দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো

প্রকাশিতঃ 10:39 am | February 23, 2021

প্রভাষ আমিন :

ভেবেছিলাম সাকিবকে নিয়ে আর কিছু লিখবো না। সাকিবকে নিয়ে কিছু লিখলে আমি একটা ভুল বোঝাবুঝির শিকার হই। অনেকে ভেবে বসেন, আমি বুঝি সাকিব বিদ্বেষী। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই এমন নয়। সাকিব আল হাসান শুধু বাংলাদেশের জান নয়, আমারও জান। আমি সাকিবের একজন প্রবল অনুরাগী। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের যত ক্রিকেটার খেলেছেন, নিঃসন্দেহে সাকিব তাদের সবার সেরা। শুধু বাংলাদেশ নয়, সাকিব আসলে বিশ্বেরই অন্যতম সেরা। নিয়মিত টেস্ট খেললে সাকিবের সামনে সুযোগ আছে, সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার হওয়ারও। কিন্তু সাকিব মনে হয় সেরা অলরাউন্ডার নয়, সেরা ধনকুবের হতে চান।

পারফরম্যান্সে যেমন সাকিব সবার ওপরে, বিতর্কেও। তার বিতর্কিত কর্মকান্ডের তালিকাটা অনেক লম্বা। কখনো কখনো মনে হয়, সাকিব ইচ্ছা করেই বিতর্কে জড়ান, নিজেকে তাতিয়ে নিতে। বাংলাদেশে যেহেতু তার সমমানের আর কেউ নেই, তাই নিজেকে পুড়িয়েই ভেতরের আগুনটা জ্বালান সাকিব। সমর্থককে পেটানো, বোর্ডের কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করা, দেশের হয়ে না খেলার হুমকি দেয়া, কারণে-অকারণে ছুটি নেয়া, জুয়াড়িদের সঙ্গে যোগাযোগ, স্টেডিয়ামে এসেও টিম ফটোসেশনে অংশ না নেয়া, সিনিয়র ক্রিকেটারদের সম্পর্কে অভব্য মন্তব্য করা, বেয়াদবি করা, সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ – সাকিবের বিতর্কের তালিকা অনেক লম্বা। কিন্তু সাকিব সব বিতর্ক চাপা দেন পারফরম্যান্স দিয়ে। নানা অপরাধে সাকিবকে বিসিবি এবং আইসিসি বিভিন্ন সময়ে শাস্তিও দিয়েছে। কিন্তু শাস্তিতেও শুধরানো যায়নি। শেষ করে এসেই জড়ান নতুন বিতর্কে।

ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। কোনোভাবেই একজন খেলোয়াড় দলের চেয়ে, দেশের চেয়ে বড় হতে পারে না। সাকিবকে বোর্ডের চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের ক্রিকেটে খেলতে হবে অথবা বিদায় নিতে হবে। বারবার দুধেল গাইয়ের লাথি খেয়ে মরার চেয়ে সেই দুষ্ট গাইকে বিদায় করাই শ্রেয়। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।

সাকিব থাকা মানেই বাংলাদেশ ১২ জন নিয়ে খেলা। সাকিব একাধারে দলের সেরা ব্যাটসম্যান এবং সেরা বোলার। সাকিব না থাকলেই দল একদিকে হেলে পড়ে। সাকিবের বিকল্প হিসেবে বোলার নেয়া হবে না ব্যাটসম্যান; এই দোটানায় পরে যায় ম্যানেজমেন্ট। এ জন্যই বোর্ড সাকিবের সব অন্যায় আবদার, অত্যাচার, শৃঙ্খলাহীনতা মেনে নিতে বাধ্য হয়। কথায় বলে না, দুধেল গাইয়ের লাথিও ভালো। কিন্তু সমস্যাটা হলো লাথি খেতে খেতে বোর্ডের এখন কাহিল দশা।

সাকিবের একেকটি বিতর্ক ছাড়িয়ে যায় আগের বিতর্ককে। মনে হয়, এরচেয়ে বড় বোধহয় আর কিছু নয়। বিতর্কের তালিকা করলে, কোনটার চেয়ে কোনটা বড় এই নিয়ে দ্বিধায় পড়তে হয়। জুয়াড়িদের সাথে যোগাযোগের কারণে একবছরের নিষেধাজ্ঞার পর এবারের বিতর্কটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য আমার বিবেচনায় সাকিবের সবচেয়ে বড় অপরাধ, মাঠে এসেও বিশ্বকাপের টিম ফটোসেশনে অংশ না নেয়া। এই না নেয়াতে দলের প্রতি, সতীর্থ খেলোয়াড়দের প্রতি যে অবমাননা, অবজ্ঞা; তা বাকি সবার জন্য অপমানজনক। সাকিব বুঝিয়ে দিয়েছেন, তার পাশে ফটোসেশনে দাঁড়ানোর মত যোগ্য কেউ নেই।

