দর্শিনী সুকুমারী তন্বীদের দেহবল্লরীতে—সে বাংলা, পাঞ্জাব বা উত্তর ভারতের—যেখানকারই হোক।’

আরো লিখেছেন, ‘শাড়ি একটা রহস্যময় পোশাক। নারী দেহকে কতটা প্রদর্শন করলে আর কতটা অপ্রকাশিত রাখলে তা শারীরিক মোহ বজায় রেখেও দর্শকের চোখে অনিন্দ্য হয়ে উঠবে, তা পোশাকটি যেন সহজাতভাবেই জানে।’

তিনি মেয়েদের দৈহিক উচ্চতা নিয়ে লিখেছেন, ‘বাঙালি সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: আমার ধারণা ‘উচ্চতা’। সবচেয়ে কম যে উচ্চতা থাকলে মানুষকে সহজে সুন্দর মনে হয়—যেমন পুরুষের ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি ও মেয়েদের ৫ ফুট ৫ বা ৬ ইঞ্চি—আমাদের গড় উচ্চতা তার চেয়ে অন্তত ২–৩ ইঞ্চি কম। দৈহিক সৌন্দর্য ছেলেদের বড় ব্যাপার নয় বলে এ নিয়েও তারা কোনোমতে পার পেয়ে যায়। কিন্তু আটকে যায় মেয়েরা। আমার ধারণা, একটা মেয়ের উচ্চতা অন্তত ৫ ফুট ৪–এর কম হলে তার শরীরে নারীজনিত গীতিময় ভঙ্গি পুরোপুরি ফুটে ওঠে না।’

‘বাঙালি মেয়েরা বিপদে পড়ে এখানটাতেই। এদের গড় উচ্চতা ৫ ফুট ২ থেকে ৩ ইঞ্চির সামান্য এদিক–ওদিকে (অবশ্য ১০ শতাংশ মেয়েকে বাদ দিয়ে ধরলে)। এই উচ্চতা নিয়ে ললিত–মধুর ও দীর্ঘাঙ্গী নারীর কমনীয় শরীর নিয়ে ফুটে ওঠা কঠিন, যা দেখা যায় এই উপমহাদেশের উত্তর দিকের নারীর উন্নত দেহসৌষ্ঠবে।’

বাঙালি নারীদের পশ্চিমা পোশাক পরিধানের বিষয়টি যে তার একেবারেই পছন্দ নয়, তিনি তা গোপন রাখার চেষ্টা করেননি। তার ভাষায়, ‘আজকাল শাড়ি ছাড়া অনেক রকম কাপড় পরছে তারা—সালোয়ার–কামিজ তো আছেই, পাশ্চাত্য ফ্যাশনের কাপড়ও কম পরছে না—এবং পরার পর ইউরোপ বা ভারতের ওই সব পোশাক পরা সুন্দরীদের সমকক্ষ ভেবে হয়তো কিছুটা হাস্যকর আত্মতৃপ্তিও পাচ্ছে।’

সবশেষে তিনি আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘আমার মনে হয়, এ রকম একটা অপরূপ পোশাককে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বাঙালি মেয়েরা সুবুদ্ধির পরিচয় দেয়নি।’

লেখাটি প্রকাশের পর থেকেই বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে নিন্দার ঝড় বয়ে যেতে থাকে। অনেকে নিজেদের ওয়ালে শাড়ির পরা ছবি দেন, সামলোচনা করেও নিবন্ধ ছাপা হয়েছে অনেক। কেউ কেউ আবার পুরুষের পোশাক ও সৌন্দর্য নিয়েও পাল্টা লেখা লিখেছেন।

অনিন্দিতা সেঁজুতি নামের এক ইউজার তার ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘ভদ্র ভাষায় সম্মানের সাথে বলতে গেলে দুঃখজনক লেখা! পুরো লেখায় বাঙালি নারীর বডি শেমিং করে গেছেন! সম্পূর্ণ সেক্সিস্ট লেখা!! ……শাড়ি কেন ঝেঁটিয়ে বিদায়ও করেনি। এখনকার ব্যস্ত জীবনে মানুষ নিজ স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী পোশাক পড়ে।’

