মেয়রদ্বয়কে নয়, জনগণ দেখছেন শুধু মশা!

প্রকাশিতঃ 10:16 am | February 25, 2021

নাজনীন মুন্নী :

ইদানীং মানুষ সন্ধ্যার পর বাইরে কথা বলে না। প্রতি কথায় ২/৩টা করে মশা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুখে ঢুকে যাচ্ছে। বাইরে, রাস্তাঘাটে, খোলা বাতাসে এত মশা মুহূর্তে হাজির হচ্ছে যে যেকোনও সময় আপনাকে তুলে মশাদের ‘কলোনি’তে নিয়ে যেতে পারবে! বাইরে থেকে দৌড়ে ঘরে ঢুকবেন অবস্থার খুব বেশি হেরফের নেই। কয়েল জ্বালিয়ে, মশার স্প্রে মেরে মেরে ঘরের বাতাস এমন বিষাক্ত আর ভারি করে ফেলা হচ্ছে যে দম বন্ধ হয়ে নিজেই না মরে যান।

ইদানীং সবার মনেই হচ্ছে ভুল করে নিজেরাই মশার রাজ্যে চলে এসেছেন। এমন অসহায় অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডাকাডাকি শুরু হয়েছে মেয়রদ্বয়কে।

ওহ তাই তো! মেয়রের কাজই তো মশা তাড়ানো। কিন্তু এই কাজে তাদের খুব কমই তোড়জোড় দেখা যায়। যে পর্যন্ত সমালোচনা তুঙ্গে না উঠে, টকশোতে ‘বাংলা ওয়াশের’ জন্য ডাক না পড়ে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর লাইন না পড়ে সে পর্যন্ত খুব বেশি গায়ে মাখেন না তারা। মশা মারার মধ্যে কি হিরোইজম আছে বলেন তো? শুনতেও তো কেমন লাগে- মেয়র মশা মারতে গেছেন! আমাদের আসলেই বিচার বুদ্ধি কম। মাননীয় মেয়র, যাদের হাতে নাকি শহরে চাবি থাকে। ঝকঝকে তাদের অবস্থা। চকচকে থাকবে তাদের জীবন। জমি উদ্ধার, অবৈধ স্থাপনার উচ্ছেদের মতো সিনেমাটিক কাজ তারা করবেন। ‘অ্যাটাক’ বলে এত বড় দৈত্য সাইজ বুলডোজার নিয়ে মুহূর্তে গুঁড়া করবেন বাড়ি, ব্রিজ। পুরো বিষয়টার মধ্যে দারুণ অ্যাকশন আর টেনশন আছে না? পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া, মামলা, পাল্টা মামলার হুমকি। সংবাদ সম্মেলন, পাল্টা সংবাদ সম্মেলন একটা বিষয় আছে না? সেই তুলনায় মশা মারা! এক্কেবারে মানায় না। প্রতিবছর একই বিষয় নিয়ে একই অভিযোগ আমরাই তো লজ্জা করে।

কিন্তু জনগণকে বোঝায় এই সাধ্য কার? তার নিজ গালে বসে থাকা মশা মারতে মারতে শাপ শাপান্ত করছে মেয়রদের। কারণ, জনগণের স্পষ্ট মনে আছে নির্বাচনে জিতে দুই মেয়রই বলেছিলেন মশক নিধনই তাদের অন্যতম প্রধান কাজ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনে বিজয়ী ফজলে নূর তাপস বলেছিলেন এমপি পদ ছেড়ে তিনি মেয়র হতে চান। কারণ, এই শহরের মানুষ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তিনি নির্বাচনে জিতে বলেছিলেন, ‘মশক নিধন ঢাকাবাসীর মৌলিক নাগরিক সেবার মধ্যেই পড়ে। বছরে নির্দিষ্ট সময়ে নয়, এটা আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ হবে। ২৪ ঘণ্টা নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা হবে। মশকনিধন কার্যক্রমও অত্যাবশ্যকীয় সেবা, এটি দৈনিক চালানো হবে।’ ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। মেয়রের ২৪ ঘণ্টা কাজে সায় দিচ্ছে না মশককুল। তাদের বিস্তার হয়েছে পঙ্গপালের মতো।

ডিএনসিসির মেয়র পদে বিজয়ী আতিকুল ইসলাম ঢাকায় মশার উপদ্রব কমাতে আধুনিক সব দাঁতভাঙা পদ্ধতির কথা বলেছিলেন। তিনি ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট (আইভিএম) পদ্ধতি গ্রহণ করতে চান। সাথে মশা মারতে কামান নয়, তিনি চান র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম। মশার শূককীট নিধনে তিনি সবচেয়ে নজর দিতে চেয়েছেন। আর এ জন্য তিনি চেয়েছেন কীটতত্ত্ববিদ। সাথে মশার ওষুধ ভালো কী ভেজাল তা তো তিনি দেখবেনই সাথে- ওষুধ ছিটানো ঠিক হয় কিনা তাও তিনি দেখার কথা দিয়েছিলেন। এত বিশাল সব উন্নত পরিকল্পনা কোথায়? জনগণ মশা ছাড়া দেখছে না কিছুই।

তো আমরা মেয়রদ্বয়কে দেখছি না, তাদের দোষও দেখছি না। মশা মারার মতো ছোটখাটো ঘটনায় তাদের টানা ঠিক নয়। নিজেরাই নিজেদের নিরাপদ রাখতে ব্যবস্থা নিন। তারা প্রায় সময়ই বলেছেন ঘরের ভেতর মশা তো তারা মেরে আসবেন না। খুবই ন্যায্য কথা। কিন্তু সমস্যা বাইরের এত মশা। তবে সেই সমাধানও আছে। এখন বাইরে ৫ মিনিট দাঁড়ালে আপনার গায়ে ধুলার যে স্তর পড়বে তা নিয়ে বাইরে থাকুন। মশার হুল আপনার চামড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না। মাস্ক পরে কথা বলুন, করোনা আর মশা থেকে একসাথে মুক্তি। বাসায় ফিরে গোসল করে মশারি পেঁচিয়ে বসে থাকুন। ডেঙ্গু হয়ে হাসপাতাল ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত যে বেঁচে থাকবেন তা-ই কি যথেষ্ট নয়?

লেখক: সাংবাদিক

Print Friendly, PDF & Email