ক্রিকেট একটি টিম গেম। কিন্তু এবার সাকিব আগের সব বিতর্ককে ছাপিয়ে গেছেন। কারণ সাকিব এবার দেশকে নিলামে তুলে দিয়েছেন। সাকিব জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি শ্রীলঙ্কা সফরে টেস্ট খেলতে যাবেন না। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর শুনুন বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা প্রধান আকরাম খানের কাছে, ‘সাকিব এই মুহূর্তে টি–টোয়েন্টি খেলতে চায়। টেস্ট খেলতে চায় না। আইপিএলের জন্য ছুটি চেয়েছে সে। আমরাও মনে করি কেউ খেলতে না চাইলে তাকে জোর করে খেলিয়ে লাভ নেই। তাই সাকিবকে ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড।’ আকরাম খান শুধু বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বোর্ডের প্রধান নন, বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়কও। তার একটি ইনিংসের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে আজকের বাংলাদেশের ক্রিকেট। সেই আকরামের কণ্ঠে এমন অসহায়ত্ব বোর্ডের অসহায়ত্বেরই প্রকাশ। আকরামের কথা শুনে মনে হচ্ছে, সাকিব রীতিমত ব্ল্যাকমেইল করছে বোর্ডকে। খেলবো না, জোর করলে- খারাপ করে খেলবো। এ যেন ছেলেমানুষের গোয়ার্তুমি। বোর্ডের বেতনভূক্ত একজন খেলোয়াড় কি চাইলেই এভাবে যখন তখন ইচ্ছামত ছুটি চাইতে পারেন, চাইলেই পেতে পারেন?

এর আগে মুস্তাফিজ আইপিএল খেলার জন্য ছুটি চেয়ে পাননি। সাকিবের সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশ ক্রিকেটে সর্বজনশ্রদ্ধেয় জালাল আহমেদ চৌধুরী লিখেছেন, ‘মিরাজ যদি এমন আবদার করতো, তাহলে বিসিবি প্রধান তাকে দুটি থাপ্পর দিতেন।’ তবে সাকিবকে থাপ্পর দেয়ার সাধ্য কারো নেই, উল্টো ঝুঁকি আছে থাপ্পর খাওয়ার। তাই সবাই নিজের মান-সম্মান বাঁচাতে সাকিবকে ছুটি দিয়ে দিয়েছেন। সাকিবকে আসলে সবাই ভয় পান। সাকিব যে বাজে উদাহরণ তৈরি করলেন, এখন বোর্ড কোন মুখে অন্য খেলোয়াড়দের আটকাবে? পত্রিকায় দেখলাম, মুস্তাফিজ চাইলে তাকেও ছুটি দেয়া হবে। না দিয়ে কোনো উপায় নেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটাররাও জাতীয় দল বাদ দিয়ে ইচ্ছামত ফ্যাঞ্চাইজি খেলে বেড়ায়। দলে কোনো শৃঙ্খলা নেই বলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট সূর্য আজ অস্তগামী। সাকিবও বাংলাদেশ ক্রিকেটে শৃঙ্খলা বাঁধটা ভেঙ্গে দিলেন। এই বাঁধ আবার কবে মেরামত করা যাবে, কে জানে।
দেশের হয়ে খেলার ব্যাপারে সাকিবের অনীহা অনেক পুরোনো। এর আগে একবার ক্যারিবীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগে খেলতে না দিলে দেশের হয়ে না খেলার হুমকি দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের সময়ও ছুটি নিয়েছিলেন সাকিব। সেবারও বোর্ড তাকে ছুটি দিতে চায়নি। অনেক দেন-দরবারের পর বোর্ড বলেছিল, সাকিবের জন্য দরজা খোলা; চাইলে যখন ইচ্ছা তখন দলের সাথে যোগ দিতে পারবে। একটা ছেলে দিনের পর দিন ক্রিকেট খেলছে। তারও বিশ্রামের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু যখন দেখি, বাংলাদেশে যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় নাকানি-চুবানি খাচ্ছে, সাকিব তখন নির্বাচনী ক্যাম্পেইন বা শেয়ারবাজারের পক্ষে বক্তৃতা দিয়ে বেরাচ্ছেন; তখন দেশের জন্য, সাকিবের জন্য প্রবল আবেগ বুকে নিয়ে বসে থাকা আমাদের বুক ভেঙ্গে যায়। সেবারেরটা তবু বিশ্রামের অজুহাত ছিল। কিন্তু এবার সাকিব স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলবেন না, খেলবেন আইপিএল’এ কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে!

