মৃতদের স্বজনদের আর্তনাদে ভারী বার্ন ইনস্টিটিউটের বাতাস

প্রকাশিতঃ 6:40 am | March 01, 2024

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

রাজধানীর বেইলি রোডের ভবনে লাগা আগুনে দগ্ধ ও মৃত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে আনতে ছুটছে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স৷ শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আসছে একের পর এক ধোঁয়ায় দগ্ধ অচেতন ব্যক্তি ও মরদেহ। আর জরুরি বিভাগের প্রবেশমুখে আর্তনাদ করছেন তাদের স্বজনরা।

ছেলে শিফনকে (২০) হারিয়ে বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে আর্তনাদ করেছিলেন বাবা ফজর আলী (৪৬)। জরুরি বিভাগের ফ্লোরে বসে শুক্রবার ভোররাতে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘৩৫ দিন আগে আমি আমার মাকে হারিয়েছি। আজ হারালাম ছোট ছেলেকে। আহারে আমার চোখের মণি, আমার কলিজা চোখের সামনে মরে গেলো। আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচবো।’

ছেলে কীভাবে এ ঘটনার শিকার হয়েছেন, জানতে চাইলে ফজর আলী বলেন, ‘অভাবের সংসারে ছোট ছেলে সংসার চালাতে টুকটাক কাজ করতো। আমার ছেলে ওখানে গেছে গ্যাসের কাজ করতে, না হলে কাজের টাকা আনতে।’

বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে স্ট্রেচার ও বেডের ওপরে ছিল তানজিনা নওরিন (৩৫), লুৎফর নাহার লাকি (৫০), আলিশা (১৩), নাহিয়ান আমিনসহ (১৯) কমপক্ষে দশ জনের লাশ। নাহিয়ানের মরদেহকে জড়িয়ে ধরে আহাজারি করছিলেন তার এক স্বজন। কান্নারত অবস্থায় চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আল্লাহ গো, তুমি আমার ছেলেরে না নিয়ে আমারে নিয়া যাইতা। এখন আমি কারে বাবা বলে ডাকমু।’

মেয়ে আলিশাকে (১৩) হারিয়ে প্রায় জ্ঞান হারানোর অবস্থা বাবা-মা দুজনেরই। ‘আলিশা’ ‘আলিশা’ বলে চিৎকার করতে করতে জরুরি বিভাগের সামনে লুটিয়ে পড়েন তারা। একই পরিবারের তিন জনের (দুই বোন ও এক চাচাতো বোন) মরদেহ শনাক্ত করতে এসেছিলেন পরিবারের আরেক সদস্য শামীম।

জরুরি বিভাগের সামনে এমন অসংখ্য স্বজনকে আহাজারি করতে দেখা যায়। কারও ছেলে, কারও ভাই, কারও বোনের লাশের সন্ধানে এসেছেন তারা। কেউ বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে ঢাকা মেডিক্যালে দৌড়ে আসছেন, আবার কেউ বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে ঢাকা মেডিক্যালে দৌড়ে আসছেন স্বজনদের খোঁজ করতে। তাদের মধ্যে একজন বাসনা। মেয়ে ও নাতি নাতনিসহ পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে রাস্তায় আর্তনাদ করেছিলেন।

বাসনা আহাজারি করে তিনি বলেন, ‘আমার নাতনি আদ্রিতা (১২) ও নাতি সানের (৭) রেস্টুরেন্টে খাওয়ার বায়নায় সন্ধ্যায় শান্তিবাগের বাসা থেকে বের হয় মেয়ে পপি (৩০)। বেইলি রোডের গ্রিন কজিকট শপিংমলের এক রেস্তরাঁয় খেতে গিয়ে তারা সবাই লাশ হয়েছে। আল্লাহ গো, আমার সব শেষ হয়ে গেলো।’

এদিকে, রাত ১টার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, মূলত ভবনটির দোতলায় আগুন লাগে। ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিল না। সাততলা বিশিষ্ট ভবনটির উপরে চিলেকোঠা ছিল। ভবনটি নিরাপদ ছিল না।

বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে ভবনের দ্বিতীয় তলায় ‘কাচ্চি ভাই’ নামে একটি রেস্তোরাঁয় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিটের চেষ্টায় রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

এ ঘটনায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মারা গেছেন ১০ জন। এ ছাড়া ভর্তি রয়েছেন আরও অনেকে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে আরও ৩৩ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে কয়জন নারী, পুরুষ কিংবা শিশু তা এখনও জানার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া চিকিৎসাধীন রয়েছেন অনেকেই। অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। রাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন এসব তথ্য জানিয়েছেন।

কালের আলো/ডিএস/এমএম

Print Friendly, PDF & Email