পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘ঔদার্য্য’ ও একটি ‘সত্যকথন’

প্রকাশিতঃ 9:09 pm | January 22, 2023

বিশেষ ভাষ্যকার, কালের আলো:

ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়ায় পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পেশাদার কূটনীতিক মো. তৌহিদুল ইসলামকে নিয়োগের প্রস্তাব করেছিল। অস্ট্রিয়ার ইউরোপিয়ান এবং আন্তর্জাতিক অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রীর কাছে এ নিয়ে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। কিন্তু তৌহিদুল ইসলামকে গ্রহণ করেনি দেশটি। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পারদ চড়েছে। চুপ থাকেননি মন্ত্রীও।

গণমাধ্যমের প্রশ্নে সরাসরি জবাব দিয়েছেন। ভনিতা বা কৌশলের পথে না হেঁটে সরলতার উপমায় ড. একে আব্দুল মোমেন সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমি যতদিন আছি, আই উইল ডিফেন্ড হিম।’ রাখঢাক না করেই সামনে এনেছেন, প্রতারণার আশ্রয় নিয়েই তৌহিদুলকে ঘায়েলের অপচেষ্টা হয়েছে। এই অপতৎপরতায় যে তৌহিদুলের সহকর্মীরা রয়েছেন সেটিও খোলাসা করেছেন। মন্ত্রীর এমন নরম-গরম বক্তব্যে অনেকেরই মুখ বেজার হয়েছে। নেতিবাচক মন্তব্যেও কেউ কেউ মাঠ গরমের ইশারা ইঙ্গিত করেছেন।

কিন্তু একজন মন্ত্রী হিসেবে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘অভিভাবক’ হিসেবে শীতল রক্তের প্রাণীর মতো শীতঘুমে তলিয়ে না গিয়ে, প্রকৃত বাস্তবতাকে আড়াল না করে একজন ঝানু কূটনীতিকের পক্ষেই শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে ড. একে আব্দুল মোমেন আবারও প্রমাণ করেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি সাহসী উচ্চকন্ঠ এবং নৈতিক দৃঢ়তায় অনবদ্য। ভেকধারী কোন রাজনীতিক না হয়ে একজন কূটনীতিকের চরিত্র আর ক্যারিয়ার ধ্বংসের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ‘অভিভাবক’ হয়ে তিনি পাশে দাঁড়াতে পারেন। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার দৃঢ়তায় ইতিহাস তাকে ঠিকই প্রকৃত নেতার মর্যাদা দেবে এমনটি মনে করছেন কূটনীতিক বিশ্লেষকরা।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৩ সালে। তখন ইতালির মিলানে কনসাল জেনারেল হিসেবে কর্মরত মো. তৌহিদুল ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে সেই সময়। সেখানে এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করার অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগ আমলে নেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত হয়। তাতে তার অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া বা গুটিকয়েক গণমাধ্যমে কূটনীতিক তৌহিদুল ইসলামের পিন্ডি চটকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

সেদিন কী বলেছেন মন্ত্রী?
শনিবার (২১ জানুয়ারি) সকালে সিলেট শহরতলির চাঁনপুর খেয়াঘাট এলাকায় সুরমা নদীর খননকাজ উদ্বোধনের পর গণমাধ্যমের প্রশ্নে বিস্তৃত পরিসরে এসব নিয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন।

কূটনীতিক তৌহিদ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সারা দেশে একটা চরিত্রের প্রচলন ঘটেছে। আমরা খালি মানুষকে নিচে নামানোর জন্য উঠেপড়ে লাগি। কিছু মানুষের চরিত্রই হচ্ছে অন্যের ভালো না চাওয়া। আর আমাদের মিডিয়াও ওই লাইনেই আছে। ওপরে ওঠানোর চেষ্টা কেউ করে না, শুধু নামানোর চেষ্টা করে।’

কূটনীতিক মো. তৌহিদুল ইসলামকে অস্ট্রিয়া সরকার রাষ্ট্রদূত হিসেবে গ্রহণ না করার পেছনে তাঁর মন্ত্রণালয়ের সহকর্মীরা জড়িত থাকলেও তিনি আজীবন তাঁরই পক্ষ অবলম্বন করে যাবেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।কূটনীতিক মো. তৌহিদুল ইসলামের ব্যাপক প্রশংসা করে সেদিন মন্ত্রী আরও বলেন, ‘তিনি ভেরি গুড অফিসার এবং তুখোড় ছেলে।’

