মত প্রকাশের সাহস কি আছে?

প্রকাশিতঃ 9:55 am | February 20, 2021

প্রভাষ আমিন:

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বইমেলা থেকে বেরিয়ে শাহবাগের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। তারা জানতেনই না দুর্বৃত্তরা তাদের কয়েক দিন ধরেই অনুসরণ করছে। সেদিন সুযোগ পেয়েই হামলা করেছে এবং হত্যা করেছে। স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছেন অভিজিতের স্ত্রী বন্যাও। হামলাকারীদের সঙ্গে অভিজিতের কোনও ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। হামলাটা আসলে ব্যক্তি অভিজিতের ওপর ছিল না। হামলাটা ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞান চিন্তা আর যুক্তির ওপর। আর অভিজিৎ শুধু একা নন; ২০১৩ সাল থেকে পরের তিন বছরের ৯ জন লেখক, প্রকাশক, ব্লগার, মানবাধিকার কর্মী জীবন দিয়েছেন।

৬ বছর পর অভিজিৎ ও দীপন হত্যা মামলার রায় হয়েছে। দায়ী জঙ্গিদের ফাঁসির দণ্ড হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়, জঙ্গি দমনে এ রায় নিশ্চয়ই বড় অবদান রাখবে। কিন্তু আমাদের আসলে সমস্যার মূলে নজর দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতায় জঙ্গিরা এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয় বা নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু জঙ্গিবাদ বা জঙ্গিদের চিন্তার বিস্তার ঘটেছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। জঙ্গিবাদের শিকড় উপড়াতে না পারলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার আকাঙ্ক্ষা অধরাই থেকে যাবে।

অভিজিৎ হত্যা মামলার রায়ের সময় অভিযুক্তরা আদালতে নির্ভার ছিল, নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেছে। যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়েছে। ফাঁসির দণ্ডেও তারা অসন্তুষ্ট নন। তাদের মগজ তো এভাবেই ধোলাই হয়েছে, এ পৃথিবী নশ্বর। যেহেতু ‘নাস্তিক’দের হত্যা করেছে, তাই পরকালে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে অনন্ত সুখ। তাই জাগতিক ফাঁসিতে তাদের কিছুই যায় আসে না। ফাঁসির দণ্ড পাওয়ার পরও তাদের মুখে হাসি, হাতে বিজয়ের চিহ্ন। কারণ, তাদের লক্ষ্য অনেকটাই সফল হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ছিল সব মানুষের, সব ধর্মের। কিন্তু এখন আস্তে আস্তে অনেক কিছুই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ বা সংকুচিত। বাঙালি সংস্কৃতি এখন অনেকটাই অবগুণ্ঠনে ঢাকা। পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ন্ত্রিত, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হওয়া চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে যাত্রা, গান, পালাগান অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। বাউল শিল্পীরা কারাভোগ করছেন। জনপ্রতিনিধিরা গান নিষিদ্ধ করে দিচ্ছেন। কিন্তু অবাধ বিস্তার ঘটেছে ওয়াজের। ওয়াজ নিয়ে আমার কোনও আপত্তি নেই।

ছেলেবেলায় আমরা যাত্রা, বাউল গান যেমন শুনেছি; মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়ে ওয়াজও শুনেছি। এখনও সময় পেলে ইউটিউবে ওয়াজ শুনি। কিন্তু ইদানীং কিছু কিছু ওয়াজের নামে যা শুনি, তাতে একজন মুসলমান হিসেবে লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায়। কিছু কিছু ওয়াজ অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক, নারীবিদ্বেষী, অশ্লীলতায় ভরপুর। এসব ওয়াজের সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। ওয়াজের যে বিস্তার এবং সাধারণ মানুষের ওপর ধর্মের যে প্রভাব, সব ওয়াজে যদি ইসলামের সত্যিকারের শান্তির বাণী, সব ধর্মের ও মতের প্রতি সহিষ্ণুতার বাণী প্রচার করা হতো; বাংলাদেশ হতে পারতো বিশ্বের সবচেয়ে শান্তির দেশ। কিন্তু হয় উল্টো। অনেক ওয়াজে কিছু বক্তার বক্তব্য মানেই যেন ভিন্ন ধর্মের প্রতি, ভিন্ন মতের প্রতি ঘৃণা। শুধু কথার ঘৃণা নয়, সহিংসতার উসকানি। কারও মতপ্রকাশ রুদ্ধ করার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তৈরি। কিন্তু ধর্মের অপব্যাখ্যা দেওয়া এসব হুজুরদের ব্যাপারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নীরব।

