সুযোগ পেলে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও জ্বলে উঠতে পারেন

প্রকাশিতঃ 11:01 am | September 16, 2022

স্পোর্টস ডেস্ক, কালের আলো:

‘এই দেশে যোগ্য লোকের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না, হবেও না!’ কথাগুলো বলেছেন ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ-এর স্ত্রী জান্নাতুল কাওসার মিষ্টি। গত ১৪ সেপ্টেম্বর মিষ্টি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে উল্লিখিত মন্তব্য সংবলিত স্ট্যাটাসটি লিখেছেন।

জান্নাতুল কাওসার মিষ্টির ওই পোস্টে মুশফিকুর রহিমের স্ত্রী মন্তব্য করেছেন, They have a team of hard hitters; বলে বলে ছয় আর ছয়। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের স্ত্রীর ওই পোস্টে রিয়াদ-এর পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর মন্তব্য ছিল। কেউ কেউ মন্তব্য মন্তব্য করেছেন, ‘অধিনায়ক সাকিব আল হাসান, সদ্যঘোষিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ১৫ সদস্যের স্কোয়াডে মাহমুদউল্লাহকে অবশ্যই রাখতে পারতেন।’ আবার অনেকে বলেছেন, ‘সাকিব আল হাসানের আসলে কোনো ক্ষমতা নেই, সব ক্ষমতা বোর্ডের।’

প্রমাণ হিসেবে মন্তব্যকারীরা বিসিবি সভাপতির বক্তব্য তুলে ধরেন- ‘আমরা যদি ওকে (মাহমুদউল্লাহ) দলে জায়গা না দিতে পারি, ওকে যদি অবসর নিতেই হয়, তাহলে তাকে ন্যূনতম সম্মানটা তো দেওয়া উচিত। মাঠ থেকে অবসরের সুযোগ দেওয়া উচিত। বাংলাদেশ দলে রিয়াদের অবদান খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। দলের হয়ে সে বহু ম্যাচ জিতিয়েছে।

’রিয়াদের স্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ নিঃসন্দেহে যোগ্য ক্রিকেটার। তবে সবশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর থেকেই ফর্মে নেই তিনি। বিশ্বকাপের পর থেকে এ পর্যন্ত ১১ ম্যাচ খেলে গড় মাত্র ১৬.৫৪, ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট ১০২.৮২। এশিয়া কাপের দুই ম্যাচে ২০ পেরিয়েছেন, শুধু এক ম্যাচে স্ট্রাইক রেট ছিল ৯২.৫৯, অন্যটিতে ১২২.৭২।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দল থেকে মাহমুদউল্লাহকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারে নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক ফর্মহীনতা আর বয়স বিবেচনায়ই তাকে আসন্ন বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম সংস্করণে নিজেদের ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে নতুন করে শুরু করতে চায় বাংলাদেশ। এজন্য এশিয়া কাপের আগে স্মরণকালের দ্রুততম সময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট শ্রীধরন শ্রীরামকে। বিশ্বকাপের দলে কারা থাকছেন, বা না থাকছেন, কাদের নিয়ে বিশ্বকাপের পরিকল্পনা সাজানো হবে, সেসবই ঠিক করেছেন এই শ্রীরাম।

এ ব্যাপারে শ্রীধরন শ্রীরাম বলেন, ‘শুধু আসন্ন বিশ্বকাপ নয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্যই রিয়াদকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পারফরম্যান্স বা পরিসংখ্যান নয়। আমি গুরুত্ব দিয়েছি ম্যাচের মধ্যে ক্রিকেটারদের ইমপ্যাক্টকে। এ কারণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের স্কোয়াডে রিয়াদের পরিবর্তে অগ্রাধিকার পেয়েছে ইয়াসির আলী রাব্বি।

একজন ক্রিকেটার মাহমুদুল্লাহ :

২০০৭ সালের ২৫ জুলাই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অভিষেক হয় মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের। বাংলাদেশের পক্ষে ক্রিকেট বিশ্বকাপে প্রথম সেঞ্চুরি (১০৩) করার গৌরব অর্জন করেন তিনি। এ ছাড়াও প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেন তিনি। ২০০৯ সালের ৯ জুলাই আর্নোস ভ্যাল স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টে তার টেস্ট অভিষেক ঘটে। সে ম্যাচে তিনি তৃতীয় বাংলাদেশি বোলার হিসেবে টেস্ট অভিষেকে পাঁচ উইকেট লাভ করেন এবং বাংলাদেশকে জয় এনে দেন।

২০১৫ সালের ৫ মার্চ স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের চতুর্থ খেলায় তামিম ইকবালের সঙ্গে ১৩৯ রানে জুটি গড়েন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। পরবর্তীতে সাকিব, মুশফিকের অনন্য নৈপুণ্যে ওই খেলায় বাংলাদেশ দল বিশাল রান তাড়া করে ৬ উইকেটের কৃতিত্বপূর্ণ জয়লাভ করে। এর ফলে বাংলাদেশ সফলভাবে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে বিজয়ী হয়।