তৌহিদুল ইসলামকে নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে সে (তৌহিদুল) আমাদের অ্যাম্বাসেডর ইন সিঙ্গাপুর। তাকে আমরা ভিয়েনাতে দিতে চাই। সে যখন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পরীক্ষা দেয়, তখন সারা বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম হয়। তারপরে সে তার ব্যাচের ফার্স্ট বয় ছিল। অত্যন্ত ভালো, তুখোড় ছেলে। এখন ওরে টেনে কীভাবে নামানো যায়, তার জন্য মন্ত্রণালয়ের লোকজন, তারই বন্ধুবান্ধবেরা কন্টিনিউয়াসলি চেষ্টা করে।’

মন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশ চারটা বড় বড়, ইউএনতে (জাতিসংঘ) চারটা বড় রিকগনিশন নেয়। একটা হচ্ছে শান্তি ও সংস্কৃতি। আর দুটো বড়, একটা হচ্ছে অটিজমের ওপর এবং আরেকটি হচ্ছে মানুষের ক্ষমতায়ন। এই দুটোতে এই ছেলে (তৌহিদুল) প্রথম কাউন্সিলর ছিল ইউএনে এবং সে অসম্ভব তুখোড় ছেলে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু তার (তৌহিদুল) শত্রু আছে। শত্রু ওখানে গিয়ে, সে যখন মিলানে কনসাল জেনারেল ছিল, কনসাল জেনারেল থাকা অবস্থায় কোনো একটা মেয়েকে তার পেছনে লাগিয়ে দেয়। লাগিয়ে দিয়ে একটা কেলেঙ্কারির চেষ্টা করে। তখন তাকে উইথড্র করা হয়, সাসপেন্ড করা হয়, অনেক ইনভেস্টিগেশন করা হয়, সরকারের অনেক টাকা, আপনাদের টাকা খরচ করা হয়। পরে দেখা যায় একেবারে বানোয়াট। তারপর তার প্রমোশন হয়, তারপর অ্যাম্বাসেডর হয়। এখন তার বিরুদ্ধে আবার লাগছে একদল। তারই বন্ধুবান্ধব হবে। আর না হয় পত্রিকায় এগুলো গেল কীভাবে? হি ইজ অ্যা ভেরি গুড অফিসার। আমি যতদিন আছি, আই উইল ডিফেন্ড হিম।’

সত্যের পক্ষে লড়াই সহজ নয় মোটেও
বিরূপ অবস্থায় সত্যের পক্ষে লড়াই করা সহজ নয় মোটেও। সঙ্কুল পরিস্থিতিতেও অনেকেই অনড় থাকতে পারেন না। ভাঁড়ামি ও ভণ্ডামি দ্বারা আকণ্ঠ নিমজ্জিতরা অন্যায়ের পক্ষে দালালির মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ালেও উত্তরণের দিকনির্দেশনা পেতে এমনও কেউ থাকেন যারা বিপদ ও আতঙ্কের চোরা স্রোত উপেক্ষা করে অন্যায়কারীদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে সত্যকথনকে সঙ্গী করতে পারেন। তেমনই একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। অস্ট্রিয়ার ফেডারেল মিনিস্টার ফর ইউরোপিয়ান অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স আলেকজাণ্ডার সলেনবার্গকে লেখা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চিঠিকে যারা নজিরবিহীন ও অস্বাভাবিক বলছেন তাদের জন্য ড. মোমেনের সিলেটের বক্তব্য ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচনের পাশাপাশি তাদের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কটূক্তি ও বক্রোক্তিতে যে সময়ে শালীনতা, ভদ্রতা ও ভব্যতার সীমা অতিক্রম করে সেখানেও একজন বিনয়ী ও দূরদর্শী চিন্তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.একে আব্দুল মোমেনের বক্তব্য কূটনীতিতে বরাবরই শুভবার্তার ইঙ্গিত দিয়েছে।

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email