বারবার কেন ‘টার্গেট’ সেনাপ্রধান জেনারেল ড.আজিজ আহমেদ?

প্রকাশিতঃ 9:11 pm | February 16, 2021

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর:

ইউটিউব এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কত বেশুমার অপপ্রচার। আলজাজিরার তথ্য-প্রমাণহীন পূর্ণ মিথ্যাচারের চিত্রায়ণের মনগড়া মতলবি এক প্রতিবেদন। মিথ্যাকে রঙ মেখে নানাভাবে গোয়েবলসীয় কায়দায় এনে তাকে কেবল বিতর্কিত করাই নয় মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা বাঙালি জাতির শ্বাশ্বত গর্ব ও আস্থার প্রতীক সেনাবাহিনীকে নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির অপচেষ্টা হয়েছে দেদারসে, গোপনে-প্রকাশ্যে। এতোসব বিকৃতি দেখতে দেখতে দেশের সাধারণ মানুষও এখন চরম ত্যক্ত-বিরক্ত।

একের পর এক জঘন্য মিথ্যাচার, অপপ্রচার আর আষাঢ়ে গল্পের বাক্যবাণে কখনও সুইডেন, কখনও যুক্তরাজ্য আবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নির্বাসিত পোষ্যদের ‘টার্গেট’ হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.আজিজ আহমেদ। দীর্ঘ কন্টকাকীর্ণ পথে ষড়যন্ত্রের কুহেলী জাল ভেদ করে ৭১’র সুমহান চেতনা, গভীর দেশপ্রেম, সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব আর দৃঢ় মনোবলের মাধ্যমে কর্তব্যপরায়ণতার সারি সারি চিত্রপট রচনা করে আলোর পথে দুর্বার গতিতেই এগিয়ে চলা সুসংহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে অসীম সাহসকিতায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

‘প্রোপাগান্ডা ঝড়’র মুখোমুখি হয়েও বিকশিত বৃক্ষের মতোই অটল থেকেছেন। সর্বাঙ্গ রুধির মেখে সব মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সত্য প্রতিষ্ঠায় নিরন্তর লড়াই করেছেন। নীতি এবং নৈতিকতার মানদন্ডে নিজেকে যুগোত্তীর্ণ করেছেন।

আলোচিত অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকান্ডের পর সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছেন নিজের মেধা ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তে। দৃপ্ত কন্ঠে বারংবার সরকারের প্রতি সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ আনুগত্যের কথা জানিয়েছেন। সরকারের আদেশে যে কোন দায়িত্ব পালনে পূর্ণ প্রস্তুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ফলত স্বাধীনতা বিরোধী চিহ্নিত চক্রের নিশানা হয়েছেন বারবার।

মঙ্গলবার(১৬ ফেব্রুয়ারি) আর্মি এভিয়েশন গ্রুপের হ্যাঙ্গারে এভিয়েশন বেসিক কোর্স-১১’র গ্র্যাজুয়েশন সমাপনী ও ফ্লাইং ব্রেভেট প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড. আজিজ আহমেদ। আলোকচিত্র : আইএসপিআর

কিন্তু কখনও আহত পাখির মতোন আর্তনাদ করেননি বা একবিন্দুও দমে যাননি সেনাপ্রধান। কারও দয়ার দানে নয়, বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে বিজয়ের অর্ধশতকের ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে উন্নত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় গৌরবময় সহযাত্রী করেছেন দেশপ্রেমিক নিজ বাহিনীকে। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে জেনারেল ড.আজিজ আহমেদ বাঙালি জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশিত পথে নিজের নেতৃত্বের মুন্সীয়ানায় দেশ বিরোধী প্রতিটি ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের যবনিকাপাত ঘটিয়ে ছেড়েছেন। অবিচল থেকেছেন দেশপ্রেমের স্বাতন্ত্রিকতায়।

