৮ বছর কোমায়, চাকরির শেষ দিনে কর্নেল হলেন তাছাওয়ার

প্রকাশিতঃ 8:08 pm | October 15, 2020

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যান কোমায়। এরপর টানা ৮ বছর যাবত ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন। হাত-পা নাড়াতে পারলেও গভীর কোমায় আচ্ছন্ন তিনি।

কিন্তু ঘড়ির কাঁটা যে থেমে নেই। প্রতিটি মুহুর্তে জীবন থেকে একটি একটি করে সেকেন্ড, মিনিট আর ঘন্টা হারিয়ে গেছে।

ভাগ্যের নির্মমতায় জীবনকে সাফল্যে রাঙানোর অজুত সম্ভাবনার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছানো হয়নি। হাসপাতালের শয্যায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে চাকরি জীবনের শেষ দিনে এসে পৌঁছলেন।

বিদায় লগ্নে বিরল এক সম্মান পেলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা।

গত সোমবার (১২ অক্টোবর) তাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদ থেকে কর্নেল হিসেবে পদোন্নতির সম্মানে ভূষিত করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনন্য এ মানবিক দৃষ্টান্তের খবর দূর থেকে কাছের মানুষের কাছেও এসেছে খুশির খবর হয়ে।

সেনাপ্রধানের মহানুভবতার এ সম্মানে আপ্লুত কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার জীবন সঙ্গী মোসলেহা মনিরা রাজাও।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কালের আলো’র সঙ্গে আলাপে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

বলেছেন, ‘আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি মাননীয় সেনাপ্রধান আমার স্বামীকে এমন সম্মান দিবেন। এ সম্মানে আমরা গর্বিত। বিদায়বেলায় প্রত্যাশার চেয়ে এটি অনেক বড় এক অর্জন।’

মোসলেহা মনিরা রাজা কথা বলছিলেন আর চোখের কোণে চিকচিক করছিল অশ্রুবিন্দু। আপ্লুত কন্ঠে তাঁর উচ্চারণ-‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে এ বিদায় আমাদের জন্য সুখকর হয়েছে।

আমি আশাবাদী একদিন আমার স্বামী সুস্থ হয়ে উঠবেন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। তিনি নিজেও তাঁর সম্মান ও মর্যাদার কথা অনুধাবন করতে পারবেন। সেই অপেক্ষাই এখন আমাদের।’

পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা মরমি কবি হাছন রাজার প্রোপুত্র। ১৯৮৯ সালের ২৩ জুন তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাজোয়া বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।

দীর্ঘ চাকরি জীবনে ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অধীন ইরাক-কুয়েত ও ২০০৭ সালে সুদানে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করেন। প্রায় অর্ধ শতাধিক দেশ ঘুরার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

চাকরি জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও লেখালেখিতে হাত পাঁকিয়েছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। কবি হাছন রাজার জীবন ও কর্ম নিয়ে হাছন রাজা সমগ্র, মেজর জেনারেল এম এ জি ওসমানিকে নিয়ে ‘ও জেনারেল মাই জেনারেল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসসহ একাধিক বই লিখেছেন তিনি।

কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার জীবন সঙ্গী মোসলেহা মনিরা রাজা কালের আলোকে জানান, তাঁর স্বামী সর্বশেষ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হিস্ট্রি প্রজেক্টে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে কর্মরত ছিলেন। ২০১৩ এর ১১ মার্চ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনি ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি হন।

চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় সেদিন সন্ধ্যায় তিনি হার্ট অ্যাটাক করেন। ওই বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরে মে মাসে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনরায় সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। এরপর দীর্ঘ ৮ বছর যাবত তিনি কোমায় রয়েছেন।

সিএমএইচের চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁর স্ত্রী আরও বলেন, ‘সিএমএইচে যখন যে ধরণের সাপোর্ট চেয়েছি আল্লাহর রহমতে পেয়েছি। প্রায় ৮ বছর যাবত এক কঠিন সংগ্রাম করে চলেছি।

তিন সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বলেই সব রকমের সহযোগিতা আমরা পেয়েছি। অন্য কোথাও হলে সম্ভবত এরকমের সুযোগ সুবিধা পেতাম না।’

সিএমএইচের আইসিইউ প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ মজুমদার জানান, ‘কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার এ অসুস্থতাকে চিকিৎসার ভাষায় বলা হয় হাইপোস্কিক স্মিমিক ইনজুরি টু ব্রেইন ইফেক্টস।

আমাদের হার্ট বন্ধ হয়ে ব্রেইন সার্কুলেশন বন্ধ হয়ে গেলে ৫ মিনিটের মধ্যে ব্রেইনের সেলগুলোতে চেঞ্জ আসতে থাকে। হার্টের মধ্যে ইফেক্ট পড়ে ৭ থেকে ১৫ মিনিটের মাথায়।

ওর (দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা) হার্ট ফিরে এসেছে, ব্রেইন ফিরে আসেনি। পুরো প্রক্রিয়ার সময় তাঁর ব্রেইনে সার্কুলেশন ৫ মিনিটের অতিরিক্ত ছিল কিন্তু ১৫ মিনিটের কম ছিল। এজন্য ওর ব্রেইনের নিচের অংশ ভালো।

কিন্তু বাইরের যে অংশগুলো আমাদের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে জড়িত সেই এরিয়ার সেলগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়নি। এজন্য জীবন চালানোর জন্য বেসিক বডির প্রটেকটিভ সিস্টেম ভালো থাকলেও হাইয়ার সাইকোলজিক্যাল ফাংশনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email