বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি কতটা যৌক্তিক?

প্রকাশিতঃ 10:22 am | September 16, 2022

ড. কামরুল হাসান মামুন:

আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। ছাত্ররাজনীতি না বলে বরং বলা যায়, আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দলীয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল থেকে শুরু করে হেন কোনো কাজ নেই যা তারা করে না। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখলে রাজনীতির সংজ্ঞা ভুলে যায়।

ছাত্রদের অধিকার বাদ দিয়ে তারা এখন রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণে ব্যস্ত। যেন এইটাই তাদের আসল কাজ। রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণ করার জন্য যেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। পড়াশোনা করে মানুষ হতে হবে এইটা যেন তারা ভুলে যায়।

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করায় ‘সুদিন’ ফিরেছে বুয়েট ক্যাম্পাসে (দ্য ডেইলি স্টার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২)। এইটা এক দিকে যেমন দারুণ একটা সংবাদ অপরদিকে তা খারাপ ফল বয়ে আনবে।

ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কিছু পূর্ব শর্ত আছে। সেটি হলো, সব শিক্ষার্থীর অর্থনৈতিক মুক্তি। একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ভর্তি হয় তাদের সকলের থাকা, খাওয়া ও চলার জন্য অর্থ নিশ্চিত করা হয়।

পারিবারিকভাবে যারা সক্ষম তাদের কোনো না কোনো অভিভাবক বা আত্মীয়স্বজন এই নিশ্চয়তা দেয় যে, ব্যাংক থেকে লোন করে হলেও তাদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। ব্যাংকও তাদের এই নিশ্চয়তা দেয়।

আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি মানে ক্ষমতাসীন দলের প্রহরী হওয়া অথবা বিরোধী দলের সৈন্য হওয়া। ছাত্ররাজনীতি মানে ক্যাম্পাসে জাতীয় নেতাদের ছবি ও পোস্টার ছেয়ে দেওয়া।

একটি সভ্য বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চিত করে যে, মেধা থাকা সত্ত্বেও কেবল গরিব হওয়ার কারণে কারও লেখাপড়ায় যেন বিঘ্ন না ঘটে। এর অর্থ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলে পুরো চার বছর পড়া, থাকা এবং খাওয়ার সুব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ কেউ দুর্বল না। কারও দুর্বলতা পুঁজি করে কেউ পিংপং বল খেলতে পারে না। কাউকে রাজনীতির নামে মারামারি আর মাস্তানিতে নিয়োজিত করা যাবে না।

আমাদের দেশের মানুষ ছাত্ররাজনীতি কী সেটাই জানে না। আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতি মানে নেতার বন্দনা করা, বিনামূল্যে খাওয়া, কাউকে জোর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠানো বা নামিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।

এই যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অমানবিকভাবে জীবনযাপন করছে সেখান থেকে উত্তরণের জন্য কোনো রাজনীতি আছে? শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট লাঘবে ছাত্ররাজনীতি কি সক্রিয়? না।

শিক্ষা ও গবেষণার জন্য যে নামমাত্র বরাদ্দ দেওয়া তা নিয়ে নেতাদের কোনো দাবি আছে? ছাত্রদের যে ভালো মানের ক্যাফেটেরিয়া ও টয়লেট সুবিধা নেই সেটা নিয়ে কি ছাত্রনেতারা কোনো দাবি করেছে? করেনি।

আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি মানে ক্ষমতাসীন দলের প্রহরী হওয়া অথবা বিরোধী দলের সৈন্য হওয়া। ছাত্ররাজনীতি মানে ক্যাম্পাসে জাতীয় নেতাদের ছবি ও পোস্টার ছেয়ে দেওয়া।

কেন এমন হয়? কারণ শুরুতেই শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাজে লাগানো হয়। একজন শিক্ষার্থী দুর্বল মানেই সে ছাত্ররাজনীতির বলি। জোর করে তাকে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত করে জাতীয় রাজনীতিতে দীক্ষিত করা হয়।

ছাত্ররাজনীতির উদ্দেশ্য হলো নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ শেখা। আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির নামে যা শেখানো হয় তা হলো তোষামোদি, গুণ্ডামি ইত্যাদি। যে যত বড় মাস্তান সে তত বড় ছাত্রনেতা।

তার ব্যবসা থাকে, একদল ক্যাডার থাকে, তার গাড়িও থাকে। কিন্তু লেখাপড়া থাকে না যেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আসল উদ্দেশ্য। সুতরাং এই ধরনের ছাত্ররাজনীতি তো থাকারই কথা না। অথচ রাজনীতি করার অধিকারের নামে আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস একটা ব্যারাকে পরিণত করেছি।

ছাত্ররাজনীতির কাছে প্রশাসনও জিম্মি। কারণ প্রশাসনের পদগুলোয় যারা নিয়োগ দেয় তাদের উদ্দেশ্য হলো প্রহরীদের যেন সুরক্ষা দেওয়া হয়, তাদের যেন কোনো প্রকার অসুবিধা না হয়।

সমস্যা হলো, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে যদি ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা হয় তাহলে সুবিধাভোগী শ্রেণি সক্রিয় হয়ে পড়ে। এই সুবিধাভোগী শ্রেণি কখনো ছাত্ররাজনীতি করেনি। তাদের কাজ হলো, দুর্বল শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করা এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। যে কাজটা জামায়াত সবসময় করে।

আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির নামে যা শেখানো হয় তা হলো তোষামোদি, গুণ্ডামি ইত্যাদি। যে যত বড় মাস্তান সে তত বড় ছাত্রনেতা।

তারা উইপোকা আর ঘুণপোকার মতো ভেতরে ভেতরে রাজনীতি করে। তারা ছাত্রদের আবাসিক সমস্যা দূর করে দেয়, বৃত্তি দেয়, প্রাইভেট টিউশন জোগাড় করে দেয়, কোচিং সেন্টারে নিয়োগ দিয়ে দূষিত রাজনীতি জিইয়ে রাখে। শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে না তাদের আসলে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এজন্য আমাদের যেটা করা উচিত সেটা হলো, শিক্ষার্থীদের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ যেন কেউ কাজে লাগাতে না পারে সেদিকে নজর দেওয়া। একজন শিক্ষার্থীর আবাসন, খাবারের সংকট যেন না থাকে সেই ব্যবস্থা করা।

ভালো থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষার্থীরা অসৎ পথে অসৎ রাজনীতি করবে না এইটা নিশ্চিত। তখন তারাই রাজনীতি করবে যারা একটি আদর্শকে ধারণ করে নেতৃত্ব শিখতে চায়, ছাত্রদের মঙ্গল চায়, শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চায়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র প্রতিনিধি থাকবে যারা ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কাজ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান বাড়ানোর জন্য কাজ করবে। ছাত্রদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য কাজ করবে। ছাত্ররা যেন পাস করেই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে সেসব নিয়ে কাজ করবে।

জব ফেয়ারের আয়োজন করবে। ছাত্র প্রতিনিধিরা বছরের পর বছর পদ ধরে রাখবে না। চার বছরের কোর্স চার বছরেই শেষ করে বিদায় নেবে। ছাত্ররা কখনো কারো তোষামোদি করে না। এতেই শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন ঘটবে।

লেখক: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email