নতুন ডিএমপি কমিশনারের ‘রোডম্যাপ’, অভিজ্ঞতার পানসিতে ভবিষ্যতের স্বপ্নযাত্রা

প্রকাশিতঃ 9:32 pm | October 31, 2022

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো:

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে হিসেব কষলে কেটে গেছে ৩২ বছর। দীর্ঘ সময়ে ভারী হয়েছে স্মৃতির মলাট। কিন্তু পেশাদারিত্ব, সততা ও দক্ষতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেই রাজধানীর ৩৫ তম পুলিশ প্রধান হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন। রাজধানীর মিন্টু রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সোমবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়েই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নতুন কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক, বিপিএম(বার), পিপিএম উপস্থাপন করেছেন নিজের ‘রোডম্যাপ’।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেভাগে গরম হয়ে উঠছে রাজনীতির মাঠ। শান্তিপূর্ণ কোন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা নয় বলে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। সহিংসতা না করলে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুলিশের সহযোগিতা মিলবে এমন কথাও দৃঢ়তার সঙ্গেই উচ্চারণ করেছেন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ডিএমপি কমিশনার।

জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। থানাকে সেবার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে চান। জানিয়েছেন সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে থানাগুলোকে মনিটরিং করার পদক্ষেপের কথা। এক্ষেত্রে তিনি নিজের পূর্বসূরীদের গণমুখী পদক্ষেপকে দীপ্যমান করেছেন। নিজ বাহিনীতে কেউ অপরাধ করলে শাস্তি অনিবার্য, জানিয়ে দিয়েছেন মোটা দাগেই।

প্রতিটি থানার ওসিরা শুক্রবার মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে নিজের কন্ঠে আহ্বান জানাবেন নির্বিঘ্নে থানায় আসার। বলবেন থানায় সেবা নিতে কোন টাকার প্রয়োজন নেই। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নের পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে নতুন নতুন কৌশল গ্রহণের প্রত্যয়দীপ্ত অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে নতুন ডিএমপি কমিশনারের মুখে। জনবান্ধব পুলিশ হিসেবে গড়ে তোলার চলমান কার্যক্রমসমূহ বন্ধ না করে এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

নিজের দীর্ঘ ৩২ বছরের বর্ণাঢ্য চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতার পানসিতে চড়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নযাত্রার আলোকোজ্জ্বল অভিযাত্রায় সমর্পণ করেছেন নতুন ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক। জনমুখী পুলিশি সেবা দ্রুত নিশ্চিতকরণ, সমকালীন অপরাধের ধরন ও গতিপথ বিবেচনা করে বিশেষ করে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণসহ ডিএমপিকে নগরবাসীর আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত করতে তিনি সর্বোচ্চ প্রয়াস গ্রহণ করতে চান।

আইনের শাসন নিশ্চিত ও উন্নয়ন টেকসই করতে সততা, গভীর দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব ও অসীম সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার গুডবুকে ঠাঁই করে নিয়েছেন গৌরবোজ্জ্বল কর্মজীবনের অধিকারী ১২ তম বিসিএস ব্যাচের এই অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রথম ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দ্যুতিদীপ্ত ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের উত্তরাধিকার বাংলাদেশ পুলিশ। অসীম সাহসিকতা, বীরত্ব ও আত্মত্যাগের ব্রত হৃদয়ে ধারণ করে সেবার মহান ব্রত নিয়ে কাজ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ডিএমপির ৪৭ বছরের গৌরবময় পথচলার ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করবো। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গতিশীল রাখতে ৩২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা, মেধা এবং প্রচেষ্টার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করে রাষ্ট্র, সংবিধান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব, সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারাবদ্ধ।’

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেবে না পুলিশ
এক গণমাধ্যমকর্মীর প্রশ্নের জবাবে নিবন্ধিত দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে পুলিশ কোনো বাধা দেবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক। তিনি বলেন, ‘রাজনীতির নামে কেউ ফৌজদারি অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেবে।’

এ সময় ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘মিছিল-মিটিং রাজনৈতিক দলের অধিকার। নিবন্ধিত দলের এই ধরনের কর্মসূচি পালনে কোনো বাধা দেওয়া হবে না। তবে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে জ্বালাও পোড়াও বা বিশৃঙ্খলা মেনে নেওয়া হবে না। এগুলো ফৌজদারি অপরাধ। ধারা অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

থানা হবে সেবার কেন্দ্রবিন্দু
ডিএমপিকে কল্যাণ-গণমুখী ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান ডিএমপি কমিশনার। এক্ষেত্রে তিনি প্রথমেই থানাকে সেবার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রূপ দিতে চান। এ প্রসঙ্গে রাজধানীর নতুন পুলিশপ্রধান বলেন, ‘থানাকে আমরা গণমুখী ও সেবামুখী করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছি। এগুলো ঠিকভাবে চলছে কিনা বা জনমানুষ সঠিকভাবে সেবা পাচ্ছে কিনা সে বিষয়টি আমরা মনিটরিং করছি।’

‘সাধারণ মানুষ সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে প্রথমে থানায় যায়। তাঁরা পুলিশ কমিশনার বা এসপির কাছে যায় না। বেশ কয়েক বছর আমাদের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশরা থানাকে গণমুখী ও সেবামুখী করার নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন’ যোগ করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) প্রতি সপ্তাহে জুম্মার নামাজ আদায় করতে মসজিদে যাবেন এবং তারা সেখানে একটি বক্তব্য দেবেন। তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেবেন, থানায় সেবা গ্রহণে কোন টাকা লাগে না।’

ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘থানায় সেবার মান বাড়াতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। দায়ের করা জিডি ও মামলা কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। থানায় সেবাপ্রার্থীদের সাথে কেউ খারাপ আচরণ করলে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেক থানায় আমরা সিসিটিভি স্থাপন করেছি যাতে থানার সেবার মান মনিটরিং করা যায়।’

নগরবাসীর পাশে থাকবে ডিএমপি
গণমাধ্যমের সঙ্গে একীভূত হয়ে কাজ করার নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘পুলিশ ও সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে যথেষ্ট মিল রয়েছে। উভয়ে সত্যের সন্ধানে এবং কল্যাণার্থে কাজ করে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য এবং সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে দেশ সেবায় সকলে একত্রে কাজ করবো।

তিনি নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘টিম ডিএমপি সব সময়ই আপনাদের পাশে থাকবে। আরও উত্তম ও নিরাপদ ঢাকা বিনির্মাণ এবং নগরবাসীর আরও নিশ্চিন্তে চলাচল নিশ্চিত করতে তিনি সম্মানিত নাগরিকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।’

সরবরাহ বন্ধ হলে বন্ধ হবে মাদক কারবার
মাদক নির্মূলকে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই মনে করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক। মাদকের মতো ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি গণমাধ্যমসহ সবার সহযোগিতা চান। এ প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে আমরা মাদকের ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছি। মাদকের ব্যাপারে আমরা দুই ধরনের কাজ করছি।

জনগণের মধ্যে যারা মাদকসেবী ও মাদক কারবারি তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। আমরা তাদের মধ্যে ডোপ টোস্ট করছি। মাদক না পেলেও ডোপ টেস্টে পজিটিভ হলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা প্রসিকিউশন দিচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘মাদকসেবনে চাকরি হারাচ্ছে পুলিশ সদস্যরাও। জিরো টলারেন্স নীতির কারণে আমরা পুলিশের মধ্যেও ডোপ টেস্ট করছি। যারা পজিটিভ হচ্ছেন তাদের আমরা চাকরিচ্যুত করছি।’ মাদক বন্ধে শুধু সাপ্লাই লাইন বন্ধ করলেই হবে না, ডিমান্ড লাইন বন্ধ করতে হবে উল্লেখ করে ডিএমপির নতুন কমিশনার বলেন, ‘যদি মাদকের ডিমান্ড ও মাদকসেবী থাকে তাহলে যতো কড়াকড়িই আরোপ করেন না কেন সাপ্লাই আসবেই।

সুতরাং আমাদের আগে মাদকের ডিমান্ড বন্ধ করতে হবে। যারা মাদকসেবী তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ডিমান্ড কমলে মাদক করবারিরা এমনিতেই তা ছেড়ে দেবে।’

চট্ট্রগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ইয়াবা নিয়ন্ত্রণে সফলতার উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘আমি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি থাকা অবস্থায় ইয়াবার ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলাম। মাদকসেবীদের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা সেবার মান ও চিকিৎসা কেন্দ্র বাড়াতে হবে। আমরা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলবো এবং মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলো বাড়ানো এবং সেখানে সেবার মান বাড়ানোর জন্য বলবো।’

আর মাথাচাড়া দিতে পারবে না জঙ্গিবাদ
জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ গোটা বিশ্বেই রোল মডেল। কিন্তু বিভিন্ন সময়েই জঙ্গিরা সংগঠিত হওয়ার অপপ্রয়াস চালায়। তবে দেশে জঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘বাংলাদেশে জঙ্গিরা আগের মতো মাথাচাড়া দিতে পারবে না। জঙ্গি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের অনেক দেশ সফল হতে পারেনি, তবে আমরা সফল হয়েছি। জঙ্গি নিয়ন্ত্রণে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট এবং সরকারের অন্যান্য সংস্থা একযোগে কাজ করছে।’

ঢেলে সাজাতে চান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
চাকরি জীবনে প্রায় এক বছর ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগে বছরখানেক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে খন্দকার গোলাম ফারুকের। নগরীর যানজটের জন্য অপরিকল্পিত নগরায়ন ও সড়কে বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নমূলক কাজকে দায়ী করেন। আগে ট্রাফিক বিভাগে তিনি দায়িত্ব পালনকালে যানজট সমস্যা সমাধানের জন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন।

আগের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় উন্নতি সাধন করতে চান। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার চার সূত্র এনফোর্সমেন্ট, এডুকেশন, ইঞ্জিনিয়ারিং ও এনভায়রনমেন্ট’র কথা উল্লেখ করে নতুন ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। সেগুলো সমাধান করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো হবে। রাজধানীবাসীকে ট্রাফিকের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।’

রাজধানীতে অবৈধভাবে পার্কিং, অবৈধ ইন্টার ডিস্ট্রিক বাস টার্মিনাল গড়ে তোলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি না? এক গণমাধ্যমকর্মীর এ প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘পুলিশের কোনো সদস্য যদি অবৈধ পার্কিং ও বাস টার্মিনাল গড়ে তুলে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো। পুরো ঢাকা নো পার্কিং। প্রাইভেটকারসহ ছোট যানবাহন রাখা নিয়েই মূলত সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অফিসিয়ালি পার্কিং জোন করতে আমরা চেষ্টা করছি। যদি করে দিতে পারি তাহলে ছোট যানবাহন রাখার সুবিধা হবে।’

কালের আলো/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email