এসএসএফের নামে প্রতিষ্ঠান খুলে ‘ভয়ংকর প্রতারণা’, কোটি টাকা আত্মসাত

প্রকাশিতঃ 5:27 pm | August 04, 2022

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘এসএসএফ প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে প্রতিষ্ঠানে চাকরির ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় সাত-আটশো চাকরিপ্রত্যাশীর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি প্রতারক চক্র। চক্রটির মূলহোতাসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-৩)।

বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর কাওরান বাজার মিডিয়া সেন্টারে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

এর আগে বুধবার (৩ আগস্ট) তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতাররা হলেন- চক্রের মূলহোতা মো. মাছুম বিল্লাহ (৩৩), খাইরুল আলম রকি (২০), মো. কামরুজ্জামান ডেনিশ (২২), মো. মাহমুদুল হাসান (৩২), মাসুদ রানা (২৪) ও এসএম রায়হান (২৪)।

অভিযানে আটটি মোবাইল ফোন, আটটি সিম কার্ড, নগদ পাঁচ হাজার ৫৪০ টাকা, একটি মনিটর, স্ট্যাম্প প্যাড দুটি, এসএসএফ প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেড ব্যানার দুটি, শতাধিক ভর্তি ফরম, দুই শতাধিক সিভি, দুটি চেকবই, পাঁচটি স্ট্যাম্প, দুটি অঙ্গীকারনামা, ভিজিটিং কার্ড, পণ্য তালিকা, মূল্য তালিকা, অর্ধশতাধিক ডিপো ও নিয়োগপত্র জব্দ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, কর্মজীবনের শুরুতে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নামসর্বস্ব নিয়োগ প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে প্রতারণার শিকার হয়। এরপর তারা নিজেরাই প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। তারা সবাই পেশাদার সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। চক্রটি সুপরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করতো।

তিনি জানান, গ্রেফতার মো. মাছুম বিল্লাহ চক্রের মূলহোতা। সে নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিতো। এ পরিচয়ের কারণে ভুক্তভোগীরা তাকে ভয় পেতেন। সে ভুক্তভোগীদের মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করতো। আইন বিষয়ে পড়াশোনা করার কারণে সে সুকৌশলে তার প্রতারণাকে বৈধভাবে উপস্থাপন করার জন্য ভুয়া লাইসেন্স নিজের অফিসে ঝুলিয়ে রাখতো এবং তার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত এবং গভ. রেজি. নং সি-১৫৭৭৬৩ উল্লেখ করতো।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ আরও জানান, মাছুম বিল্লাহর অন্যতম সহযোগী গ্রেফতার খাইরুল আলম রকি ও মো. কামরুজ্জামান ডেনিশ আগে সিনথিয়া সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামের একটি নামসর্বস্ব কোম্পানিতে একইভাবে প্রতারণার কাজ করতো। কোম্পানিতে আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযানের পর তারা মাছুম বিল্লাহর সঙ্গে যোগ দেয়। রকি অফিসে আসা চাকরিপ্রার্থীদের প্রতারণামূলক কথাবার্তা বলে মগজ ধোলাই করে জামানতের টাকা আদায় করতেন। ডেনিশ, রায়হান ও মাসুদ সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশব্যাপী আগ্রহী প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইন্টারভিউয়ের জন্য অফিসে নিয়ে আসতো। গ্রেফতার মাহমুদুল চাকরিপ্রার্থীদের ফরম পূরণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদনপত্র জমা নিতো।

এই র‍্যাব কর্মকর্তা আরও জানান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত, এসএসএফ প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেড গভ. রেজি. নং সি-১৫৭৭৬৩ লেখা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতো চক্রটি। যা দেখে চাকরিপ্রার্থীরা প্রতিষ্ঠানকে সরকারের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মনে করতো। এছাড়াও এসএসএফ একটি বিশেষ নিরাপত্তা সংস্থার নাম হওয়ায় চাকরিপ্রার্থীরা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানকে তাদের অঙ্গসংগঠন মনে করতো। বিজ্ঞপ্তিতে সিকিউরিটি গার্ড, সহকারী সুপারভাইজার, সুপারভাইজার, সিকিউরিটি ইনচার্জ, মার্কেটিং অফিসার (পুরুষ), মার্কেটিং অফিসার (মহিলা), অফিস সহকারী, লেডি গার্ড, অফিস রিসিপশনস (মহিলা) পদের বিপরীতে উচ্চ বেতন লেখা থাকতো।

