করোনার ভ্যাকসিন এবং একুশের প্রত্যাশা

প্রকাশিতঃ 10:14 am | January 09, 2021

ড. মো. হাসিনুর রহমান খানঃ

নতুন স্বাভাবিক জীবন বা ইংরেজিতে নিউ নর্মাল লাইফ কথাটির সাথে অনেকেই পরিচিত । এই ২০২১ বছরটি কি আমাদের নতুন স্বাভাবিক জীবনে আবারও ফিরে আসার বছর? স্বাভাবিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র কি স্বরুপে ফিরে আসবে? এমনকি করোনা দমনের ফলপ্রসূ ভ্যাকসিন পূর্ণ দমে সবার নিকট প্রয়োগ করা হলেও আমরা কি এ বছরের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবো? এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যেকের কামনা বা প্রত্যাশার পারদ একই বিন্দুতে আছে যা অনুমান করা যায় সহজেই ।

কিন্তু করোনাকালে বিগত দিনগুলিতে প্রাপ্তির খাতায় তাকালে প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির দৃশ্যমান ব্যবধান পাওয়া যায় । যা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ব্যাপারে আমাদের কাছে এক ধরনের শঙ্কা অথবা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় । ফলে এ বছরেও কি পুরোনো সব শঙ্কা বিদ্যমান থাকবে? নাকি কমবে? না কি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উঠানামা করবে? স্বল্প বা দীর্ঘ কথায় এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া অত্যন্ত কঠিন । প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত না থাকায় এসবের অনুমেয় উত্তরের সাথে বাস্তবতার তফাৎ থাকাটা স্বাভাবিক । বছর শেষে হয়তো যৌক্তিক ভাবে তা দেখাও দেবে ।

এটাকে মেনেই আমার ব্যক্তিগত মতামত হল, আগামী এক বছরের মধ্যে করোনা মহামারির ছোবল থেকে কিছু কিছু দেশ ও জাতি রক্ষা পেলেও করোনার প্রাদুর্ভাব একেবারে নির্মূল করা সম্ভব হবে না । ফলে করোনা মহামারির অবসান মানেই করোনার অবসান নয় । অধিকাংশ দেশে তা মহামারি আকারে থেকে যেতে পারে ক্ষুদ্র বা মাঝারি পরিসরে । এমনকি চলমান করোনার ভ্যাকসিনের সফলতা বিদ্যমান থাকলেও এটা ঘটতে পারে । এর কারণ হল অধিকাংশ দেশই প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন এ বছরের মধ্যে সংগ্রহ এবং তা প্রয়োগ করতে পারবে না । এছাড়াও অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন আসতে পুরো বছর লেগে যেতে পারে । ক্ষেত্র বিশেষে বিভিন্ন দেশে এই জনগোষ্ঠীর হার মোট জনসংখ্যার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ হয়ে থাকে । কিছু কিছু দেশ এই গোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতার বাইরে রেখেও হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করার মাধ্যমে তাই মহামারির হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে । কিন্তু অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে এটা করে দেখা সম্ভব হবে না ।

কিছু কিছু দেশে গত বছরের ডিসেম্বরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা শুরু হয় । ইতি মধ্যে কয়েকটি দেশ বেশ ভালোভাবে ভ্যাক্সিনেশনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে । সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ইসরাইল মোট জনসংখ্যার ১২%, বাহরাইন ৮%, যুক্তরাজ্য ২%, যুক্তরাষ্ট্র ১%, ডেনমার্ক ও চীন এক শতাংশের কম লোককে ভ্যাকসিন দিতে পেরেছে । আবার যে সমস্ত দেশ ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও উৎপাদনে ভূমিকা রেখেছে তারাই অনেকটা পিছিয়ে । জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য ।

গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ২২ মিলিয়ন ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে তা ২.২ মিলিয়ন হয়েছে । অন্যদিকে জার্মানি কেবল মাত্র ২ লক্ষ লোককে ভ্যাকসিন নিতে পেরেছে । ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলিতে ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে পরে শুরু হলেও অনেক দেশ তা এগিয়ে নিতে দৃশ্যমান সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে । সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা, অগ্রাধিকার জনগোষ্ঠীর কাছে ভ্যাকসিন পৌঁছানোর সমস্যা বিশেষ করে করোনা মহামারির কারণে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি বলবদ থাকায় ।