সাকিব একজন পেশাদার খেলোয়াড়। অনেকে বলছেন, সাকিবের পছন্দ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা আছে। আর ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ার যেহেতু লম্বা নয়, তাই ভবিষ্যতের নিশ্চিন্তির জন্য অর্থটা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হতেই পারে। সেটা দোষের কিছু নয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা পেশাদার হচ্ছেন, এটা ভালো। কিন্তু পেশা হিসেবে ক্রিকেট আর দশটা পেশার মত নয়। একজন ক্রিকেটার চাইলেই, তার পছন্দ বেছে নিতে পারবেন না। তাকে বোর্ডের নিয়ম মেনে চলতে হবে। টাকাটা অবশ্যই দরকার। কিন্তু সেটা যখন দেশের চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখন সেটা মানা যায় না, মানা উচিত নয়। অর্থ সবারই দরকার। কিন্তু সাকিবের আর কত অর্থ দরকার?

অনেকে ক্রিকেটের সাথে আবেগ-দেশপ্রেম না মেলানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন, ক্রিকেটকে যে আপনি এত ভালোবাসেন, সে তো দেশপ্রেমের জন্যই। সাকিব যে আজ এত বড় তারকা, সে তো আমাদের বাঁধভাঙ্গা আবেগের জন্যই। সেই আবেগের মূল্য ক্রিকেটারদের দিতেই হবে। সাকিবকে যে আমরা জান দিয়ে ভালোবাসি, সেটা কেবল তিনি ভালো খেলেন বলেই নয়, তিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলেন বলে। বিরাট কোহলীও তো অনেক ভালো ক্রিকেটার। কিন্তু আমি তো তার সাফল্যে গলা ফাটাই না। কলকাতা নাইট রাইডার্সে সাকিব যত ভালোই খেলুক, আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। আমি চাই সাকিব বাংলাদেশের হয়ে ভালো খেলুক। তার ভালোত্ব যেন বাংলাদেশকে মহিমান্বিত করে। গাইয়ের দুধটা পাবে নাইট রাইডার্স, আর লাথিটা খাবে বাংলাদেশ; এটা হতে পারে না।

সাকিব টেস্ট খেলতে চান না, এটা পুরোনো কথা। সাকিবকে টেস্ট খেলতে বাধ্য করতে তাকে দলের অধিনায়ক বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। তখন বোর্ডের মনে ছিল, নেতৃত্ব হয়তো তাকে দায়িত্বশীল করবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় বোর্ডের সে কৌশল কাজে লাগেনি। আমার ধারণা অধিনায়কত্বের প্রলোভনও তাকে বাঁধতে পারতো না।

সাকিব বাংলাদেশের জন্য অনেক করেছেন। কিন্তু আমি মনে করি, বাংলাদেশ ক্রিকেটের আজকের দুর্দশার জন্য সাকিব দায়ী। সাকিবের জন্যই বোর্ড ক্রিকেটারদের জন্য কোনো শৃঙ্খলাবিধি কার্যকর করতে পারছে না। সাকিবকে নিয়ে বিসিবি জটিল সমস্যায় পড়েছে। প্রবল জনপ্রিয়তার কারণে তারা সাকিবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। আমার ধারণা বোর্ড এখন দিন গুণছে, কবে সাকিব অবসর নেবেন এবং তারা ক্রিকেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনবেন।

সাকিব অসাধারণ পারফরমার, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই পারফরম্যান্স বাংলাদেশকে কতটুকু এগুতে পেরেছে। গত বিশ্বকাপে সাকিবের প্রায় ম্যান অব দ্যা টুর্নামেন্টের মত পারফরম্যান্সও তো বাংলাদেশকে বেশিদূর নিতে পারেনি। বাংলাদেশ যে এখন আফগানিস্তানেরও পেছনে, তা কি ঠেকাতে পেরেছেন সাকিব? তাই বোর্ডের এখন সময় এসেছে কঠোর হওয়ার। সময় আসলে অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তবে এখনই কঠোর না হলে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে দীর্ঘমেয়াদে ভুগতে হবে। সাকিবের ইচ্ছার পুতুল হওয়া নয়, বোর্ডকে এখন সাকিব তথা গোটা দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সবার জন্য সমান নিয়ম, সমান শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। কোনোভাবেই একজন খেলোয়াড় দলের চেয়ে, দেশের চেয়ে বড় হতে পারে না। সাকিবকে বোর্ডের চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের ক্রিকেটে খেলতে হবে অথবা বিদায় নিতে হবে। বারবার দুধেল গাইয়ের লাথি খেয়ে মরার চেয়ে সেই দুষ্ট গাইকে বিদায় করাই শ্রেয়। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ

Print Friendly, PDF & Email