২০১৫ সালের ৯ মার্চে অ্যাডিলেড ওভালে অনুষ্ঠিত গ্রুপ পর্বের পঞ্চম খেলায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক সেঞ্চুরি করেন রিয়াদ। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি করেন তিনি।

বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বকাপের যেকোনো উইকেটে মুশফিকুর রহিমকে সঙ্গে নিয়ে ১৪১ রানের সর্বোচ্চ জুটি গড়ার রেকর্ড মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের। ২০১৫ সালে একদিনের আন্তর্জাতিকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ দলগতভাবে সর্বোচ্চ রান তোলে। পরবর্তীতে রুবেল হোসেনের প্রশংসনীয় বোলিংয়ে (৪/৫৩) বাংলাদেশ ১৫ রানের ব্যবধানে জয়ী হওয়াসহ কোয়ার্টার ফাইনালে উন্নীত হয়। ওই খেলায় তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার লাভ করেন।

২০১৫ সালের ১৩ মার্চ সেডন পার্কে গ্রুপ পর্বে দলের সবশেষ খেলায় নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ১২৮ রান করে অপরাজিত থাকেন ও নিজস্ব দ্বিতীয় শতরান করেন। এ খেলায় তিনি বিশ্বকাপে ধারাবাহিকভাবে দুই খেলায় শতক হাঁকানোর গৌরব অর্জন করেন; যা এর আগে কোনো বাংলাদেশি খোলোয়াড় করতে পারেননি।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের অভিষেক :

২০০৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর। কেনিয়ার বিপক্ষে নাইরোবিতে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে টি-টোয়েন্টিতে অভিষেক হয় রিয়াদের। এরপর দেখতে দেখতে কেটে গেছে ১৪টি বছর। এই ১৪ বছরে দলের অন্যতম ভরসা হওয়ার পাশাপাশি পেয়েছেন টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্বের গুরুভার। খেলেছেন শতাধিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। যেখানে আছে অপরাজিত ৬৪ রানের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস। বল হাতে ৬১ ইনিংসে শিকার করেছেন ৩১টি উইকেট। যেখানে রয়েছে তার ক্যারিয়ার সেরা ২৮ রানে তিন উইকেটের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ১০০টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করেছেন একমাত্র মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। বাংলাদেশকে ২৪টি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। এর মধ্যে ১২টিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর জয়ের গড় ৫০ ভাগ।

সৌরভ গাঙ্গুলি যখন ভারত ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন, তখন ফর্মে না থাকা সত্ত্বেও অভিজ্ঞ খেলোয়াড় অনিল কুম্বলেকে দলে রেখেছিলেন। অনিল কুম্বলেকে দলে রাখা প্রসঙ্গে সৌরভ গাঙ্গুলি বলেছিলেন, ২০০৩ সালে ভারত অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিল এবং সেখানে নির্বাচকরা স্পিনার হরভোজন শিং ও মুরলি কার্তিককে রাখতে বলেছিলেন। আমি চিন্তা করে দেখেছিলাম, অনিল কুম্বলে সে ট্যুরে যেতে না পারলে তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। আমি নির্বাচকদের বলেছিলাম, অনিল কুম্বলেকে দলে রাখতেই হবে। সে একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। দলকে জেতানোর অভিজ্ঞতা তার আছে।

মানুষের জীবনের গ্রাফ সবসময় একরকম থাকে না। কখনও কখনও খারাপ হয়। এখন কুম্বলের খারাপ সময় যাচ্ছে। যেহেতু তার যোগ্যতা আছে, দলে রাখা হলে সে তার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারবে। নির্বাচকরা কোনোভাবেই তাকে নিতে চাইলেন না।

আমিও বললাম, যতক্ষণ তাকে দলে না নেওয়া হবে, আমি মিটিং ছেড়ে যাব না। অনেক তর্কাতর্কির পর নির্বাচকরা আমাকে বলেন, আচ্ছা, অনিল কুম্বলেকে দলে নিলাম। কিন্তু ভারত যদি খারাপ খেলে, তাহলে কুম্বলের আগে তোমার চাকরি যাবে। মাত্র একটা সুযোগ দেওয়ার কারণে কুম্বলে সে বছর ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকারি; পেয়েছিল ৭৫ উইকেট।

এখন বাংলাদেশের মানুষের একটাই প্রশ্ন। আর তা হচ্ছে, পোস্টারবয় খ্যাত মাহমুদউল্লাহকে সৌরভ গাঙ্গুলির মতো সাকিব আল হাসান কি দলে রাখতে পারতেন না? পারতেন না একটা সুযোগ দিতে? আর সেটা হয়তো ব্যাটে-বলে শতভাগ হয়ে বাংলাদেশকে বিজয়ী করে তুলত?

কালের আলো/এমএইচ/এসবি

Print Friendly, PDF & Email