এছাড়া ভ্যাকসিন গ্রহণে অনীহা ভবিষ্যতে ওইসব দেশগুলিতে ভ্যাকসিনেশনের অন্যতম অন্তরায় হিসেবে দেখা দিবে । ইতিমধ্যে ইপসওস গ্লোবাল এডভাইসর কর্তৃক ১৫ টি দেশের উপর চালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে ভ্যাকসিন গ্রহণের ব্যাপক অনীহার চিত্র পাওয়া গেছে । ফ্রান্সের মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষ এই ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী, যুক্তরাজ্যে সেটা ৭৭%, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৯% এবং চীনে ৮০% । ফলে এবছর অনেক উন্নত দেশে করোনা মহামারীর অবসানে ভ্যাকসিন গ্রহণের অনীহা ভ্যাকসিনেশনের নিরব প্রতিবন্ধকতা হিসাবে দেখা দিবে । তাছাড়াও ভ্যাকসিন এর প্রকৃত কার্যকারিতার মাত্রার উপর নির্ভর করে মহামারী কত দ্রুত প্রস্থান করবে । যেটি জানার জন্য আমাদেরকে হয়তো আরো ১ বা ২ বছর অপেক্ষা করতে হবে ।

ভারত ও আশা করছে এ বছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রায় ৩০ কোটি লোককে ভ্যাকসিন দিতে পারবে । শোনা যাচ্ছে যে বাংলাদেশেও সেই সময়ের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি লোককে ভ্যাকসিন দিতে পারবে । যার মাধ্যমে হয়তো আমরা মহামারীকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবো এ বছরের মধ্যে । স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবার আপ্রাণ চেষ্টাও করব । দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড এবং জীবনবোধের মানচিত্র হয়তো অনেকটা নতুনভাবে আঁকতে হবে । যার সূচনা ইতিমধ্যে হয়তো হয়েছে বিশেষ করে শহুরে জীবনের ক্ষেত্রে । ব্যবহারিক জীবনেও মাস্ক পরা, শারীরিক এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করা বা হাতকে জীবাণু থেকে দূরে রাখা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণু মুক্ত বজায় রাখা, দূরশিক্ষণ ও অনলাইন যোগাযোগ বজায় রাখা, কৃত্রিমতার সংস্পর্শ অতিমাত্রায় বজায় রাখা ইত্যাদির মাধ্যমে ।

করোনা মহামারির অবসান হোক বা না হোক আমাদের প্রত্যাশা থাকবে সবকিছু যেন আগের মত চলে । কিন্ডার গার্ডেন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সকল পাঠদান, পরীক্ষা শ্রেণিকক্ষে চলে । জমে থাকা সকল পাবলিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয় । মাঠে ঘাটে খেলাধুলা চলে, শিক্ষার্থীদের মেধা মনন সৃজনশীলতার স্বাভাবিক বিকাশ ঘটে । করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর অজানা শঙ্কা ও আতঙ্কের ভূত হতে আমরা যেন সবাই মুক্তি পাই, বিশেষ করে পঞ্চাশোর্ধ মানুষেরা এবং যাদের অন্যান্য রোগ বালাইয়ের ইতিহাস আছে । আমাদের প্রত্যাশা থাকবে শিশুর অপুষ্টি, শিশু মৃত্যু ও প্রসূতি জনিত মাতৃমৃত্যু, পারিবারিক ও সামাজিক ব্যভিচার, বিবাহ বিচ্ছেদের হার, দারিদ্র্যের বিশেষ করে প্রান্তিক দারিদ্র্যের হার ও চাকুরিচ্যুতির হার, মানসিক রোগের হার কমবে ।

উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশ গমন, চাকুরিপ্রাপ্তি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সাথে যুক্ত ব্যবসায়ীদের আবারও জেগে উঠা, বৃহৎ শিল্পের ক্রমবর্ধমান বিকাশ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক কর্মকান্ড ফিরে পাওয়া, প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধি, যেকোনো রোগের স্বাভাবিক চিকিৎসার সেবা বৃদ্ধি, ডাক্তারদের সরাসরি সাক্ষাৎ পাওয়া, হাসপাতাল ও ক্লিনিক গুলিতে বিনা বাধায় চিকিৎসা পাওয়া, চিত্তবিনোদন ও পর্যটন শিল্পের স্বাভাবিক কর্মকান্ড ফিরে পাওয়া, দেশ ও বিদেশে সিম্পোজিয়াম ও কনফারেন্সে অবাধে গমন ও যোগদান, অবাধে সমস্ত খেলাধুলা চলা ও তা উপভোগ করার পরিবেশ, বিয়ে-শাদী ও চিত্র শিল্পকলাসহ অন্যান্য ধর্মীয়, সংস্কৃতি ও সামাজিক জন-জমায়েত মূলক অনুষ্ঠানের পরিবেশ ফিরে পাওয়ার আশা করি ।

রাষ্ট্রীয় ভাবে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধকল কাটিয়ে উঠা, সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই স্বাভাবিক ভাবে চলা, চলমান মেগা প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া, জনশক্তিকে আবারও আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া, চাকরীচ্যুত প্রবাসীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকুরি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান করে বিদেশে পাঠানো, ক্ষতিগ্রস্ত ও বঞ্চিত সকল স্টেকহোল্ডারদেরকে আর্থিক ব্যবসায়িক ও সরকারি বিশেষ সুযোগ সুবিধার মধ্যে রাখা, প্রাথমিক মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা পদ্ধতিকে ঢেলে সাজানো বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ের শিক্ষাব্যবস্থা ও করোনাকালীন পূর্ব শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে । সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেওয়ার নিমিত্তে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর প্রত্যাশা থাকবে ।

এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত এবং ভবিষ্যতে উদ্ভাবিত সকল করোনার ভ্যাকসিন এর কার্যকারিতা যেন বজায় থাকে । ভ্যাকসিন এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া যেন কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে । অপ্রাপ্তবয়স্ক ও প্রসূতি মায়েদের জন্যও যেন দ্রুত ভ্যাকসিন উদ্ভাবিত হয় । বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশ যেন তাদের প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন পেতে পারে । অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাক্সিনেশন এর যে পরিকল্পনা তা যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় । যথাযথ টেস্টের মাধ্যমে করোনা রোগীদের চিহ্নিতকরণসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সেবা যেন নিশ্চিত হয় । করোনা নিয়ন্ত্রণে যেন আইসোলেশন এবং কোয়ারেন্টাইন এর ভূমিকাকে বড় করে দেখা হয় । সর্বোপরি স্বাস্থ্য খাতে অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিসহ যে দুর্বলতা ধরা পড়েছে তা থেকে যেন ক্রমশ কাটিয়ে উঠতে পারি এই কামনাই থাকবে ।

করোনাকালীন সময়ে আমরা গুণীজন, গুরুজন, কবি সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তি, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, আমলা, ডাক্তার, সেবিকা, পুলিশসহ অনেক মানুষকে হারিয়েছি । আমরা আর কাউকে হারাতে চাইনা । ভয়াল করোনা যেন আর কারো প্রাণ কেড়ে না নেয়, কাউকে পঙ্গু না করে দেয়, কোন ব্যক্তি বা পরিবারকে নিঃস্ব ও অভিভাবকহীন না করে, কোন নারীকে বিধবা না করে, কোন সন্তানকে এতিম না করে । কোন প্রতিষ্ঠানকে, সংগঠনকে বা সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল না করে দেয় । করোনার দুঃসময়ে মানুষ যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে অন্যকে সাহায্য সহযোগিতা করার মাধ্যমে তা যেন ভবিষ্যতে যে কোন দুর্যোগকালীন সময়ে বজায় থাকে এই প্রত্যাশাই করি ।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ফলিত পরিসংখ্যান, আই এস আর টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সভাপতি, আই এস আর টি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন নির্বাহী কমিটি।

Print Friendly, PDF & Email