অপরাজনীতি, ভোটে লজ্জাজনক পরাজয় বা নির্বাচনী ট্রেন বর্জন এবং প্রতিরোধের নামে একটি রাজনৈতিক দল নিজেরাই নিজেদের কোমর ভেঙে ঘরে ও জেলে ঢুকে ‘ওয়াকওভার’ দিয়েছেন অথচ দোষ চাপিয়েছেন সেনাপ্রধানের কাঁধে! যুক্তরাষ্ট্র সফরে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে জেনারেল আজিজ আহমেদের উষ্ণ বন্ধুত্ব ও জাতিসংঘের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে তিনি নিজের বাগ্মীতায় ও মেধার জ্যোতিতে বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঐতিহাসিক হৃদ্যতায় কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও অর্থবহ ও ফলপ্রসু করে তুলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সদিচ্ছায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নিয়ে সামরিক কূটনীতিতে বিশ্বের প্রভাবশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গে মর্যাদার সঙ্গেই আলোচনায় তিনি যখন অভূতপূর্ব দক্ষতা ও চমকের মাধ্যমে বিশ্বপরিমন্ডলেও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় মেলে ধরেন তখন ‘কোন কিছুই ভালো লাগে না’ রোগে আক্রান্তদের হাজার কোটি টাকার ফিল্মি প্রজেক্ট ভেস্তে যাওয়া স্বাভাবিকই বটে!

মঙ্গলবার(১৬ ফেব্রুয়ারি) সেনাপ্রধান আর্মি এভিয়েশন গ্রুপের হ্যাঙ্গারে এভিয়েশন বেসিক কোর্স-১১’র গ্র্যাজুয়েশন সমাপনী ও ফ্লাইং ব্রেভেট প্রদান অনুষ্ঠানে নবীন সেনা বৈমানিকদের ফ্লাইং ব্রেভেট পরিয়ে দেন। আলোকচিত্র : আইএসপিআর

দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর উজ্জ্বল ভাবমূর্তি, বিবৃতি বিভ্রান্তির স্রোতে তীরহারা সেই রাজনৈতিক দলের ভাড়াটে প্রোপাগান্ডা স্কোয়াডের ঘৃণ্য উল্লাসের অবগাহনের ভেতরও নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন থেকেছেন সেনাপ্রধান। নিজের ব্যক্তিগত কাজে সরকারি প্রটোকল ব্যবহারের চেনা সংস্কৃতিকেও বর্জন করেছেন। প্রশিক্ষিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ডকে কার্যকর বিজয়ের সোনালী তোরণে উদ্ভাসিত করেছেন এই চার তারকা জেনারেল।

বজ্রকঠিন উচ্চারণে অপপ্রচারকে ঘৃণাভরেই প্রত্যাখ্যান
একাত্তরের পরাজিত শক্তির চরম ঔদ্ধত্য ও স্পর্ধায় প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয়ে পাকিদের হটানো নিজেদের পূর্ব পুরুষদের রক্তিমতায় সেনাপ্রধান উষ্ণ শোণিত করেছেন নিজের বজ্রকঠিন উচ্চারণে। কাতারভিত্তিক বিতর্কিত গণমাধ্যম ‘অল দ্যা প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ শিরোনামের অসৎ প্রচারণা বা ইউটিউবে এক শ্রেণির নির্বাসিত অর্বাচীন ও দেশদ্রোহী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের গোয়ার্তুমী ভরপুর নির্লজ্জ মিথ্যাচারকে ঘৃণাভরেই প্রত্যাখ্যান করেছেন জেনারেল ড.আজিজ আহমেদ।

মঙ্গলবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আর্মি এভিয়েশন গ্রুপ আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘ডোন্ট প্লে উইথ আর্মড ফোর্সেস’।

সেনাপ্রধানের তাৎপর্যপূর্ণ জবাব, কার্যকর চেইন অব কমান্ড
‘বারবার কেন সেনাপ্রধানকে টার্গেট করা হয়’ একটি টিভি চ্যানেলের সংবাদকর্মীর এমন প্রশ্নের উত্তর সেনাপ্রধান দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আপনারা বুঝে নেন, খুঁজে নেন কেন বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধানকে টার্গেট করা হচ্ছে। কারণ এই সেনাপ্রধানকে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। সেনাপ্রধানকে হেয় প্রতিপন্ন করা মানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা। আমি সম্পূর্ণভাবে সচেতন যে আমার কারণে কখনো আমার প্রতিষ্ঠান যেন বিব্রত বা বিতর্কিত না হয়।’