জাহান সুলতানা প্রশ্ন , ‘নারীজনিত গীতিময় ভঙ্গি ফুটে ওঠার একটা মানদণ্ড কি পাঁচ ফুট চার ইঞ্চ উচ্চতা? ……যাই পড়ুক, তাকে সুন্দর লাগতে হবে কেন। কেন? সুন্দর লাগার জন্য বাঙ্গালি নারীকে শাড়িই পরতে হবে। কেন?…..মেয়েদের জন্য সৌন্দর্যটাই সবকিছু, এসব কিছু যদি পাশের বাড়ির সংকীর্ণমনা স্বল্প পড়ুয়া ভাবী বলেন, কানে লাগে না, কিন্তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের মতো একজন ব্যক্তিত্ব দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে সরকারি না হলেও যখন অনেকটা এভাবেই শোনার মত করে বিষয়গুলো লিখেন, তখন ভীষণ অবাক হতে হয় বৈকি!’

বেসরকারি চাকরিজীবী জেসমিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি এক সময় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য ছিলাম, স্যারকে আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর হিসাবে দেখে এসেছি। কিন্তু তিনি নারীদের এভাবে দেখেন, এটাই আমাকে সবচেয়ে আহত করেছে। এটা তো নারীকে একজন মানুষ হিসাবে দেখা, পুরুষের সমান হিসাবে দেখা হলো না।’

কেবল নাীরাই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের লেখার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন, এমন নয়। বহু পুরুষ ইউজারও তার এই নিবন্ধ নিয়ে নিজেদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন ফেসবুক এবং আলাদা নিবন্ধ লিখে। তবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শাড়ি নিয়ে এই লেখার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন কেউ কেউ।

লাভলী বাশার নামে একজন স্যারের প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘সেই সুন্দর শাড়ি আর নারী নিয়ে আবু সায়ীদ স্যার তার আবেগ, ভালোলাগা এবং হতাশা কলমের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন শিল্পিতভাবে।সুন্দর শিল্পকে মাধুর্যময় শৈল্পিক রুপ রসে উপস্থাপন করেছেন।’

এরপর তিনি সমালোচনাকারীদের নিন্দা করে লেখেন, ‘অসুস্থতা মানব জীবনের একাগ্রতা নষ্ট করে। সৃষ্টি করে বিচ্ছন্নতার। দৈহিক অসুস্থতার চেয়ে আভ্যন্তরীণ অসুস্থতাই বেশী অস্বস্তিকর। আমার মনে হচ্ছে আমাদের নারীদের অবস্থাও তাই। মানুষ আভ্যন্তরীণ অসুস্থ থাকলে গোটা সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়বে।’

খালেদা আকতার কল্পনা নামে এক লেখক এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের ‘শাড়ি’ প্রবন্ধটি নিয়ে যারা ফেসবুক তোলপাড় করছেন, তাদের সিংহভাগই পুরো প্রবন্ধটি পড়েননি বলে আমার ধারণা…’

আনিস আলমগীর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এখানে সমস্যা কোথায়? মাঝখানে নারীর রূপ সৌন্দর্য বর্ণনা? তিনি তো একজন সাহিত্যিক। শিক্ষকও। একজন সাহিত্যিক নারীর রূপ-সৌন্দর্যকে যেভাবে বর্ণনা করেন আমজনতার বর্ণনা থেকে তা তো ভিন্ন হতেই পারে। নাকি শিক্ষক হয়েছেন বলে উনি নারীর সৌন্দর্য বর্ণনা করতে পারবেন না!’

কবি ব্রাত্য রাইসু লিখেছেন, ‘যেই লোক সৌন্দর্যে বিশ্বাস করে না তারে কেউ জোর করতে যাবে না নিশ্চয়ই। কিন্তু সৌন্দর্যে আপনার অবিশ্বাসের কারণে যিনি সুন্দরে বিশ্বাস করেন তিনি এর দ্বারা কোনো রেসিজম করেন না।….ফলে বেটে মেয়েদের চাইতে লম্বা মেয়েরা অধিক সুন্দর, এই দেশে। বেশি লম্বা হইলে আবার সুন্দর না। আপনার সোসাইটি এই রকমই মনে করে।’

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের এই লেখার পক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছেন তাদের বেশিরভাগই সাহিত্য, সংস্কৃতি বা সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত।

তবে নিজের লেখা নিবন্ধ নিয়ে ফেসবুকে এই সমালোচনার জবাবে এখনও মুখ খুলেননি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

কালের আলো/বিআর/এমএম

Print Friendly, PDF & Email