প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেদিন আনন্দে কেঁদেছিলেন শেখ রেহানাও

প্রকাশিতঃ 8:55 pm | June 24, 2022

মো.শামসুল আলম খান, সম্পাদক, কালের আলো:

২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। সেদিনই প্রথম নিজের রূপ পেতে শুরু করে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর ভাসমান ক্রেনের সাহায্যে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুতে পিলারের ওপর বসানো হয় প্রথম স্প্যান।

আনন্দঘন সেই মুহুর্তে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্প্যান বসানোর ছবির অপেক্ষায় জেগে ছিলেন রাত। স্থানীয় সময় রাত ৩ টায় ছবি ও ভিডিও দু’টোই পাঠালেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সেগুলো দেখে সেদিন আনন্দে কেঁদেছিলেন দু’বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে অনেক অপমানের জবাব দিতেই উন্মুখ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেই স্মৃতির কথাই তিনি তুলে এনেছিলেন ঠিক এক সপ্তাহ পর দেশে ফিরে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। দিনটি ছিল শনিবার, ০৭ অক্টোবর, ২০১৭।

প্রধানমন্ত্রী সেই মুহুর্তের কথা বলেছিলেন ঠিক এভাবেÑ‘যুক্তরাষ্ট্রে ছিলাম। স্থানীয় সময় রাত তিনটায় ম্যাসেজ এলো। জানলাম স্প্যান বসানো হয়েছে। জেগেই রয়েছি; বললাম ছবি পাঠাও। ওবায়দুল কাদের ছবি ও ভিডিও দুটাও পাঠালেন। সেগুলো দেখে দুই বোন (শেখ রেহানা) সেখানে কেঁদেছি। অনেক অপমানের জবাব আমরা দিতে পারলাম, এটাই সব থেকে বড় অর্জন।’

নিজেদের অর্থে বাংলাদেশ পদ্মা সেতু তৈরি করবে অনেকেই শেখ হাসিনার ঘোষণায় উপহাস করেছিলেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, ‘আমাদের অনেক সিনিয়র ক্যাবিনেট সদস্যও বিশ্বাস করেননি। তাদের কথা ছিল, বিশ্বব্যাংকের সাহায্য ছাড়া এটা করা যাবে না।

কিন্তু আমি বলেছিলাম, যত দিন নিজেদের অর্থে করতে না পারব তত দিন করব না। কিন্তু মিথ্যা অপবাদ নিয়ে পদ্মা সেতু করব না। ক্ষমতার লোভে আর নির্বাচনের জেতার লোভে এটা আমি করব না। এটা আমার স্বভাব না।’

আজ শনিবার (২৫ জুন) থেকে পদ্মা সেতু থেকে দাঁড়িয়ে চন্দ্রাদীপ্ত পূর্ণিমার রাতে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পাবেন দেশের মানুষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। অদম্য সাহস আর আত্নবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন তিনি। পাশে ছিলেন দেশের সাধারণ মানুষ।

পাশে ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে সবার প্রিয় ‘ছোট আপা’ শেখ রেহানা। সক্রিয় রাজনীতিতে সামনের সারিতে না এসেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় ভরসার জায়গা তিনি। একজন শেখ হাসিনার প্রেরণায় উৎস আর সঙ্কটে সাহসের ভান্ডার হিসেবে পাশে থাকেন সব সময়।

২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম পদ্মা সেতুতে যেদিন হেঁটেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিনও তাঁর সঙ্গেই ছিলেন অতি আদরের ছোট বোন শেখ রেহানা। দু’বোন একসঙ্গে ২ কিলোমিটার হেঁটে যান। তাঁরা ওইদিন সেতুর ৭ নম্বর পিলার থেকে ১৮ নম্বর পিলার পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার হাঁটেন।

২০২২ সালের পহেলা জুন। টুঙ্গিপাড়া থেকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় ফিরছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, রত্নগর্ভা মা শেখ রেহানা। দৃশ্যমান পদ্মা সেতু দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। মহান আল্লাহ’র কাছে শুকরিয়া জানিয়ে মোনাজাতও করেন।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর দূরত্ব ঘোচাতে পদ্মা নদীর ওপর সেতু তৈরির স্বপ্ন ছিল দীর্ঘদিনের। দেশের সব রাষ্ট্রনায়ক ও সরকারপ্রধান এ স্বপ্নপূরণের উপায় খুঁজেছেন কিন্তু, সফল হতে পারেননি কেউ। ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি উল্লেখ করেছিল আওয়ামী লীগ।

বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর এই বিষয়ে উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। বিশ্বব্যাংকসহ আরও কিছু দাতা সংস্থা শুরুতে এর সঙ্গে যুক্ত হলেও কথিত দুর্নীতির অভিযোগ এনে সংস্থাগুলো পিছু হটে যায়। কিন্তু,অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসের কারণে এই সেতু নির্মাণের স্বপ্ন থেকে এক বিন্দুও সরে আসেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পদ্মাসেতুর অগ্রগতি সাধনে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে। দেশি-বিদেশি চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের কারণে বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলো যখন এই প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন তাদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন পদ্মাসেতু হবে নিজেদের অর্থায়নে। এরপর থেকেই পদ্মাসেতুর স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ। বিরোধী রাজনৈতিক মহলসহ বিভিন্ন পক্ষ এ ঘোষণাকে হেসে উড়িয়ে দিলেও নিজের সংকল্পে অটল থাকেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০১২ সালের ১০ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু নির্দেশ দেন। ওই সময় প্রস্তুতিমূলক কাজ দ্রুত শেষ করতে নির্দেশ দেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর মূল সেতুর কার্যক্রম শুরু করা হয় নিজেদের অর্থায়নেই। অত:পর সব বাধা পেরিয়ে পদ্মা সেতু এখন স্বপ্ন থেকে বাস্তবে, পুরোপুরি বাস্তবায়ন। আজ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সোনালী সাহসের প্রতীক এই পদ্মা সেতু। অভিনন্দন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email