শীতের জীর্ণতা সরিয়ে প্রভাতী সূর্যের আলোয় ঝিকমিকিয়ে উঠা সজীব সকালে আর্মি এভিয়েশনের বিশালাকার কক্ষটিতে সেনাপ্রধান জেনারেল ড.আজিজ আহমেদ গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে তাৎপর্যপূর্ণ উত্তরে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতোই প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়েছেন দেশপ্রেমিক নিজ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের রক্তে, শাণিত করেছেন তাদের চেতনাকে।

এক প্রশ্নের জবাবে জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি প্রতিষ্ঠান যেটা জাতির গর্ব, দেশের গর্ব, এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। যাতে করে একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। আমি আপনাদের স্পষ্ট করে বলতে চাই, সেনাবাহিনী অত্যন্ত প্রশিক্ষিত এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা বাহিনী। আগের থেকে অনেক বেশি সুসংহত। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড অত্যন্ত কার্যকর এবং সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য ঘৃণাভরে এই ধরনের অপচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে অতীতে, এখনো করছে এবং বর্তমানে যা হচ্ছে তাকেও ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছে।’

সেনাবাহিনীতে এই ধরনের অপপ্রচার বিন্দুমাত্র আঁচ লাগতে দেবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের চেইন অব কমান্ডের যারা আছে তারা সবাই এই ব্যাপারে সতর্ক আছি। সেনাবাহিনী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং বাংলাদেশে সরকারের প্রতি অনুগত। বাংলাদেশ সরকারের সকল ধরনের আদেশ ও নির্দেশ পালনে সেনাবাহিনী সদা প্রস্তুত এবং বাংলাদেশের সেটা অভ্যন্তরীণ হোক, বর্হিবিশ্বের হোক যেকোন হুমকি মোকাবিলার জন্য আমরা সাংবিধানিকভাবে ঐক্যবদ্ধ।’

নিজ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আল জাজিরার বানোয়াট মিথ্যাচারের প্রতিবেদনের বিষয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমার ভাইদের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালানো হয়েছে সেটা স্পষ্ট ব্যাখা দেওয়া আছে। এছাড়া আমার পরিবারের পক্ষ থেকে খুব শিগগির সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে। তবে আমি সেনাপ্রধান হিসেবে বলতে পারি, সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি, আমার অবস্থা, আমার দায়িত্ব সম্পর্কে আমি সচেতন। কি করলে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হতে পারে, খর্ব হতে পারে সে সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ অবগত।’

আলজাজিরার অসৎ উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদনের বিষয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান বলেন, ‘আল জাজিরা যেটা দিয়েছে সেটা সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যে দিয়েছে। কারণ সেদিন আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোন মামলা ছিল না, কোন সাজা ছিল না। তার আগেই যে মামলাটা ছিল সেটা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।’

বিভিন্ন দেশে চিত্রধারণ বিষয়ে জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধান হিসেবে অফিসিয়ালভাবে যে দেশে যাবো সেই দেশ আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সেখানে আমার অতিরিক্ত নিরাপত্তা নেওয়ার প্রয়োজন আমি মনে করি না। কিন্তু যখন আমি কোথাও ব্যক্তিগত ভ্রমণে থাকি সে সময় অফিসিয়াল কোন প্রটোকল ব্যবহার করাকে আমি কখনো সমীচীন মনে করি না। সেক্ষেত্রে সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা অসৎ উদ্দেশ্যে এটা করেছে।’

তিনি বলেন, ‘আপনারা যা কিছু শুনছেন তারা এগুলো বিভিন্ন জায়গা থেকে কাটপিস এবং অন্যান্য জিনিস যোগ করে করেছে। কিন্তু তাতে এদের কোন উদ্দেশ্য হাসিল হবে না। এটা আপনারা সাংবাদিকরা আপনাদের কলম দিয়ে সঠিক জবাব দিয়ে দিয়েছেন। এজন্য আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email