একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তানও হতে চায় বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ 2:48 pm | December 16, 2022

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

বেশিদিন আগের কথা নয়। পাকিস্তানের ‘দ্য নেশন’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কলামের শিরোনাম ছিল ‘দ্য বাংলাদেশ মডেল’। পাকিস্তানের টকশোর পরিচিত মুখ উন্নয়ন পরামর্শক জাইঘাম খান নিজের কলামে পাকিস্তানকে বাংলাদেশ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। দেশটির টেলিভিশনের টকশোতেও হয় বিস্তর আলোচনা। বলা হয়, পাকিস্তানের সামনে শেখার জন্য উদাহরণ হিসেবে যে কয়েকটি দেশ আছে, তার প্রধান হলো বাংলাদেশ। দাবি ওঠে পাকিস্তানকে বাংলাদেশের মতো বানানোর। রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে যে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেল, সেই দেশকে এখন ‘রোল মডেল’ ভাবছে পাকিস্তানের মানুষ।

মূলত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের নির্যাতন, বঞ্চনা ও অবহেলার কারণে বাঙালি জাতির চির আরাধ্য পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ। ওই সময়ে বাংলাদেশ থেকে সম্পদ নিয়ে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের চেয়ে অর্থনীতিতে অনেক এগিয়ে ছিল পাকিস্তান। কিন্তু ৫১ বছরের মাথায় বাংলাদেশের অর্থনীতির চেয়ে অনেক পিছিয়ে পাকিস্তান।

বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় আগামী বছর পাকিস্তানের দ্বিগুণ ২ হাজার ৭২০ ডলার হবে। অন্যদিকে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৩০ ডলার হবে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে লন্ডন ভিত্তিক গণমাধ্যম ‘দি ইকোনমিস্ট’।

দি ইকোনমিস্টের ‘দি ওয়ার্ল্ড এহেড ২০২৩’ প্রতিবেদনের প্রক্ষেপণে বলা হয়, আগামী বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যা পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে চারটি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়, যা প্রতিটি দেশের ওপর প্রভাব রাখবে। সেগুলো হচ্ছে, চলমান সংঘাতের প্রভাব, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার প্রচেষ্টা, জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা এবং চীনের অনিশ্চিত অগ্রযাত্রা।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ ২০টিরও বেশি দেশের সূচকের ওপর প্রক্ষেপণ দেওয়া হয়। বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির দিক থেকে বাংলাদেশ কিছুটা চাপে থাকবে এবং মূল্যবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে চীনে মূল্যস্ফীতি হবে ২ দশমিক ৯ শতাংশ, ভারতে ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে আগামী বছর বাজেট ঘাটতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বাংলাদেশে। প্রথা অনুযায়ী ৫ শতাংশ পর্যন্ত এই হার সহনীয় বলে ধরা হয়। অন্যদিকে চীনের বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ৪ দশমিক ২ শতাংশ, ভারতের ৬ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

এদিকে ইকোনমিস্টের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইউরোপের প্রতিটি বড় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হবে। এর মধ্যে রাশিয়ার নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং জার্মানির শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ।

এশিয়ার প্রায় প্রতিটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে। বড় অর্থনীতি ভারত ৫ শতাংশ, চীন ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৪ দশমিক ১ শতাংশ, জাপান শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ এবং সৌদি আরব ৩ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়বে আগামী বছর। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী বছর তেলের ব্যারেল হবে ৮৭ ডলার, যা বর্তমানে ১০০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

অথচ মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পশ্চিম পাকিস্তানিরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, বাংলাদেশ কখনই অর্থনৈতিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না এবং তারা ফিরে আসবে পাকিস্তানের মানচিত্রে। তবে পাকিস্তানিদেরই একটা অংশ মনে করত ওই পরাজয় থেকে শিক্ষা নেবে পাকিস্তান। অন্তত সব নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটেনি। বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে বলে মনে করেন দেশটির বিখ্যাত পরমাণু পদার্থবিদ হুদভয়। বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য তুলে ধরে ডন-এর সম্পাদকীয়তে বলা হয়, বাংলাদেশ কোনো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্বর্গরাজ্য নয়। শূন্য অবস্থান থেকে নিজেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। এখন তো কোনো কোনো অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশকে এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক পরাশক্তি বলে মনে করেন।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছরে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে। ২০২৩ সাল নাগাদ শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৬তম হবে। আর ২০২৮ সাল নাগাদ ২৭তম অবস্থানে চলে আসবে বাংলাদেশ। ২০৩৩ সাল নাগাদ এই অবস্থান হবে ২৪ তম।

মাস কয়েক আগে পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা ‘ডেইলি টাইমস’ ও ‘উইকলি ফ্রাইডে টাইমস’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। পাকিস্তানের পাঞ্জাবের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক ড. মালিকা-ই- আবিদা খাত্তাক তার নিবন্ধে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থা, দূরদর্শিতা এবং সাহসী সিদ্বান্তের ভূয়সী প্রসংশা করেছেন।

‘বাংলাদেশে পদ্মা সেতুর গল্প: একটি সেতুর চেয়ে বড়?’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি পদ্মা সেতু নির্মাণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ উত্থাপন করেন।

কালের আলো/ডিএস/এমএম

Print Friendly, PDF & Email