ধর্ম মানুষের জীবনকে গড়ে দেবে, মানবিক করবে, সহনশীল করবে, জীবনে শৃঙ্খলা আনবে, উন্নত মূল্যবোধ শেখাবে। কিন্তু বাংলাদেশে অনেকের কাছে ধর্ম মানেই যেন উন্মাদনা, ধর্ম মানেই যেন সহিংসতা। আমি সবসময় বলি, জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়েরও বড় ভূমিকা আছে। মানুষের বিবেকে, মানুষের চিন্তায় আলো জ্বালতে হবে। কারণ, সেখানে স্থায়ী অন্ধকার করে রেখেছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। চিন্তায় আলো জ্বালতে চাই সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা, যেটা এখন অনেকটাই অবরুদ্ধ। জাতীয় পাঠ্যক্রমে ধর্মের আসল বাণী তুলে ধরে সহনশীলতা শিক্ষা দেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের পাঠ্যক্রম এখন বদলে যায় হেফাজতের দাবি মেনে। আমাদের যা করার কথা, আমরা করছি তার উল্টোটা।

ফাঁসির পরও জঙ্গিদের উৎফুল্ল হয়ে ‘ভি’ চিহ্ন দেখানোর কারণটা জানেন? কারণ, তাদের সত্যিই ‘বিজয়’ হয়েছে। ২০১৫ সালে লেখক অভিজিৎ রায় এবং প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জঙ্গিরা ভয়ের সংস্কৃতিটা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। আপনারা একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, ২০১৫ সালের পর থেকে মত প্রকাশে, বই প্রকাশে, মুক্তচিন্তায় অলিখিত সেন্সর আরোপ করা হয়েছে। অভিজিতের বই এখন আর সহজলভ্য নয়। শুধু অভিজিৎ নয়, মুক্তচিন্তার বই এখন আর কেউ প্রকাশ করে না। এত সাবধানতার পরও প্রতিবছরই বই নিষিদ্ধ হয়, বই প্রত্যাহার করা হয়। বই মেলা এলেই বাংলা একাডেমি ‘ধার্মিক’ হয়ে যায়, পুলিশ ‘সম্পাদক’ হয়ে যায়। মুক্তচিন্তা রুদ্ধ বলেই বটতলার বই এখন সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের মর্যাদা পেয়ে যায়। এটাই তো চেয়েছিল জঙ্গিরা। এক অভিজিৎকে হত্যা করে হাজার অভিজিতের মুখ বন্ধ করা গেছে, এটা অবশ্যই তাদের বিজয়। তারা ‘‘ভি’’ চিহ্ন দেখাবে না তো কারা দেখাবে?

তারপরও দীপন এবং অভিজিৎ হত্যা মামলার রায় দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুই মামলায় ১৩ জঙ্গির ফাঁসির রায় হয়েছে। তারচেয়ে বড় কথা হলো, দুটি রায়ের পর্যবেক্ষণেই সমস্যার মূলে নজর দেওয়া হয়েছে। দীপন হত্যার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, এ মামলার আসামিদের লক্ষ্য ছিল ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকদের হত্যা করে মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া এবং মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা। আর এসব কিছুর উদ্দেশ্য হলো মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ করে দেওয়া। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ধ্বংস করে দেওয়া। যারা বই প্রকাশের দায়ে মানুষ হত্যা করতে পারে, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। অভিজিৎ হত্যা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশের জন্য অভিজিৎ রায়কে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যার উদ্দেশ্য হলো জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ এবং নিরুৎসাহিত করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশ না করতে পার ।’ পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, ‘আসামিরা বেঁচে থাকলে আনসার আল ইসলামের বিচারের বাইরে থাকা সদস্যরা একই অপরাধ করতে উৎসাহী হবে এবং বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্তমনা লেখকেরা স্বাধীনভাবে লিখতে ও মতামত প্রকাশ করতে সাহস পাবেন না।’ আদালত আরও বলেছেন, মুক্তচিন্তা এবং মত প্রকাশে সাহস দিতেই এ রায়। কিন্তু মত প্রকাশের সাহস কি আমাদের আছে?

আদালত আসল সমস্যাটা চিহ্নিত করতে পেরেছেন। এখন আমাদের সরকার বুঝলেই হয়। তবে সব দায় সরকারকে দিয়ে বসে থাকলেই হবে না। আমাদের সাহসের সঙ্গে অপশক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে। তারা যে ভয়ের বার্তা ছড়াতে চেয়েছে, তা জয় করতে হবে সাহস দিয়ে। অপরাধী জঙ্গিদের ফাঁসি দিতে হবে। নির্মূল করতে হবে জঙ্গিবাদকেও।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Print Friendly, PDF & Email