সংকটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়!

প্রকাশিতঃ 10:32 am | June 10, 2021

প্রফেসর ড. মোহা. হাছানাত আলী :

২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

করোনা অতিমারির কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বদ্ধ ঘোষনা করার পর যখন শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম স্থবিরতা বিরাজ করছিলো, যখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমুহ হাত গুটিয়ে বসে ছিলো তখন দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ সর্বপ্রথম অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণ করে অচল শিক্ষাঙ্গনকে সচল করেছিলো। অন্যদেরকে পথ দেখিয়েছিলো।

করোনাকালে সঙ্গতকারণেই অর্থ সঙ্কটে পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আবার অর্থসংকটে পড়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। অর্থ সংকটে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা ও ভবন ভাড়া প্রদান অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থপ্রাপ্তির একমাত্র উৎস হলো শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিস। করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকায় টিউশন ফি পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে বহু অভিভাবক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। আয় কমে গেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ গরিব হয়ে গেছে। ফলে তারা তাদের সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় নির্বাহে হিমসিম খাচ্ছে।

অন্যদিকে এইচএসসি পরীক্ষা সময়মতো না হওয়ায় শিক্ষার্থী সংকটও দেখা দিয়েছে। প্রায় অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় কে তাদের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি’র উপর অর্থছাড় দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এমন সঙ্কটকালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর আরোপ করায় অনুমোদিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর করারোপ করা হলে দেশে উচ্চশিক্ষা ব্যাহত হবার আশংকা রয়েছে। করারোপ নয় বরং বিকাশমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়গুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় সরকারি প্রণোদনাসহ অন্যান্য সহায়তা প্রয়োজন।

করোনাকালে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। দীর্ঘ প্রায় ১৫ মাস যাবৎ ক্লাসরুমে তালা। শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক শিক্ষা জীবন থেকে বহুদুরে। দেশের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। করোনার কারণে গত বছরে এসএসসি’র চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণ করা সম্ভবপর না হওয়ায় শতভাগ শিক্ষার্থীকে অটোপাশ দেয়া হয়েছে। যা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে একধরণের অস্বস্তি রয়েছে। অটোপাশের পর দীর্ঘসময় হয়ে গেলেও দেশের পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমুহ সময়মত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহন করতে পারেনি। শিক্ষার্থীরা অপেক্ষায় আছে। ফলে ঊচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই বহু সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। সঙ্গত ভাবেই বলা যায় যে দেশের ১০৭ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই চ্যালেঞ্জ মোকেবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এদিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে দেশের ৪৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা এখনও শুরুই করা যায়নি। আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও কবে শেষ করা যাবে তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমুহের ভর্তি পরীক্ষা শেষ না হওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চরম শিক্ষার্থী সংকটও দেখা দিয়েছে।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন- ২০১০” অনুযায়ী ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয়ে থাকে। এদিকে বিদ্যমান ট্রাস্ট আইন-১৮৮২ অনুযায়ী ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান করযোগ্য নয়। অথচ প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি কলেজ- বিশ্ববিদ্যালেয়ের আয়ের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে। প্রায় ১৯ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১৮/১৯ লক্ষ্য মানুষের TIN (টিন) আছে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে ট্যাক্সের বাইরে রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর করারোপ অগ্রহণযোগ্য।

সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিপুল অঙ্কের ভুর্তুকি ও অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে। বিশেষ করে, উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নামমাত্র খরচে লেখাপড়ার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি’র ওপর নির্ভর করতে হয়। একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে সরকার যেখানে মেধা সৃষ্টির লক্ষ্যে সর্বস্তরের শিক্ষা খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিয়ে থাকে, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর আরোপ করা হলে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে তা ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করবে।

বর্তমানে দেশে ১০৭ টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৫ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করে। এতে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ গমনের প্রবণতা হ্রাসের পাশাপাশি মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও মেধা পাচার রোধ করা সম্ভব হয়। এমনকি অনেক বিদেশি শিক্ষার্থীও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে বাংলাদেশে আসছে। এছাড়া, দেশে ও বিদেশে বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা ও পেশাজীবী তৈরিসহ বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রুপান্তরিত করার মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।

একটি কথা বলে রাখা ভালো যে করোনা অতিমারির কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বদ্ধ ঘোষনা করার পর যখন শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম স্থবিরতা বিরাজ করছিলো, যখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমুহ হাত গুটিয়ে বসে ছিলো তখন দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ সর্বপ্রথম অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণ করে অচল শিক্ষাঙ্গনকে সচল করেছিলো। অন্যদেরকে পথ দেখিয়েছিলো।

লেখক : অধ্যাপক, আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email