সুরের শহরে অসুরের তান্ডবকে ঘৃণাভরেই প্রত্যাখ্যান আইজিপির; ‘বার্তা’ কূপমণ্ডকতার বিরুদ্ধে একাট্টার!

প্রকাশিতঃ 10:55 pm | April 01, 2021

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

ধর্মীয় উগ্রবাদ ও মৌলবাদের ভয়ানক আস্ফালন আবারও দেখেছে দেশ। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সুমহান চেতনা ও মূল্যবোধ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মান্ধগোষ্ঠী।

বরাবরের মতো এবারও ধর্মীয় উগ্রবাদীদের তান্ডবের ক্ষত বয়ে বেড়াতে হচ্ছে একদা শিল্পসংস্কৃতির পাদপীঠ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোটা শহরকে। হেফাজতীদের তান্ডবলীলায় দগ্ধ ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরাতন জেলরোড এলাকার সুর সম্রাট দি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন।

ধ্বংস আর লুটপাটের একই রকম চিহ্ন সদর উপজেলা ভূমি অফিস থেকে শুরু করে প্রেসক্লাব, জেলা পুলিশ লাইন্স, জেলা পরিষদ ভবনসহ সরকারি অনেক স্থাপনা। সুরের শহরে অসুরের তান্ডবের ৫ দিনের মাথায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করতে বৃহস্পতিবার (০১ এপ্রিল) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সফর করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড.বেনজীর আহমেদ, বিপিএম (বার)।

দিনব্যাপী এ সফরসূচিতে কড়া ও গুরুত্বপূর্ণ বার্তাই দিয়েছেন পুলিশপ্রধান। ধর্মীয় অপশক্তির বিরুদ্ধে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনায় বিশ্বাসী মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মর্মকথা। আবার মাইকিং করে নিজ বাহিনীর কতিপয় সদস্যের আত্নরক্ষার কৌশলকেও ‘অপেশাদার আচরণ’ বলেও উল্লেখ করেছেন।

‘ধর্মের নামে নাশকতা’ কঠোরভাবে দমনের কথা যেমন ড.বেনজীর জানিয়েছেন তেমনি সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ শেকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলারও নিজের প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ মানুষের উদ্দেশে স্পষ্ট ভাষায় আইজিপি বলেছেন ‘আপনাদের সাথে ১৮ কোটি মানুষ আছে, আপনাদের সাথে আইন আছে।

যে রক্তের হোলিখেলা এখানে হয়েছে, তা বরদাস্ত করবেন না আপনারা। সেজন্য সকলকে সংগঠিত হতে হবে। আপনারা মামলা করুন, অবশ্যই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ড.বেনজীর এদিন সকাল ১১ টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছেই প্রেসক্লাব, পৌরসভা, সুর সম্রাট দি আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গনসহ হেফাজতের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। এরপর প্রেসক্লাবে গণমাধ্যকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। গণমাধ্যকর্মীদের পাশে থেকে তাদের সাহসও জুগিয়েছেন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ। সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ধর্মীয় উগ্রতার কাছে বিজয়ী জাতি মাথা কখনই নত করবে না।

স্থানীয় প্রেসক্লাব ও সার্কিট হাউজে দু’দফায় গণমাধ্যকর্মীদের সঙ্গে আলাপে পুলিশ মহাপরিদর্শক একশ্রেণির ধর্মান্ধ ব্যক্তিদের রাজনীতির সঙ্গে জড়ানোর মাধ্যমে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার চরিত্রকে কলঙ্কিত করার হীন অভিপ্রায়কেও ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। আবেগ, ভাষার জাদু আর যুক্তিতে তীব্রভাবে অভিঘাত করেছেন নিজের তেজস্বী তথ্যনির্ভর বক্তব্যে।

ভয়ংকর বিষধর কালনাগ, দেশ-ইসলামের শত্রু ও মুসল্লিদের দুশমনদের নিশ্চিহ্ন করতে মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার বহন করা সব মত-পথের মানুষের ঐক্যবদ্ধ জাগরণের শক্তিতেই আস্থা রাখতে চান তিনি। যে ঐক্যবদ্ধ শক্তির মোহনায় বিজয় এসেছে একাত্তরে, মানবতাবিরোধী শক্তির ফাঁসি হয়েছে। ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তিকে একই ঐক্যের মাধ্যমেই রুখে দেওয়া সম্ভব বলেও মনে করেন আইজিপি।

সজ্জন, সুশৃঙ্খল, সৃজনশীল এবং বলিষ্ঠ মানুষ পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড.বেনজীর আহমেদ। চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, বীরত্ব, বাঙালিত্ব, আদর্শবাদিতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক সহিষ্ণুতার অনন্য এক উদাহরণও তিনি। ‘আমরা চাই সকলের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হোক। আমরা আধ্যাত্মিক আলেম দেখতে চাই, রুহানি আলেম দেখতে চাই’ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পূণ্যভূমিতেও দৃঢ় কন্ঠে এমন উচ্চারণ তাঁর।

ক্ষতিগ্রস্ত প্রেসক্লাব পরিদর্শনে গিয়ে কী বলেছেন আইজিপি?
হেফাজতীদের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাব পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপে ড.বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘এই শহরে তিন লাখ মানুষের বসবাস। এই এলাকায় ৫৭৪টি মাদ্রাসা আপনারা তৈরি করেছেন। এখানে এক লাখ তিন হাজারের মতো শিক্ষার্থী আছে। প্রতি বছর এখানে টাকা দিচ্ছেন আপনারা।