এছাড়াও আকর্ষণীয় সুযোগ হিসেবে ফ্রি খাওয়ার সুব্যবস্থা, কর্মদক্ষতার ওপর পদোন্নতি, অভিজ্ঞতা না হলেও চলবে, কর্মঠ ও সুদর্শন হতে হবে, এসব লোভনীয় প্রস্তাব উল্লেখ করা হতো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে। যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিজ্ঞপ্তি দেখে অসংখ্য বেকার যুবক-যুবতি, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।

প্রতারণার দ্বিতীয় পর‍্যায়ে তাদের অফিস থেকে চাকরিপ্রার্থীদের মোবাইলে ফোন দিয়ে একটি নির্দিষ্ট তারিখে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ অফিসে এসে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য বলা হতো বলেও জানান তিনি।

র‍্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন, প্রতারণার তৃতীয় পর‍্যায়ে নির্দিষ্ট তারিখে চাকরিপ্রার্থীরা ইন্টারভিউয়ের জন্য অফিসে আসার পর তাদের একটি ফরম পূরণ করতে দেওয়া হতো। ফরমে সংযুক্তি হিসেবে ছবি, অঙ্গীকারনামা, প্রার্থীর নিজ এবং বাবা-মায়ের এনআইডির কপি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র, নাগরিক সনদপত্র দিতে হতো। অতঃপর প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রতারণামূলক কথাবার্তা বলে মগজ ধোলাই করা হতো। এরপর তাদের কাছ থেকে ভর্তি ফরম, ট্রেনিং এবং আইডি কার্ড বাবদ সাড়ে ১২ হাজার টাকা জামানত আদায় করা হতো। পরে তাদের জানানো হতো, পদ অনুসারে তাদের মাসিক ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হবে।

‘কোনো প্রার্থীর কাছে ওই পরিমাণ টাকা না থাকলে তাদের কাছে যা আছে তাই আদায় করা হতো এবং বাসায় গিয়ে বিকাশের মাধ্যমে বাকি টাকা পরিশোধ করতে বলতো চক্রটি। কিন্তু জামানত হিসেবে টাকা নেওয়ার কোনো রশিদ দেওয়া হতো না। নির্দিষ্ট তারিখে তাদের চাকরিতে যোগদান করতে বলতো চক্রটি।’

পরবর্তীতে সিকিউরিটি অফিসে যোগদান করলে তাদের নিয়োগপত্রে উল্লেখ করা হতো প্রতি মাসে নতুন নতুন চাকরিপ্রার্থী সংগ্রহ করতে হবে এবং নতুন চাকরিপ্রার্থী সংগ্রহের ভিত্তিতে কমিশন হিসেবে তাদের বেতন দেওয়া হবে। কিন্তু কাজে যোগদান করার পর চাকরি প্রার্থীদের কোনো বেতন দেওয়া হতো না। ভুক্তভোগীরা কোম্পানির প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে জামানতের টাকা ফেরত চাইলে চক্রটি নানা টালবাহানা করতো এবং টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানাতো।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে কাগজে লিখিয়ে নেওয়া হতো, তারা স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন এবং কোম্পানির সঙ্গে তাদের কোনো আর্থিক লেনদেন নেই। এভাবে অভিযুক্তরা গত আট মাসে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ জন চাকরিপ্রার্থীকে তাদের কোম্পানির নিয়োগ ফরম পূরণ করিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগের নামে তারা কোম্পানি পরিচালনা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ দেয়া হয়নি।

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email