অর্থনীতি, উন্নয়ন, সংকট: গুজব এবং সুশীলদের গোঁজামিল দেওয়া অপব্যাখ্যা

প্রকাশিতঃ 10:49 am | November 14, 2022

মোহাম্মদ এ. আরাফাত:

(১) আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়, রফতানি আয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ – সব অর্থনৈতিক সূচকগুলো ঊর্ধ্বমুখী ছিল। করোনা মহামারির প্রকোপে ২০২০-২১ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কমলেও পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ থেকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেশি ছিল।

(২) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:
(ক) বর্তমানে বিশ্বের ৪৬টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় রয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে এই তালিকায় ছিল বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে প্রথম, কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যত উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশের অনুমোদন পায়।

জাতিসংঘ আওয়ামী লীগের চেহারা দেখে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের অনুমোদন দেয়নি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম বৈঠকের ৪০তম প্লেনারি সভায় এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা ইউএন-সিডিপির ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পায় বাংলাদেশ।

জাতিসংঘ (সিডিপি) তিনটি সূচকের ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করে। তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ শর্ত পূরণ করে অনেক এগিয়ে গেছে।

উন্নয়নশীল দেশ হতে গেলে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১৮২৭ ডলার।

মানবসম্পদ সূচকে উন্নয়নশীল দেশ হতে গেলে ৬৬ পয়েন্টের প্রয়োজন; বাংলাদেশের পয়েন্ট ২০২০ সালে ছিল ৭৫.৩।

অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে কোনও দেশের পয়েন্ট ৩৬-এর বেশি হলে সেই দেশকে এলডিসিভুক্ত রাখা হয়, ৩২-এ আসার পর উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন হয়।

(খ) জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত নবম বার্ষিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পূর্ণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে Crown Jewel (মুকুট মণি) হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই অধিবেশনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাক্স বলেন,
“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সঙ্গে একসাথে হতে পেরে আমরা আনন্দে উদ্বেলিত। আমরা আপনার কথা শুনতে চাই, বিশেষ করে এই জন্য যে আমরা যখন পৃথিবীর দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি বিশ্লেষণ করি তখন আমরা দেখেছি, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অগ্রগতিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছে। তাই আমরা সেই অর্জনের জন্য আপনাকে অভিনন্দন জানাতে চাই।”

জেফ্রি স্যাক্স দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদগণের একজন এবং একজন বিশিষ্ট উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, যিনি দুই দশক ধরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন এবং বর্তমানে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। এই ভদ্রলোক আওয়ামী লীগের চেহারা দেখে বাংলাদেশের উন্নয়নে শেখ হাসিনার অর্জনের প্রশংসা করেননি নিশ্চয়ই।

(৩) বর্তমান বাস্তবতা:
গত দুই বছর ধরে, উন্নত, অনুন্নত, স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিটি দেশ করোনা মহামারি পরবর্তী বাস্তবতা এবং ইউক্রেন- রাশিয়া যুদ্ধের কারণে গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার সম্মেলনে বলা হয়, ২০২২ ও ২০২৩ সালে বিশ্ব এক ভয়াবহ আর্থিক মন্দার কিনারায় রয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়, বিশ্ব অর্থনীতি এখন প্রবল ঢেউয়ের বুকে থাকা তরীর মতো দুলছে। গত ৩ বছরে একটার পর একটা আঘাত এসেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। যার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে দ্রব্যমূল্য, বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম।

(৪) অথচ, একদল ‘গুজববাজ’ এবং কিছু ধান্দাবাজ সুশীল বলার চেষ্টা করছে করোনা মহামারি বা ইউক্রেন- রাশিয়া যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের কোনও সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, গোটা দুনিয়ার সব দেশের অর্থনৈতিক সংকটের পিছনে ‘করোনা মহামারি’ ও ‘যুদ্ধ’ কারণ হলেও শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা নয়।

(৫) এই ‘গুজববাজ’ এবং ‘ধান্দাবাজ সুশীল’ গোষ্ঠী এখন মূলধারার গণমাধ্যমেও তাদের সস্তা ও গোঁজামিল দেওয়া অপব্যাখ্যা তুলে ধরছে। এরা শুধু জানে ছিদ্রান্বেষণ আর অপপ্রচার করতে। এদের কাছে কোনও সমস্যার সমাধান নেই। এরা পদ্মা সেতু নিয়েও বিভিন্ন গুজব ছড়িয়েছিল এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল এই সেতু নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশ বানাতে পারবে না। কিন্তু এদের সব অপপ্রচার ও ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণ করে পদ্মা সেতু হয়েছে। এদের কাছ থেকে জনগণকে সাবধান থাকতে হবে।

(৬) করোনা সংকট যেমন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা সফলভাবে মোকাবিলা করেছি, বর্তমান সংকটও শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আমরা মোকাবিলা করবো।

(৭) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনও   ‘গুজববাজ’, ধান্দাবাজ সুশীল বা কোনও ভাঁড় ইউটিউবার বা রাজনীতিবিদ হতে চেষ্টায় থাকা কোনও ক্লাউন দেশের মানুষকে বাঁচাতে আসবে না।

লেখক: চেয়ারম্যান, সুচিন্তা ফাউন্ডেশন

Print Friendly, PDF & Email