দীনের খেদমতের জন্য আপনারা মাদ্রাসা বানিয়েছেন, আপনারাই বার বার মার খাচ্ছেন। আপনাদের সম্পদই নষ্ট হচ্ছে। ভূমি অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছে। রেকর্ড অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুইশ-আড়াইশ বছরের রেকর্ড পুড়ে গেছে। এতে জমি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হবে, সুবিধাবাদীরা দখল করবে আর গ্রামের সাধারণ মানুষ নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হবে।’

আইজিপি বলেন, ‘এতে কার ক্ষতি হবে? গ্রামের সাধারণ মানুষের ক্ষতি হবে। গত দুই দিনে যে ক্ষতি হয়েছে, বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের ভূমি অফিসে যে ক্ষতি হয়েছে, তা ৫০ বছরেও সেই রেকর্ড ব্যবস্থা ঠিক হবে কিনা আমি জানি না।

‘হাটহাজারিতেও রেকর্ড একত্র করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে হাটহাজারি অঞ্চলের মানুষকে ৫০ বছরের জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে। কাকে আপনারা এই কালেকটভ পানিশমেন্ট দিচ্ছেন? এমন কোনো বছর নেই যে, তাণ্ডব দেখেনি চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোক। তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করছে। ক্ষোভটা কোথায়?’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ও আহত সাংবাদিকের দেখতে গিয়ে মতবিনিময় সভায় আইজিপি আরও বলেন, ‘ইসলামী শিক্ষার নামে আমাদের আলেম সমাজ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। এক রুহানি হুজুর, আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পন্ন। অপরটি রাজনৈতিক। আমাদের এদের চিহ্নিত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক আলেম কারা কারা তাদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে হবে। একইসঙ্গে সেদিনের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে থাকবে তার সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের কাছে সরবরাহ করলেও যারা এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের সহজেই আইনের আওতায় আনা যাবে। এজন্য তিনি সকলের সহযোগিতা চান।

৫০ বছর কষ্টভোগ করবে এখানকার মানুষ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সম্পত্তি উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, ‘এখানে কেন হামলা করা হল সেটা আমার বোধগম্য নয়। ভূমি অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে দেড়-দুইশ বছরের পুরনো রেকর্ডস (দলিলপত্র) রয়েছে। ফলে ভূমি অফিসের আওতায় বসবাসকারীরা আগামী অন্তত ৫০ বছর কষ্ট ভোগ করবেন।’

কিছু লোক আমার দেশের মানুষকে কালেক্টিব পানিশমেন্ট দিতে চায়, জনগণকে শিক্ষা দিতে চায়। সেই শিক্ষা দেওয়ার কারণটা কি আমাদেরকে অবশ্যই বের করতে হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন প্রত্যেক বারই হামলা করে যখনই কোন ঘটনা ঘটে তখনই রেলস্টেশনে হামলা করে।

রেলস্টেশনে হামলা করার কারণটা কি? এটা দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লোকজন যাওয়া আসা করে যাতায়াতের সুবিধা এটাকে বন্ধ করা। এখানে ৫৭৪টি মাদ্রাসা রয়েছে। ছাত্র সংখ্যা এক লাখ। এ জেলার লোক সংখ্যা ৩২ লাখ। আপনারা ৩২ লাখ লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছেন কেন? আপনারা বাসস্ট্যান্ড পুড়িয়ে দিয়েছেন, রেল স্টেশন পুড়িয়ে দিয়েছেন, বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা করছেন। আমি মনে করি এগুলো শুভ লক্ষণ নয়।

পুলিশের মহা পরিদর্শক বলেন, ‘এসব কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে মাদ্রাসা পড়ুয়া কোমলমতি ছেলেদের। অল্প বয়সী ছেলেদেরকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ও সাধারণ মানুষের প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হচ্ছে-যা অত্যন্ত অমানবিক।’

দেশকে ধ্বংস করে রাজনীতি করবেন কীভাবে?
ক্ষুব্ধ কন্ঠে পুলিশপ্রধান বলেন, ‘রাজনীতি করার অধিকার তোমার আছে কিন্তু সেখানে অবশ্যই তার সঙ্গে ধ্বংস কেন? দেশটাতো আমাদের সবার। আর দেশটাকে ধ্বংস করে রাজনীতি করবেন কীভাবে? মানুষের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করবেন। মানুষের কল্যাণ তো করলেন না উল্টো মানুষের কল্যাণে যেসব প্রতিষ্ঠান ছিল সেগুলোও পানিশমেন্টের মধ্যে পড়লো।

ড.বেনজীর বলেন, দেশের কর্মকাণ্ড বিদেশে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। আমাদের রাষ্ট্রীয় ইমেজ তার সঙ্গে যায় না। আমরা একটি সন্ত্রাসী দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে চাই না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের জন্য ইমেজ সংকট হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ৫০ বছর অতিক্রম করেছি। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পরিচালিত হবে। আমাদের দেশে আগে হুজুরেরা রিকশায় যেতে পারতেন না। এখন অনেকেরই গাড়ি হয়েছে। অনেকে হেলিকপ্টার হুজুর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির কারণে হয়েছে। এর অংশীদার আপনারা। দয়া করে এসব ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ করুন। ধ্বংস কার্যক্রম চালালে ১৮ কোটি মানুষ কিন্তু সেটা ভিন্নভাবে নিতে পারে।

এ সময় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) নতুন প্রধান মনিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আনোয়ার হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) হায়াদ উদ দৌলা খান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুর রহমানসহ স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আইজিপি হেফাজতীদের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তাও প্রদান করেন।

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email